ঢাবির এআই কোর্সে মনোনীত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৩০ কর্মকর্তার সবাই পুরুষ, ‘নিরাপত্তা’ ইস্যুতে বাদ পড়লেন নারীরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত 'অ্যাপ্লাইড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স' কোর্সে অংশ নিতে ৩০ জন কর্মকর্তাকে নির্বাচন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে প্রথম ব্যাচে কোনো নারী কর্মকর্তা সুযোগ পাননি। ব্যাখায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ক্লাস রাতে শেষ হওয়ায় নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রথম ব্যাচে নারী কর্মকর্তাদের রাখা হয়নি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ আয়োজিত ১২ সপ্তাহব্যাপী 'অ্যাপ্লাইড এআই ফর সেন্ট্রাল ব্যাংক অফিসিয়ালস' কোর্সটি আগামী ২০ জুলাই শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ কোর্সে আবেদনকারী ৪৭৩ কর্মকর্তার মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশই ছিলেন নারী।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হাতে আসা নির্বাচিত ৩০ কর্মকর্তার তালিকাটি বাংলাদেশ ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ-২ (এইচআরডি-২) গত ১৩ জুলাই প্রকাশ করে। তালিকায় ১৮ জন অতিরিক্ত পরিচালক, আটজন যুগ্ম পরিচালক এবং চারজন সহকারী পরিচালক রয়েছেন। তাদের সবাই পুরুষ।
এর আগে গত ২ জুলাই এইচআরডি-২ এক সার্কুলারের মাধ্যমে কোর্সটির জন্য আবেদন আহ্বান করে। আগ্রহী কর্মকর্তাদের ৬ জুলাইয়ের মধ্যে আবেদন করতে বলা হয়।
সহকারী পরিচালক থেকে অতিরিক্ত পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তারা এ কোর্সে আবেদনের জন্য যোগ্য ছিলেন।
সপ্তাহে দুই দিন—সোমবার ও বুধবার—সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত কোর্সটির ক্লাস অনুষ্ঠিত হবে। কোর্সে যাতায়াতের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ক্লাসপ্রতি ৭০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কোনো লিখিত পরীক্ষা বা সাক্ষাৎকার ছাড়াই মানবসম্পদ বিভাগ চূড়ান্ত তালিকাটি প্রস্তুত করেছে।
এ বিষয়ে টিবিএসের প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, গভর্নর মোস্তাকুর রহমান অংশগ্রহণকারী নির্বাচনের দায়িত্ব মানবসম্পদ বিভাগ-২-কে দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, "তালিকা তৈরির দায়িত্ব এইচআরডি-২-কে দেওয়া হয়েছিল এবং গভর্নর বিভাগটিকে স্বাধীনভাবে কর্মকর্তা নির্বাচনের নির্দেশ দেন।"
প্রথম ব্যাচে কোনো নারী কর্মকর্তা না থাকার কারণ ব্যাখ্যা করে আরিফ বলেন, "এইচআরডি-২-এর পরিচালক নাসিমা সুলতানা মনে করেছেন, বর্ষাকালে অফিসের বাইরে সন্ধ্যার কোর্সে অংশ নেওয়া নারী কর্মকর্তাদের জন্য অসুবিধা তৈরি করতে পারে। তাই প্রথম পর্যায়ে তাদের অন্তর্ভুক্ত না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।"
তিনি আরও বলেন, প্রথম ব্যাচের কোর্স শেষ হলে দ্বিতীয় পর্যায়ে নারী কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
প্রকাশিত তালিকায় আরও দেখা গেছে, নির্বাচিত ৩০ কর্মকর্তার সবাই বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত। মতিঝিল অফিস, সদরঘাট অফিস কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমি থেকে কাউকে সুযোগ দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ-১ ও ২ ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, কোর্সে কোন কর্মকর্তারা মনোনয়ন পাবেন, তা মানবসম্পদ বিভাগ নির্ধারণ করলেও শুধু পুরুষদের নিয়ে ব্যাচ গঠনের সিদ্ধান্তটি ব্যাংকের ভেতরে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
নারী কর্মকর্তাদের অসন্তোষ
বাংলাদেশ ব্যাংকের নারী কর্মকর্তাদের মধ্যেও এ সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'অ্যাপ্লাইড এআই' কোর্সে আবেদন করেছিলেন—এমন কয়েকজন নারী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।
তারা জানান, কোর্সে অংশ নিতে আবেদন করলেও বাছাইপ্রক্রিয়া সম্পর্কে তাদের কিছু জানানো হয়নি। পরে মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে তারা জানতে পারেন, ক্লাস রাতে শেষ হবে এবং নারী কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় তাদের প্রথম ব্যাচে রাখা হয়নি।
এক নারী কর্মকর্তা বলেন, "চূড়ান্ত তালিকা দেখে আমি অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছি। নির্বাচিত ৩০ কর্মকর্তার একজনও নারী নন—এটি সত্যিই হতাশাজনক। এমন মানদণ্ডে তালিকা তৈরি করা বৈষম্য তৈরি করে। ৩০ জন পুরুষকে রেখে একজন নারী কর্মকর্তাকেও না রাখা কোনোভাবেই যৌক্তিক বলে মনে হয় না।"
আরেক নারী কর্মকর্তা এ সিদ্ধান্তের যুক্তি নিয়েই প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, "আমরা প্রায়ই বাংলাদেশ ব্যাংকে রাত ৯টা, এমনকি ১১টা পর্যন্ত কাজ করি। অফিস শেষে বাসায় ফেরার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমাদের কোনো পরিবহন সুবিধা দেয় না। নিজেদেরই ব্যবস্থা করতে হয়। তখন নারী কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক কেন বিবেচনা করে না?"
তিনি আরও বলেন, "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস রাত সাড়ে ৮টায় শেষ হলেও সবাই নিজ দায়িত্বে বাসায় ফিরতে পারবেন। রাতে অসুবিধা হতে পারে—এই যুক্তিতে নারী কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।"
চূড়ান্ত তালিকা দেখার পর থেকেই হতাশ বোধ করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, "সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কর্মকর্তাদের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত; নারী না পুরুষ—সে পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করা উচিত নয়।"
আরেক নারী কর্মকর্তা বলেন, পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করেই তিনি কোর্সটিতে আবেদন করেছিলেন।
তিনি বলেন, "আমাকে কোনো লিখিত পরীক্ষা বা সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হয়নি। নির্বাচিত না হওয়া নিয়ে আমার আপত্তি নেই। তবে চূড়ান্ত তালিকায় একজন নারী কর্মকর্তাও নেই—বিষয়টি নজরে এসেছে।"
