৫ কার্যদিবসেই বিচার: শিশু রামিসা হত্যা মামলার রায়ের ৪০ মিনিট
ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক ১১টা। এজলাসজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী ও গণমাধ্যমকর্মীদের সরগরম অবস্থা। ঠিক সময়ে এজলাসে আগে থেকে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় বিচারকের ব্যক্তিগত সহকারী সবাইকে থামিয়ে সুরে টান দিয়ে ঘোষণা করলেন— 'বিচারক আসছেন...'। এরপরই বিচারক এজলাসে তার জন্য নির্ধারিত চেয়ারে এসে বসলেন।
আজ (৭ জুন) রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা মামলার রায় ঘোষণা হবে। দিনের কার্যক্রমের সূচনা করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। তিনি আদালতকে বলেন, 'আজ মামলাটি রায় ঘোষণার জন্য নির্ধারিত আছে। আমরা প্রস্তুত আছি।' এ সময় ট্রাইব্যুনাল বলেন, 'রায় ঘোষণা করতে আমি প্রস্তুত।' এরপর তিনি রায় পড়া শুরু করেন।
ইতোমধ্যে আদালতের এজলাস কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু, আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমুল্লাহ, মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী, রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা, সাধারণ আইনজীবী ও মিডিয়াকর্মীদের উপস্থিতিতে তিল ধারণের জায়গা ছিল না।
আদালতের রায় শোনাতে মামলার দুই আসামি সোহেল রানাকে পৌনে ১১টায় ও স্বপ্না আক্তারকে ১০টা ৫৫ মিনিটে আদালতে হাজির করা হয়। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ হাজতখানা থেকে আদালতে নেওয়ার পথে পুলিশ কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আসামিদের সামনের দিকে ৫০ জন এবং পেছনের দিকে ৫০ জনেরও বেশি পুলিশ সদস্য নিরাপত্তা কাজে নিযুক্ত ছিলেন।
এজলাসে ওঠানোর পর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আইনজীবীরা তাদের 'খুনি খুনি' বলে দুয়োধ্বনি দেন। অনেকে বিরূপ মন্তব্যও করেন।
কাঠগড়ায় আসামি সোহেল রানাকে হেলমেট পরিয়ে হাত পেছনে করে হাতকড়া লাগানো ছিল। স্বপ্নার হাতে হাতকড়া না থাকলেও মাথায় নিরাপত্তা হেলমেট পরানো ছিল। বিচারক রায় পড়া শুরু করলে সবাই একাগ্রচিত্তে তা শুনতে থাকেন। রায় পড়াকালীন পুরোটা সময় রামিসার বাবা মাথা নিচু করে বসে ছিলেন।
আসামি সোহেল রানা রায় চলাকালীন কাঠগড়ায় নির্বিকার দাঁড়িয়ে ছিল। রায় ঘোষণার আগে থেকেই তাকে দোয়া পড়তে দেখা যায়। তাকে কখনো কখনো দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াতেও দেখা যায়। তার ভেতরে কোনো অনুশোচনা লক্ষ্য করা যায়নি। রায় ঘোষণার পর আসামিকে পানি পান করতে দেখা যায়।
আসামি স্বপ্না আক্তারকে কাঠগড়ায় একটি প্লাস্টিক টুলে বসানো হয়। তাকে বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। কখনো কখনো তাকে চোখ মুছতেও দেখা গেছে। বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে ফাঁসির রায় ঘোষণা করলে হাততালি দিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন এজলাস ও এজলাসের বাইরে থাকা সাধারণ আইনজীবীরা।
রায় ঘোষণা শেষে সাজা পরোয়ানা দিয়ে আবারও তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে নেওয়ার সময়ও পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে তাদের প্রিজনভ্যানে ওঠানো হয়।
আদালত রায়ে আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্নাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। পাশাপাশি সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা ও স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা জরিমানাও করেন। এই টাকা আদায় করে রামিসার উত্তরাধিকারীদের প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে সোহেল রানা ও স্বপ্নার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে সেই টাকা রামিসার পরিবারকে বুঝিয়ে দিতে জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর মাত্র ৫ কার্যদিবসের মধ্যে রায় ঘোষণা করলেন আদালত। বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এত স্বল্প সময়ে রায় ঘোষণার ঘটনা এটাই প্রথম।
