আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় চাপে রেস্তোরাঁ খাত, এনবিআরের সঙ্গে বৈঠকের পরদিনই ‘একযোগে অভিযানের’ অভিযোগ
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও হয়রানির অভিযোগ তুলে রেস্তোরাঁ খাতের উদ্যোক্তারা বলেছেন, নীতিগত সহায়তার বদলে উল্টো চাপ বাড়ানো হচ্ছে তাদের ওপর। বাজেট-পূর্ব আলোচনার পরদিনই ভ্যাট-অনুগত (কমপ্লায়েন্ট) রেস্তোরাঁগুলোতে একযোগে অভিযান চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
আজ বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) আয়োজিত পরামর্শক কমিটির সভায় এসব অভিযোগ করেন বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সভায় বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, 'যেদিন আমরা এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে বাজেট আলোচনা করে আসলাম, তার পরদিনই আমাদের যেসব রেস্তোরাঁ ভ্যাটে কমপ্লায়েন্ট, সেগুলোতে একযোগে অভিযান শুরু হয়। এতে আমাদের বিক্রি ৩০-৪০ শতাংশ কমে গেছে।'
তার অভিযোগ, প্রশাসনিক চাপ ও মাঠ পর্যায়ের হয়রানির কারণে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, 'একদিকে ভ্যাট বাড়ানোর চাপ, অন্যদিকে অনিয়মিত অভিযান—এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা বন্ধ করা ছাড়া বিকল্প থাকবে না।'
সরকারের প্রতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাবান্ধব করনীতি প্রণয়ন করে ভ্যাট প্রশাসনে হয়রানি বন্ধ করা এবং সেই সঙ্গে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ করার আহ্বান জানান তিনি।
ইমরান হাসান বলেন, 'প্রাইভেট সেক্টরের কথা না শুনলে এই খাত টিকবে না।'
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই
ইমরান হাসান বলেন, 'দেশে প্রায় ৪ লাখ ৮২ হাজার রেস্তোরাঁ থাকলেও বড় অংশই করের বাইরে। তাদের সংগঠনের সদস্য প্রায় ৬০ হাজার। যারা ভ্যাট দিচ্ছে তাদের ওপরই চাপ বেশি। পাশের দোকান ভ্যাট দেয় না, লাইসেন্স নেই—তাদের ওপর কোনো চাপ নেই। এতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না।'
ভ্যাট কমিয়ে কর বাড়ানোর প্রস্তাব
ভ্যাটের হার না বাড়িয়ে বরং কমানোর এবং ভ্যাটের সঙ্গে সমন্বয় করে আয়কর আদায়ের প্রস্তাব করেন তিনি।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ করব্যবস্থা চালু
রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব বলেন, 'ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বর্তমান সিস্টেম এত জটিল যে তাদের অ্যাকাউন্ট্যান্ট রাখতে হয়, অডিট করাতে হয়—এতে তারা টিকতে পারছে না।'
কর্পোরেট আগ্রাসনের অভিযোগ
রেস্তোরাঁ খাতে বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রবেশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব বলেন, 'বড় কোম্পানিগুলো কম দামে পণ্য এনে বাজারে আধিপত্য তৈরি করছে, ফলে ছোট উদ্যোক্তারা অসম প্রতিযোগিতায় পড়ছেন।'
নীতিগত সংস্কারের দাবি
কর্পোরেট আগ্রাসনের বিষয়টি জোর দিয়ে তুলে ধরে তিনি বলেন, 'দেশে রেস্তোরাঁ খাতে বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রবেশ, ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৩০ হাজার কোটি টাকার টার্নওভার থাকা একটি বড় কর্পোরেট গ্রুপ এখন বিরিয়ানি ব্যবসার মতো খাতে নামছে। এতে আমরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছি।'
তিনি আরও বলেন, এসব বড় প্রতিষ্ঠান আমদানি সুবিধা ও আর্থিক সক্ষমতা ব্যবহার করে কম দামে পণ্য সরবরাহ করতে পারে, যা ছোট ব্যবসায়ীদের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে বাজারে 'আনহেলদি কম্পিটিশন' তৈরি হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি রেস্তোরাঁগুলো টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে, রেস্তোরাঁ খাতে নীতিগত সুরক্ষা এবং সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইমরান হাসান বলেন, 'আপনি যখন বিরোধী দলে ছিলেন, তখন বলেছিলেন আমরা স্রোতের বিপরীতে ব্যবসা করি। সবাইকে সিস্টেমেটিক্যাল চোর বানিয়ে রাখা হয়েছে। হ্যাঁ, আমি চুরি করি—আপনি আমাকে চুরি করতে বাধ্য করছেন, কারণ আমাকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দেননি। এর থেকে বের হওয়ার রাস্তা কী?'
তিনি বলেন, 'এই আমলাতন্ত্র কোনো সময়ই আমাদের বের হতে দেবে না। যখন তারা সেখানে (সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে) থাকে, তখন বড় বড় কথা বলে, কিন্তু কোনো সিস্টেম করতে পারে না। আর যখন অবসরে যায়, তখন বলে—হ্যাঁ, আপনারা আসলেই ভুক্তভোগী, আপনাদের এটা করা উচিত ছিল। রাজনীতিবিদরাও একই রকম।'
এ কথা শোনার পর অর্থমন্ত্রী বলেন, 'আপনি যে কথা বলেছেন, তার সঙ্গে আমি একমত। আপনি এখন আপনার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিন।'
