নতুন ঋণ চুক্তির জন্য বাংলাদেশের প্রস্তুতি মূল্যায়নে কাল ঢাকায় আসছে আইএমএফ প্রতিনিধিদল
পাঁচ দিনের সফরে আগামীকাল রোববার (১২ জুলাই) ঢাকায় আসছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল। এই সফরে সরকারের প্রস্তাবিত প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাব্যতা যাচাই করবে দলটি। এই সফরের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আইএমএফের বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনার।
সফরের প্রথম দিন আইএমএফ কর্মকর্তারা অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
সেই সঙ্গে পাঁচ দিনের এই সফরে প্রতিনিধিদলটি সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি, নীতিগত অগ্রাধিকার এবং দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও মূল্যায়ন করবে।
আগামীকালের বৈঠকে আইএমএফ সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা, রাজস্ব আদায়, ভর্তুকি সংস্কার, ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন, বিনিময় হার নীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক লক্ষ্য সম্পর্কে সরকারের অবস্থান জানতে চাইবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, নতুন ঋণ কর্মসূচির আবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে বিবেচনার আগে আইএমএফ বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবে।
কর্মকর্তারা আশা করছেন, এবারের সফরের মূল্যায়ন ইতিবাচক হলে আগামী অক্টোবরের আইএমএফ–বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার পর নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হতে পারে।
পাঁচ দিনের এই সফরে আইএমএফ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোও পর্যালোচনা করবে।
আলোচনায় রাজস্ব আদায়, করনীতি, সরকারি ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও নিয়োগ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি, সার ও খাদ্যে ভর্তুকির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, ব্যাংক রেজল্যুশন আইন বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্যিক ঋণ গ্রহণ এবং বিদেশি অর্থায়নের ঝুঁকি নিয়েও আলোচনা হবে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে আইএমএফ প্রতিনিধি দলের একটি পৃথক গোলটেবিল বৈঠকও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
গত ২৬ জুন অর্থসচিব ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে পাঠানো এক ই-মেইলে ইভো ক্রজনার লিখেছিলেন, "এটি ঋণ নিয়ে দরকষাকষির সফর নয়; বরং একটি 'তথ্য সংগ্রহকারী সফর'। এর উদ্দেশ্য হলো সরকারের নীতিগত লক্ষ্য, সংস্কার কর্মসূচি ও অগ্রাধিকার সম্পর্কে সরাসরি ধারণা নেওয়া এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে আইএমএফের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন প্রস্তুত করা।"
তিনি আরও লেখেন, "এই সফরে সংগৃহীত তথ্য ভবিষ্যতে সম্ভাব্য ঋণ আলোচনা শুরুর আগে আইএমএফের সামষ্টিক অর্থনৈতিক মূল্যায়ন ও নীতিগত ধারণার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে কোথায় কারিগরি সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে, সেটিও নির্ধারণে সহায়তা করবে।"
২০২৩ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট মোকাবিলায় আইএমএফের সঙ্গে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি করে। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় 'রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি' (আরএসএফ) থেকে অতিরিক্ত অর্থায়ন যুক্ত হওয়ায় কর্মসূচির মোট আকার দাঁড়ায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে।
তবে পাঁচ কিস্তিতে ৩.৫৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের পর গত ডিসেম্বর কর্মসূচির শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় আইএমএফ পরবর্তী অর্থছাড় স্থগিত করে। পরে ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার আগের কর্মসূচি বাতিল করে এবং আইএমএফের শর্ত মেনে নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য আবেদন করে।
ক্রজনার তার ই-মেইলে আইএমএফের সর্বশেষ 'আর্টিকেল ফোর কনসালটেশন' প্রতিবেদনের সুপারিশগুলোর কথাও উল্লেখ করেন। সেখানে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ভর্তুকি যৌক্তিক করা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং আরও বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালুর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
চিঠিতে বলা হয়, বর্তমান সরকার এসব সুপারিশ কীভাবে বাস্তবায়ন করতে চায়, তা-ও এই সফরের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে।
ক্রজনার আরও বলেন, এই সফরে আইএমএফ মূলত সরকারের মতামত শুনতে চায়। প্রতিনিধিদল সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার, সংস্কার পরিকল্পনা এবং সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলার কৌশল সম্পর্কে জানতে আগ্রহী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, সরকার বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু, মুদ্রানীতি আধুনিকীকরণ, ব্যাংক রেজল্যুশন ও আমানত সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু এবং জলবায়ু-সংক্রান্ত সংস্কারে অগ্রগতির বিষয়গুলো আইএমএফের সামনে তুলে ধরবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, এই সফরের মূল্যায়ন ইতিবাচক হলে আগামী অক্টোবরে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার পর নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হতে পারে। সরকার এ কর্মসূচির আওতায় ৪ বিলিয়ন থেকে ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ চাইছে।
