‘চাকায় চালিত দুর্গ’: ইউক্রেনে ভারী অস্ত্র ও বর্মে সজ্জিত আর্মার্ড ট্রেন ব্যবহার করছে রাশিয়া
রুশ সেনাবাহিনীর এক ভিডিওতে দেখা যায়, বর্ম দ্বারা সুরক্ষিত একটি আর্মার্ড ট্রেন। জানালাগুলোয় সেনাদের সতর্ক অবস্থান। অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গান বা বিমান বিধ্বংসী কামান তাক করে আশেপাশের এলাকার আকাশে নজর রাখছে। ভারী মেশিনগান ও স্নাইপার রাইফেলে সজ্জিত সেনাদেরও দেখা যায় তাতে। খবর ইউরেশিয়ান টাইমসের
২৩ মিলিমিটার অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গানগুলো ট্রেনের পেছনে উন্মুক্ত ক্যারেজে স্থাপন করা হয়েছে। ট্রেন থামলেই সঙ্গে সঙ্গে নেমে পড়ছে মাইন শনাক্ত ও ধবংসকারী বিশেষ টিম। তাদের কাজ সামনের রেলসেতু ও রেলপথে পেতে রাখা শত্রুর মাইন/বোমা শনাক্ত ও তা সরিয়ে ফেলে ধবংস করা। এভাবেই তারা রেল চলাচল নির্বিঘ্ন করছে রুশ বাহিনীর জন্য।
রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিশেষ এই ট্রেনটি টেকনিক্যাল রিকনসেন্স, মাইন অপসারণ এবং রেলওয়ে ট্র্যাক সারাইয়ের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত। একইসঙ্গে, মানবসৃষ্ট যেকোনো বাধা ধবংস করতে পারে রেলপথকে যথাসম্ভব ক্ষতিমুক্ত রেখে।
ভিডিওতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রেনের ভিয়াস্লাভ নামে বিমান-বিধ্বংসী কামানের একজন ক্রু বলেন, "চলার সময় আমার টিমের কাজ নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া আকাশযান শনাক্ত ও ধবংস করা, আমরা আকাশে দেড় কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত আঘাত হানতে পারি। এছাড়া, শত্রুর সুরক্ষিত ভুমি-ভিত্তিক স্থাপনা ও হালকা সাঁজোয়া যানকে আড়াই কিলোমিটার দূর থেকেও ধবংস করা যায় আমাদের এই কামান দিয়ে। এটা আমাদের ট্রেনের সবচেয়ে সাধারণ ক্যালিবারের অস্ত্র।"
ইউক্রেনে রুশ আর্মার্ড ট্রেনটির দায়িত্বের মধ্যে আরও রয়েছে, সেনা, রসদ ও সরঞ্জামবাহী অন্যান্য ট্রেনের নিরাপত্তা বিধান। আবার নির্দেশ পেলে এটি বেসামরিক নাগরিকদের বহনকারী ট্রেনকেও পাহারা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।
বিশেষায়িত ট্রেনটির প্রধান কর্মকর্তা- সের্গেই বলেন, "এটি একটি সুরক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম। এটা সবার আগে যায়, যাতে লাইনে কোনো বোমা পাতা থাকলে- তার বিস্ফোরণটা প্রথমে এটার ওপর দিয়েই যায়, এ ধরনের বিস্ফোরণ সহ্য করার জন্য এটি নির্মাণ করা হয়েছে। এতে বহন করা হয়, রেল ট্র্যাকের ওপরের অংশ- যাতে সেগুলোর কোনো ক্ষয়ক্ষতি আমরা মেরামত করতে পারি এবং ধবংসপ্রাপ্ত অংশকে যত দ্রুত সম্ভব বদলে ফেলতে পারি।"
রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম ইজভেস্তিয়া সম্প্রতি এই ট্রেনের ভিডিওটি প্রকাশ করেছে। আর্মার্ড এই ট্রেনটির নাম আমুর। গত মার্চে ইউক্রেনের জাপোরিঝিয়া অঞ্চলের মেলিতোপোল দখলের পর সেখানে একই ধরনের আরেকটি ট্রেন 'ইয়েনসেই'কে মোতায়েন করেছিল রুশ বাহিনী।
সামাজিক মাধ্যম টেলিগ্রামে আমুর ট্রেনের ভিডিওটি পোস্ট করেছে ইজভেস্তিয়া। অত্যন্ত বিপজ্জনক কাজেই এই বর্মসজ্জিত ভারী ট্রেনটি মোতায়েন করা হয়। ভিডিও চিত্রে প্রতিবেদক জানান, রেলপথে নাশকতাকারীদেরও প্রতিহত করতে পারে ট্রেনটির অস্ত্রসজ্জা।
রাশিয়ার আর্মার্ড ট্রেনের ইতিহাস
প্রথম মহাযুদ্ধকালে আর্মার্ড ট্রেনের বহুল ব্যবহার ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নাগাদ তা অনেকটাই কমে আসে। সোভিয়েত ইউনিয়ন অবশ্য এ ধরনের ট্রেন তৈরি অব্যাহত রাখে। সেই সোভিয়েত আমলে নির্মিত বেশকিছু ট্রেন ছিল রাশিয়ার। কিন্তু, ২০০০ এর দশকে এর সিংহভাগকেই সার্ভিস থেকে প্রত্যাহার করা হয়। তবে ২০১৬ সালে এসব ট্রেনকে পুনরায় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করার নির্দেশ দেন রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু।
২০১৬ সালে বৈকাল ও আমুর নামক দুটি আর্মার্ড ট্রেনকে রসদবহন সংক্রান্ত অপারেশনের জন্য ক্রিমিয়ায় এক বিশেষ প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়। ১৫ বছরের মধ্যেই এটাই ছিল রুশ আর্মার্ড ট্রেনের কোনো সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণ।
এই ট্রেনগুলি ট্যাংক, এপিসির মতো সাঁজোয়া যান বহন করতে পারে। এতে বর্ম দ্বারা সুরক্ষিত বিশেষ ক্যারেজে অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গান ও গোলন্দাজ কামানও থাকে। শত্রুর বর্মভেদী অস্ত্রের আঘাত থেকে সুরক্ষায় পুরু বর্ম দিয়ে নির্মিত এর লোকোমোটিভগুলোর বহিরাবরণ।
ট্রেনগুলোর মিশন প্রধানত সরবরাহ ট্রেনকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়া, যুদ্ধাঞ্চলে রেলপথের জরুরি মেরামত, মাইন অপসারণ, গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে হাবের নিরাপত্তা বিধান এবং শত্রুর দিকে গোলা ছুঁড়ে পদাতিক সেনাদের সমর্থন। এতে সেনাদলের পাশাপাশি মূল্যবান সামগ্রীও নিরাপদে এক জায়গা থেকে অন্যত্র নেওয়া যায়।
সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক মার্কিন গণমাধ্যম ১৯ফর্টিফাইভ এর প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা সম্পাদক ব্রেন্ট এম ইস্টউড ইউরেশিয়ান টাইমসকে জানান, ইউক্রেনের রেলপথে হামলার শিকার হচ্ছে রুশ ট্রেনগুলি; আর্মার্ড ট্রেনের ব্যবহার সেই হামলা প্রতিরোধের চেষ্টার প্রতিই ইঙ্গিত দেয়। এতে আরও স্পষ্ট যে, তারা এনিয়ে প্রচণ্ড চাপের মধ্যেও আছে। সেকারণেই এগুলো মোতায়েন করা হচ্ছে বলে তিনি মনে করছেন।
তিনি উল্লেখ করেন যে, "এই আর্মার্ড ট্রেনে থাকা বিমান-বিধ্বংসী কামান হয়তো তুরস্কে নির্মিত টিবি-২ ড্রোনের হামলা থেকে নিরাপত্তা দিতে পারে। এই ড্রোনটি ইউক্রেন ব্যবহার করে।"
তাছাড়া, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মতোই রাশিয়ার সামরিক রসদ বহনে ব্যাপক নির্ভরশীলতা রয়েছে রেল ব্যবস্থার ওপর। ইউক্রেনে বেশিরভাগ রসদ ও সরঞ্জাম বহনে রেলগাড়িই ব্যবহার করছে রুশ বাহিনী।
ইস্টউড বলেন, "দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে হওয়ার পরের সময়টা বা স্নায়ুযুদ্ধের শুরুর সময়ে– (রাশিয়ার) এই ধরনের ট্রেনের ব্যবহার ছিল উল্লেখযোগ্য। এতে বোঝা যায়, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য নিজেদের অস্ত্রাগারের পুরোনো সরঞ্জাম সার্ভিসে আনতেও দ্বিধা করছে না রাশিয়ানরা।"
ভৌগলিক কারণেও রেল ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা বেশি রাশিয়ার। ভূমি আয়তনে বিশ্বের বৃহত্তম দেশ রাশিয়া। কিন্তু, পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় এর সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা বেশ অনুন্নত। এজন্য দেশটির সেনাবাহিনীর পরিবহন কাজে ট্রেনের গুরুত্ব অপরিসীম।
