কে এই ‘মিস্টার আর্মাগেডন’—ইউক্রেন যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল সুরভিকিন
এ সপ্তাহজুড়ে রকেট হামলা ও কামানের গোলাবর্ষণ করে ইউক্রেনের ছোট-বড় শহরগুলির কিছু এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে রুশ সেনাবাহিনী। সামরিক লক্ষ্যবস্তুর সাথে বেসামরিক নাগরিকের বাসস্থান, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শহরের সড়ক অবকাঠামো এমনকী পার্কও এ হামলার শিকার হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী, রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত পূর্বাঞ্চল থেকে মোট ৮০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। এশিয়া টাইমস
যুদ্ধ শুরুর পর ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে এটাই সবচেয়ে তীব্র আগ্রাসন, যাতে শুধু মঙ্গলবারেই নিহত হয় ১৯ জন।
তবে যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষতির শিকার হয়ে ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ নয় এ হামলা। যেমনটা নয় রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের সাথে ক্রিমিয়াকে সংযুক্তকারী কের্চ সেতুতে বোমা বিস্ফোরণের প্রতিশোধ। এটি আসলে রুশ সামরিক বাহিনীর চিরায়ত কৌশলকেই জোরালো করে তোলার অংশ।
তার ইঙ্গিত মিলেছে মঙ্গলবার রাতে। এসময় একযোগে বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে ইউক্রেনের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে। তার আগে ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে জেনারেল সের্গেই সুরভিকিনকে নিয়োগ দেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্দয় হামলার জন্য আগে থেকেই পরিচিত সুরভিকিন। পশ্চিমা গণমাধ্যমে তাই তাকে 'জেনারেল আর্মাগেডন' (বা 'কেয়ামতের জেনারেল') বলেও ডাকা হয়।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইউক্রেনের উত্তরপূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে পিছু হটতে হয়েছে রুশ বাহিনীকে। এতে পুতিন কোণঠাসা হয়ে পড়লেও বেছে নেওয়ার মতো কিছু উপায় ছিল তার হাতে। যেমন তিনি যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং রিজার্ভ সেনা তলব নিয়ে নিয়ে রুশ জনতার মধ্যে তৈরি হওয়া উৎকণ্ঠা নিরসনে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারতেন। অথবা, পারতেন যুদ্ধবাজ সমালোচকদের কথায় কান দিয়ে সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলতে।
রুশ বাহিনী এই মুহূর্তে গোলাবারুদ ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতিতে থাকলেও তিনি শেষোক্ত উপায়টিই গ্রহণ করেছেন। সবচেয়ে সরল অথচ কঠোর পথে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পুতিন: এরমধ্যেই তার নতুন কমান্ডার শহরাঞ্চলে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইউক্রেনীয়দের বিপদে রেখেছেন। আর এই অবকাশে রিজার্ভের তিন লাখ সদস্যকে যুক্ত করার মাধ্যমে ইউক্রেনে আগ্রাসী বাহিনী পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন।
ইউক্রেনের পশ্চিমা সমর্থক ও অস্ত্র সরবরাহকারীদের ওপরও অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছেন পুতিন। তার হাত শক্তিশালী করেছে সৌদি আরব। তেল উৎপাদনকারী দেশগুলির জোট—ওপেকে সর্বেসর্বা রিয়াদ। ওপেক সম্প্রতি নিয়েছে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহ কর্তনের সিদ্ধান্ত। এতে করে, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি-চাহিদা বেশি থাকা আমদানিকারক রাষ্ট্রগুলিকে তেল কিনতে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে।
এসব ঘটনা যুদ্ধের ময়দানে রুশ বাহিনীর পরিস্থিতি পাল্টে দিতে পারবে কি না, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। আপাতত উত্তরপূর্ব ফ্রন্টে অগ্রযাত্রায় রয়েছে ইউক্রেনীয়রা। সে তুলনায় দক্ষিণপূর্বে তাদের অগ্রগতি খুবই ধীরে হচ্ছে। তাই গত ১১ অক্টোবর আমেরিকা ও ইউরোপীয় মিত্রদের কাছে আরও অস্ত্র সহায়তা চেয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদমির জেলেনস্কি।
গত ফেব্রুয়ারিতে আগ্রাসন চালানোর সময় দ্রুততম সময়ে জয়ের আশা করেছিলেন পুতিন। সে লক্ষ্যপূরণ না হওয়ায় এ পর্যন্ত অভিযানের ৬ জন শীর্ষ কমান্ডার বদলেছেন তিনি।
যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে কোনোরকম তীব্র প্রতিরোধের মুখোমুখি না হয়েই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ অন্যান্য প্রধান শহর দখলের আশা করেছিল রাশিয়ানরা। আশা করেছিল, সহজেই ক্ষমতাসীন সরকারকে উৎখাত করে পুরো দেশে তাদের নিজস্ব শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে পারবে।
কিন্তু, সে আশাভঙ্গ হতেও সময় লাগেনি। কৃষ্ণসাগর তীরের মারিওপোলের মতো বন্দর নগরী দখলের সময় রুশ সেনাদের যথেষ্ট সংগ্রাম করতে হয়েছে। অন্যকিছু এলাকায় থমকে যায় তাদের অগ্রগতি। এই অবস্থায় এপ্রিলে প্রথমবারের মতো ইউক্রেন যুদ্ধে বিভিন্ন ফ্রন্টের দায়িত্বে থাকা জেনারেলদের অপসারণ করে একজন একক সর্বাধিনায়ক– আলেক্সান্ডার দোবোরনিকভকে নিযুক্ত করেন পুতিন।
দোবোরনিকভ চেচনিয়া ও সিরিয় যুদ্ধে পোড় খাওয়া জেনারেল। বিনা দ্বিধায় বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে তার কার্পণ্য না থাকায়– পশ্চিমা গণমাধ্যম তাকে 'বুচার অভ সিরিয়া বা 'সিরিয়ার কসাই' নাম দেয়। তবে বেশিরভাগ পর্যবেক্ষক মনে করেন, তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা চালাতে রুশ বাহিনীর প্রথাগত চর্চার সীমার মধ্যেই ছিলেন।
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক চিন্তক সংস্থা– দ্য ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অভ ওয়্যার জানাচ্ছে, 'সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপের বেশিরভাগ সময়েই রুশ বাহিনী দেশটির বেসামরিক নাগরিক ও অত্যাবশ্যক অবকাঠামোর ওপর হামলা করেছে। ফলে সিরিয়ায় রুশ বাহিনীকে নেতৃত্বদান বা বেসামরিক জনতার ওপর হামলার মাধ্যমে দোবোরনিকভ কোনো ব্যতিক্রম করেননি, বা এসব তার কোনো স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের পরিচয়ও দেয় না।
ইউক্রেনে দোবোরনিকভ সাফল্যও পাননি। তাই জুনের শেষদিকে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয় গেনেডি ঝিডকোকে, যিনি ছিলেন রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কম্যান্ডের সাবেক প্রধান এবং দেশটির উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী। রহস্যজনক কোনো কারণে নিয়োগের পরপরই ঝিডকোকে অপসারণ করা হয়। এরপর গত ৭ অক্টোবর পর্যন্ত ইউক্রেন যুদ্ধে নেতৃত্ব কে দিচ্ছেন তা স্পষ্ট ছিল না। পরে জানা যায় তিনি হলেন সুরভিকিন।
পশ্চিমাদের মতে, 'কসাই' উপাধির যোগ্য দাবিদার কেউ হলে সেটি আসলে সুরভিকিন।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচভকে উৎখাতের অভ্যুত্থানের চেষ্টা করে প্রথম আলোচনার পাদপ্রদীপে আসেন তিনি। সোভিয়েত ইউনিয়ন অখণ্ড রাখার ঘোর সমর্থক সুরভিকিন এসময় একটি সাঁজোয়া বহরের নেতৃত্ব দেন, এই বহর গর্বাচেভপন্থী তিন বিক্ষোভকারীকে পিষ্ট করে দেয় রাশিয়ার আইনপরিষদ দুমার কার্যালয়ের কাছাকাছি অবস্থিত নোভি আর্বাত বুলেভার্ডে।
নিহত তিন বিক্ষোভকারীকে 'হিরো অভ সোভিয়েত ইউনিয়ন' পদক বা সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত করা হয়েছিল।
এজন্য ছয় মাস জেলে কাটানোর পর মুক্তি দেওয়া হয় তাকে। সুরভিকিনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও গঠন করা হয়নি।
২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে চেচনিয়ায় বিচ্ছিন্নতাকামীদের বিরুদ্ধে অভিযানে একটি আর্মার্ড ডিভিশনের অধিনায়ক ছিলেন তিনি।
২০০৫ সালে তার ডিভিশনের ৯ সেনা একটি দেওয়াল ধসে মারা যায়। তৎকালীন বেসরকারি একটি রুশ সংবাদপত্র নোভায়া গ্যাজেটা জানিয়েছিল, মদ্যপ এক রুশ সেনা গ্রেনেড বা ল্যান্ডমাইন দিয়ে নিজের অজান্তেই দেওয়ালটি ধসিয়ে দেয়।
এই ঘটনার দায় চেচেন যোদ্ধাদের ওপর চাপান সুরভিকিন। এবং নিহত প্রত্যেক রুশ সৈন্যের জন্য তিন জন করে চেচেনকে হত্যার অঙ্গীকার করেন। এমন সিদ্ধান্তের বিষয়ে তৎকালীন গণমাধ্যমে সমালোচনাও হয়, যাকে নিছক 'একাডেমিক বিতর্ক' বলে নাকচ করে দেন তিনি।
শেষপর্যন্ত কঠোরহস্তে দমন করা হয়েছিল চেচেনদের বিদ্রোহ। প্রথমে সেক্যুলার বিদ্রোহীদের পরাস্ত করে রাশিয়া, এরপর পালা আসে কট্টর ইসলামপন্থীদের।
চেচনিয়ায় সাফল্য নিয়ে মস্কো ফেরেন সুরভিকিন। এরপর তিনি নিয়োজিত হন সিরিয়ায়। গৃহযুদ্ধে পরাজয়ের মুখে থাকা বাশার আল আসাদের সরকারকে রক্ষায় সেখানে সামরিক বাহিনী পাঠান পুতিন।
বিমান আক্রমণ পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও, বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত শহরে ব্যাপক বোমাবর্ষণের ভার সুরভিকিনকেই দেওয়া হয়। অন্যদিকে, স্থলভাগে বাশার বাহিনীর সহযোগী ছিল হিজবুল্লাহ ও ইরানি সেনারা।
আকাশ ও স্থলপথের এই সাহায্য পেয়ে গদি রক্ষা হয় আসাদ সরকারের। আর চরম মূল্য দেয় সিরিয়ার বেসামরিক জনগণ। বিমান হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় ঐতিহাসিক নগরী আলেপ্পোসহ অন্যান্য শহর।
২০২০ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, বেসামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামোয় হামলা ছিল রুশ বাহিনীর প্রধান কৌশল। সুরভিকিনের নির্দেশে সিরিয়ায় বাড়িঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও বাজারে হামলা করা হয়েছে। ধ্বংস করা হয়েছে জীবন ও জীবিকা।
একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি এখন ইউক্রেনে ঘটছে। নতুন বাহিনী গঠনের আগে পুতিনের দরকার সময় এবং অধিকৃত এলাকার দখল ধরে রাখা। ১৯৬০-এর দশকে একজন আমেরিকান জেনারেল যেমন বলেছিলেন, ভিয়েতনামকে রক্ষা করতে হলে (সমাজতন্ত্রের হাত থেকে) আমাদের আগে দেশটিকে ধ্বংস করতে হবে। গণতান্ত্রিক পশ্চিমাদের হাত থেকে ইউক্রেনকে বাঁচাতেও পুতিনকেও একই কাজ করতে হবে।
আর সেটাই যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে সুরভিকিনই এ কাজের যোগ্যতম ব্যক্তি।
- সূত্র: এশিয়া টাইমস অবলম্বনে
