রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশে অস্থিরতা এড়ানো সম্ভব: গোয়েন লুইস
বাংলাদেশে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা গেলে অতিরিক্ত মেরুকরণ এবং সম্ভাব্য অস্থিরতা এড়ানো সম্ভব হবে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী
গোয়েন লুইস।
আজ বুধবার (৪ জুন) জাতীয় প্রেসক্লাবে ডিপ্লোম্যাটিক করেসপেন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত ডিক্যাব টক অনুষ্ঠানে গোয়েন লুইস এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, "তবে অবশ্যই এটি (রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা) দেশের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করতে হবে। এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং সরকারের সিদ্ধান্ত।"
একজন সাংবাদিক জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ না করার সুপারিশের প্রসঙ্গ তুললে গোয়েন লুইস এ মন্তব্য করেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের ওই প্রতিবেদনে বিচার ও জবাবদিহি, নিরাপত্তা বাহিনীর আচরণ, নাগরিক অধিকার, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক শাসন কাঠামোতে কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এতে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ না করার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছিল, এটি গণতন্ত্রকে দুর্বল করবে এবং ভোটারদের একটি বড় অংশকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত করবে।
এ বিষয়ে জাতিসংঘের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক বলেন, তারা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নন, বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতিকে সমর্থন করেন, যেখানে সব নাগরিকের ভোটাধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।
তিনি আরও বলেন, "জাতিসংঘের দৃষ্টিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন মানে হলো সমাজের সব অংশের মানুষ যেন ভোট দিতে পারে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে।"
এসময় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে গোয়েন লুইস বলেন, "আমি আওয়ামী লীগ বা বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কোনো মন্তব্য করছি না। আমি বোঝাতে চাইছি, জাতিসংঘ রাজনীতিতে সম্পৃক্ত নয়। এই প্রশ্ন করতে হবে সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে।"
লুইস বলেছেন, বাংলাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে জাতিসংঘ কোনো ভূমিকা পালন করতে পারে না। নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশে জনগণ এবং রাজনৈতিক দলগুলো সিদ্ধান্ত নেবে কখন নির্বাচন হবে।
বাংলাদেশ গত জুলাই ও আগস্টে মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের কথা বলা আছে। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে গোয়েন লুইস বলেন, নারী-পুরুষ ও জাতিসত্তা নির্বিশেষে সমাজের সকল অংশের নাগরিক ভোট দিতে পারা উচিত।
তিনি বলেন, "অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন মানে হচ্ছে, সমাজের প্রত্যেক অংশই যেন ভোট দিতে পারে–নারী, ১৮ বছর বয়সী, নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়–অন্তর্ভূক্তিমূলক দিয়ে আমরা এটাই বোঝাই। তবে প্রত্যেকের নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রবেশাধিকার ও সক্ষমতা যেন থাকে।"
তখন এক সাংবাদিক জানতে চান, "তার মানে এটা কোনো রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়?"
উত্তর জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক বলেন, "না।"
বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে রাখাইনে মানবিক সহায়তার জন্য করিডর প্রতিষ্ঠায় কাজ করছিল (বাংলাদেশ) সরকার। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জাতিসংঘ জড়িত নয় বলেও জানান তিনি।
রাখাইনে মানবিক করিডরে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে জানতে চাইলে গোয়েন লুইস বলেন, 'যেকোনো ধরনের আন্তসীমান্ত সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ, সংঘাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের সহায়তা করার জন্য যেকোনো ধরনের উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। জাতিসংঘ এ বিষয়ে সহায়তা করবে। কিন্তু এ ধরনের কোনো মানবিক করিডর নেই। আমরা করিডর–সংক্রান্ত কোনো ধরনের আলোচনায়ও নেই।'
জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী বলেন, মানবিক করিডর একটি আনুষ্ঠানিক ও আইনি বিষয়। এ ক্ষেত্রে দুটি সার্বভৌম দেশ—বাংলাদেশ সরকার এবং মিয়ানমার সরকার এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষদের আনুষ্ঠানিক সম্মতি থাকতে হবে। যদি এখানে কোনো চুক্তি হয়, তবে জাতিসংঘ সহায়তা করতে পারে। আমি যত দূর বুঝতে পারছি—এ ধরনের চুক্তি এখন পর্যন্ত হয়নি।
এসময় ঢাকায় জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক অফিস স্থাপনের বিষয়টি চূড়ান্ত জানিয়ে তিনি বলেছেন, শিগগিরই ছোট আকারে অফিস চালু হবে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাজের প্রতি সমর্থন জানিয়ে গোয়েন লুইস বলেছেন, তাদের কাজ খুবই জটিল। জাতিসংঘ মনে করে, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিতে এটি সহায়তা করবে।
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন ডিক্যাব সভাপতি এ কে এম মঈনুদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক মো. আরিফুজ্জামান মামুন।
