আওয়ামী নেতাদের জামিন, বরিশালে আইনজীবীদের আন্দোলনে টানা ৩ দিন বিচার কার্যক্রমে স্থবিরতা
কেরানীগঞ্জ থেকে হাজিরা দিতে এসেছেন আমিন। পরপর দুদিন তিনি আদালতে এসেও দাপ্তরিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারেননি। তার আইনজীবী আদালত বর্জন করায় মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েছেন এই যুবক। আমিন বলেন, 'মামলা খারিজের দিন ধার্য ছিল মঙ্গলবার। সেদিন আইনজীবী সমিতির সভাপতি গ্রেপ্তার হওয়ায় আমার নিযুক্ত আইনজীবী আদালতে যাননি। বুধবারও এসে বসে আছি কিন্তু তিনি আসেননি। আমি অসহায়ের মতো আদালত চত্বরে সকাল থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত ছিলাম। তারপর চলে এসেছি।'
শুধু আমিন নন, এমন সহস্রাধিক মানুষ টানা তিনদিন ধরে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন। মূলত আওয়ামী লীগ নেতাকে জামিন দেওয়াকে কেন্দ্র করে বরিশাল আদালতে টানা তিনদিন ধরে আদালত বর্জন কর্মসূচি পালন করছেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। এতে বরিশাল আদালতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। যদিও বরিশালের সবগুলো আদালত খোলা ছিল এবং এজলাসের দাপ্তরিক কার্যক্রম চলতে দেখা গেছে। অনেকগুলো আদালতে বিচারপ্রার্থীরা আইনজীবীদের অনুপস্থিতিতে নিজেরাই আদালতের কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন।
ঘটনার শুরু হয় গত সোমবার। বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জামিন লাভ করেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুস। বিষয়টি নিয়ে ওইদিনই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান বিএনপিপন্থি আইনজীবী ও আইনজীবী সমিতির নেতারা। তারা বিচারককে 'ঘুষখোর' আখ্যা দিয়ে এবং ইউনুসের জামিন বাতিলের দাবিতে মঙ্গলবার আদালত বর্জন কর্মসূচির ডাক দেন। এতে অনেকে সাড়া না দিয়ে বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নিলে মঙ্গলবার দুপুরে আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকনসহ কয়েকজন আইনজীবী অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এজলাসে ঢুকে বিচারিক কাজে বাধা দেন এবং ভাঙচুর চালান। এছাড়া বিচারককে তার চেয়ার থেকে উঠে যেতে বাধ্য করেন।
এ ঘটনায় আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাজীব মজুমদার কোতোয়ালী মডেল থানায় ১২ জনের নাম উল্লেখ করে দ্রুত বিচার আইনে মামলা করেন। মামলার সূত্র ধরে ওইদিন দুপুরে প্রধান আসামি ও আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও অনির্দিষ্টকালের জন্য আদালত বর্জনের ডাক দেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। ওইদিন বিকেলেই লিংকনকে কারাগারে পাঠানো হয়।
জেলা জজ আদালতের কৌশলী আবুল কালাম আজাদ বলেন, 'সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে আমাদের আইনজীবী সমিতির সভাপতিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে আমাদের কর্মসূচি চলমান। যতদিন জামিন না হবে ততদিনে আমরা কাজে ফিরব না।'
বিএনপিপন্থি আইনজীবী মহসিন মন্টু বলেন, 'আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে যোগসাজশ করে আদালত কম্পাউন্ডে চেম্বার থেকে আইনজীবী সমিতির সভাপতিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একটি বানানো ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। আমরা এর প্রতিবাদে আদালত বর্জন কর্মসূচিতে রয়েছি।'
এদিকে এ ঘটনায় ৯ আইনজীবীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে রুল জারি করেছে আদালত। এছাড়া ১২ জন আইনজীবীর সনদ বাতিলের আবেদন করা হয়েছে। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সচিব বরাবর ১২ আইনজীবীর সনদ বাতিলের আবেদন করেছেন বরিশাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জহির উদ্দিন। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) তিনি এই আবেদন করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেলা ও দায়রা জজ আদালতের ৪৫টি কোর্টের কোনোটিতেই আইনজীবীরা যাননি। তবে বিচারপ্রত্যাশীরা সরাসরি আসার কারণে বেশ কয়েকটি কোর্টের কার্যক্রম চলমান ছিল। যার মধ্যে সিএমএম আদালতের ৫টি কোর্ট, ১১টি ট্রাইব্যুনাল ও ১২টি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত উল্লেখযোগ্য। তবে জজ কোর্টের ১৭টি কোর্টে বিচারপ্রত্যাশী কম থাকায় সেখানে কার্যক্রম তেমন একটা ছিল না।
সিএমএম কোর্টের নাজির কামরুল ইসলাম জানান, বিচারপ্রত্যাশীরা আসার কারণে কোর্ট সচল রয়েছে। আইনজীবীরা না এলেও মামলার বাদী-বিবাদীদের নিজেদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার সুযোগ করে দিচ্ছেন বিচারকরা। এতেই মিলছে জামিন। সিএমএম, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও ট্রাইব্যুনালের তালিকাভুক্ত ৫৭ মামলার মধ্যে ৪০টিরই শুনানি হয়েছে। এর মধ্যে সিএমএম কোর্টের ২৭ মামলার মধ্যে ২০টির শুনানি হয়, যার ৪টিতে জামিনও দেওয়া হয়েছে।
