রাজস্ব বাড়াতে নগদ লেনদেনকে ডিজিটাল ও ব্যাংকিং চ্যানেলে আনার উদ্যোগে ডিসিদের যুক্ত করা হবে
রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে জেলা পর্যায়ের নগদ অর্থ লেনদেনকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল ও ব্যাংকিং চ্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
৩ মে থেকে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শুরু হচ্ছে জেলা প্রশাসক সম্মেলন ২০২৬। সেখানে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ডিসিদের নির্দেশনা দেওয়া হবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
কর্মকর্তারা জানান, চিকিৎসক, আইনজীবী, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মতো পেশাদার ও সেবা প্রদানকারীদের পয়েন্ট অভ সেল (পিওএস) মেশিন ও ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা হবে। পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রশাসনিক নজরদারির মাধ্যমে বাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য দৈনন্দিন লেনদেনকেও ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) অফিস ও পাসপোর্ট অফিসের লেনদকেও আনুষ্ঠানিক আর্থিক চ্যানেলের আওতায় আনার জন্য জেলা প্রশাসকরা কাজ করবেন।
আজ (৩ মে) থেকে শুরু হচ্ছে জেলা প্রশাসক সম্মেলন ২০২৬। চার দিনব্যাপী এই সম্মেলনে আলোচনার জন্য ৪৯৮টি প্রস্তাব জন্য বাছাই করা হয়েছে। বাছাই করা প্রস্তাবগুলোর মধ্যে শীর্ষ ২০ প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে কর সংগ্রহ-সংক্রান্ত এই প্রস্তাবটি।
এতদিন শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকই সরাসরি নাগরিকদের ডিজিটাল ও ব্যাংকিং চ্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করার প্রচারণা চালিয়ে এসেছে। পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর-সংক্রান্ত বিভিন্ন নীতিমালার মাধ্যমে নগদ লেনদেন নিরুৎসাহিত করে ব্যাংকিং চ্যানেল ও ডিজিটাল লেনদেনকে উৎসাহিত করেছে।
নতুন উদ্যোগের আওতায় ডিসিরা তাদের অধীনস্থ জেলায় যেসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকে ও পিওএসে লেনদেন করার সুযোগ আছে, তাদের লেনদেনগুলো এসব আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে করার উদ্যোগ নেবেন। সম্মেলনে উল্লেখিত প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি ছাড়াও অন্যান্য খাতের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে সুপারিশ আসতে পারে। সেগুলো গ্রহণযোগ্য হলে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন টিবিএসকে বলেন, এটি খুব প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। 'ফরমাল চ্যানেলে লেনদেন নিশ্চিত করা গেলে কার কত আয়, সেটি বোঝা যাবে।'
তিনি আরও বলেন, 'জেলা পর্যায়ে অনেক ব্যক্তি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের আয় করযোগ্য হলেও তারা করের আওতায় নেই। আবার অনেকের প্রকৃত আয় প্রদর্শিত হয় না। লেনদেনগুলো ফরমাল চ্যানেলে নিশ্চিত করা গেলে ফাঁকি বন্ধ হবে, আবার করের আওতাও বাড়বে। এই বিবেচনায় রাজস্ব বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যারা করজালে নেই, তাদের কর নিয়ে ভয় থাকে। ফলে জেলা প্রশাসন ও রাজস্ব বিভাগের লোকজনকে সচেতন করতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে করের আওতাভুক্ত হওয়া ভয়ের কিছু নয়।'
অনেক বছর ধরেই এনবিআর করের আওতা বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও প্রকৃত করদাতা বিশেষ বাড়েনি। প্রায় এক কোটি নাগরিক আয়কর রিটার্ন দাখিল করলেও কর দেন প্রায় ৩৫ লাখ নাগরিক। এনবিআরের এক জরিপে বলা হয়েছে, দেশে করযোগ্য লোকের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি।
সম্প্রতি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, রাজস্ব শৃঙ্খলা আনতে করের আওতা বাড়ানো দরকার। এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয় এ নিয়ে পরিকল্পনা ও কাজ করছে। আগামী বাজেট ও পরবর্তী বছরে বিষয়গুলো পরিস্কার হবে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এনবিআর রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতিতে পড়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ৫.৮৮ লাখ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকা করার পরিকল্পনা করছে সরকার। এজন্য কর বাড়ানোর পাশাপাশি কর-বহির্ভূত রাজস্ব বাড়ানোরও পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
