ঢাকার ফলমেলায় বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় ফল দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড়
আম, কাঁঠাল, লিচু ও জাম পরিচিত দৃশ্য হতে পারে, তবে কাউফল, ডেউয়া, গাব, বিলিম্বি, আতা, যজ্ঞ ডুমুর এবং লুকলুকির মতো কম পরিচিত ফলগুলোই এ বছরের জাতীয় ফল মেলায় দর্শনার্থীদের সবচেয়ে বেশি কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
অনেক দর্শনার্থী এসব ফলের নাম জীবনে প্রথমবারের মতো শুনেছেন, আবার অন্যরা শৈশবের স্মৃতিচারণায় মগ্ন হয়ে পড়েছেন।
আজ (১৮ জুন) ঢাকার ফার্মগেট এলাকার কেআইবি কমপ্লেক্সে শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী জাতীয় ফল মেলায় এমনই দৃশ্য দেখা গেছে। মেলাটি জনপ্রিয় ও প্রায় বিস্মৃত দেশীয় ফলগুলোকে এক ছাদের নিচে নিয়ে এসেছে।
মেলায় প্রবেশ করতেই দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায় ১০০টিরও বেশি দেশীয় ও বিদেশি ফলের চমৎকার প্রদর্শনী।
আম, কাঁঠাল, লিচু ও জামের মতো পরিচিত ফলের পাশাপাশি এমন অসংখ্য ফলও প্রদর্শিত হয়েছে, যেগুলো এখনো নগর এলাকার ভোক্তাদের কাছে অনেকটাই অপরিচিত।
পরিবার নিয়ে বাড্ডা থেকে মেলায় আসা জয়নাল আবেদিন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'আমি আমার সন্তানদের ফল মেলায় নিয়ে এসেছি, কারণ শহরে বড় হওয়ার কারণে তারা এসব ফলের অনেকগুলোই কখনো দেখেনি। এমনকি আমাদের কাছেও এগুলো শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। আবার এগুলো দেখতে পেরে খুব ভালো লাগছে।'
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের স্টলেই সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা যায়, কারণ সেখানে প্রায় ৫০টি বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় ফলের প্রজাতি প্রদর্শন করা হয়েছে।
কাউফল, করমচা, ডেউয়া, আঁশফল, গাব, যজ্ঞ ডুমুর, চাম্বুল, আতা, চালতা, অরবরই, বিলিম্বি, শরিফা, সাতকরা, তৈকর, ডেফল, লুকলুকি, বৈচি ও মুনিয়ার মতো ফল দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে।
সাভারের রাজালক্ষ উদ্যানতত্ত্ব কেন্দ্রের উদ্যানতত্ত্ববিদ এবং স্টলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জামিউল ইসলাম বলেন, 'এখানে পরিচিত ও অপরিচিত—উভয় ধরনের ফল প্রদর্শন করা হয়েছে। এসব ফলের অধিকাংশই দেশের বিভিন্ন উদ্যানতত্ত্ব কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত। এগুলো সম্পর্কে জানার জন্য দর্শনার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে।'
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশে প্রায় ১৩০ প্রজাতির কম ব্যবহৃত ফল রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০টি প্রজাতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মায় এবং সীমিত পরিসরে চাষ করা হয়।
এসব ফল সংরক্ষণ ও জনপ্রিয় করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২০২০ সালে প্রায় আড়াই কোটি টাকার বাজেটে তিন বছর মেয়াদি একটি কর্মসূচি চালু করে। এর ফলে বিলুপ্তপ্রায় কয়েকটি ফলের প্রজাতি আবার চাষাবাদের আওতায় ফিরে এসেছে।
মেলার উদ্বোধনকালে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা মো. আমিনুর রশিদ বলেন, বাংলাদেশ ফল উৎপাদনে এক ধরনের বিপ্লব প্রত্যক্ষ করেছে।
তিনি বলেন, যেসব ফল একসময় আমদানি করতে হতো, এখন সেগুলো দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। এর ফলে স্থানীয় চাহিদা পূরণ হচ্ছে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমছে।
তিনি আরও বলেন, 'আম, আনারস ও কাঁঠাল ইতোমধ্যেই রপ্তানি হচ্ছে। খুব শিগগিরই ড্রাগন ফলসহ আরও কয়েকটি ফল রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হবে।'
মেলার উল্লেখযোগ্য আকর্ষণগুলোর মধ্যে ছিল কাঁঠাল থেকে তৈরি মূল্য সংযোজিত বিভিন্ন পণ্য।
গাজীপুরের উদ্যোক্তা চুমকি জানান, তিনি বর্তমানে কাঁঠাল থেকে ২২ ধরনের পণ্য তৈরি করেন। এর মধ্যে রয়েছে কাশ্মীরি আচার, চিপস ও কাবাব। অনলাইন ক্রেতাদের কাছ থেকে এসব পণ্যের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
ফলের রাজা আমও মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল।
দর্শনার্থীরা ল্যাংড়া, আম্রপালি, নাগ ফজলি, বারি-৪, হারিভাঙ্গা ও সূর্যপুরীর মতো জনপ্রিয় দেশীয় জাতের আমের পাশাপাশি থাই ক্যাটিমন, হানি ভিউ, কলা আম, মিয়াজাকি, আপেল আম এবং চকাপাতের রাজা নামের আমদানিকৃত ও উন্নত জাতগুলোও ঘুরে দেখেছেন।
মেলাটি দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ সৃষ্টি করেছে।
সাউথ পয়েন্ট স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাজমুল হোসেন বলেন, 'এক জায়গায় এত রকমের ফল খুব কমই দেখা যায়। আমার শুধু ইচ্ছা, প্রদর্শিত ফলগুলোর কিছু যদি কেনার জন্যও পাওয়া যেত।'
লালমাটিয়া থেকে মেয়েকে নিয়ে মেলায় আসা রাবেয়া বেগম বলেন, 'আমরা নিয়মিত বাজার থেকে ফল কিনি। তবে আমি চেয়েছিলাম আমার মেয়ে বাংলাদেশে বিদ্যমান ফলের অবিশ্বাস্য বৈচিত্র্য নিজ চোখে দেখুক।'
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুর রহিম বলেন, এই মেলার লক্ষ্য হলো ভোক্তাদের মধ্যে দেশীয় ফল সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
তিনি উল্লেখ করেন, আম, কাঁঠাল, পেয়ারা এবং আরও কয়েকটি ফল ইতোমধ্যেই রপ্তানি হচ্ছে। রপ্তানি আরও বাড়লে কৃষকেরা ভালো দাম পাবেন এবং বেশি লাভবান হবেন।
এ বছরের জাতীয় ফল মেলায় ৭৮টি স্টল রয়েছে। ফল চাষ, পুষ্টি, প্রক্রিয়াজাত শিল্প, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং রপ্তানি সম্ভাবনা তুলে ধরার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।
এই আয়োজনটি দেখিয়ে দিচ্ছে যে বাংলাদেশের ফল খাত এখন শুধু উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি কৃষক, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তাদের জন্য নতুন নতুন সুযোগও সৃষ্টি করছে।
