রিটেইল ব্যাংকিংয়ে বিশেষ জোর দিয়ে 'ব্যাংক খাতের অ্যামাজন' হতে চায় ব্র্যাক ব্যাংক: চেয়ারম্যান
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি সাধারণ গ্রাহকদের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে ব্যবসায়িক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক।
কোটি কোটি সুবিধাবঞ্চিত বাংলাদেশিকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে নতুন 'রিটেইল ব্যাংকিং' মিশন উন্মোচন করেছে ব্যাংকটি। তাদের এই রূপান্তরের চূড়ান্ত লক্ষ্য—'ব্যাংক খাতের অ্যামাজন' হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা।
আজ রোববার (৫ জুলাই) ব্র্যাক ব্যাংকের ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানে ব্যাংকের চেয়ারম্যান মেহেরিয়ার এম. হাসান এই ঘোষণা দেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় মেহেরিয়ার এম. হাসান বলেন, 'ব্যাংকটি তার দীর্ঘদিনের 'মিসিং মিডল' কৌশল থেকে আরও সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। এত দিন এই কৌশলের আওতায় মূলত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সেবা দেওয়া হতো। তবে এখন থেকে রিটেইল ব্যাংকিং এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরও সম্প্রসারিত করতে 'মিসিং মেজরিটি' নামের নতুন মিশন নিয়ে কাজ করবে ব্র্যাক ব্যাংক।'
মেহেরিয়ার এম. হাসান বলেন, 'মিসিং মেজরিটি ধারণার হাত ধরে আমরা ব্যাংক খাতের আমাজন হতে যাচ্ছি, যেখানে গ্রাহকেরা তাদের আর্থিক খাতের এ-টু-জেড সব ধরনের প্রয়োজন এই ব্যাংকের মাধ্যমেই মেটাতে পারবেন।'
তিনি জানান, ব্র্যাক ব্যাংক ডিজিটাল প্রযুক্তি ও ডেটা ব্যবহার করে আরও সহজ, সুলভ এবং ব্যক্তিগত চাহিদানুযায়ী ব্যাংকিং সেবা তৈরি করবে; যাতে মানুষের ভৌগোলিক অবস্থান কিংবা আয়ের উৎস যা-ই হোক না কেন, সবাই যেন সহজে আর্থিক সেবা পেতে পারেন।
চেয়ারম্যান বলেন, 'বর্তমানে বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মাত্র ২৮ শতাংশ আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করছেন। এর অর্থ হলো, দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা সত্ত্বেও প্রায় ৭২ শতাংশ মানুষ এখনও ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছেন। প্রথমবার কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করা তরুণ, নারী, অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মী, গিগ ওয়ার্কার (মুক্ত পেশাজীবী) এবং গ্রামীণ অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষ প্রচলিত ব্যাংকগুলোর সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।'
এই উদ্যোগকে ব্র্যাক ব্যাংকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির যাত্রায় এক নতুন অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করে মেহেরিয়ার এম. হাসান বলেন, 'গত ২৫ বছর ধরে ব্যাংকের 'মিসিং মিডল' কৌশলটি এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি) ব্যাংকিং খাতে আমূল পরিবর্তন এনেছে। এই সময়ে প্রায় ২০ লাখ উদ্যোক্তাকে অর্থায়ন করা হয়েছে, বিতরণ করা হয়েছে ২ লাখ কোটি টাকারও বেশি এসএমই ঋণ। এত বিশাল অঙ্কের ঋণ দিয়েও ব্যাংকটি খেলাপি ঋণের (এনপিএল) হার মাত্র ৩ শতাংশের কাছাকাছি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।'
একই অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তারেক রেফাতুল্লাহ খান।
তিনি বলেন, 'আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর এবং টেকসই অর্থায়নের মাধ্যমে ব্র্যাক ব্যাংক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে অবদান রেখে চলেছে।'
তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৩ সালে প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রায় ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ৭ শতাংশ বা ১.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এসেছে ব্র্যাক ব্যাংকের মাধ্যমে।
তারেক রেফাতুল্লাহ খান আরও জানান, ব্যাংকের বিশেষায়িত প্ল্যাটফর্ম 'তারা'-র মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৫ লাখেরও বেশি নারী গ্রাহক ও উদ্যোক্তাকে যুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকের রিটেইল ব্যাংকিং পোর্টফোলিও বা তহবিলের আকার দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার কোটি টাকায়, যা দেশের অন্যতম বৃহত্তম।
তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমানে ৮০ মিলিয়নেরও (৮ কোটি) বেশি মানুষ বিকাশ ব্যবহার করছেন। অন্যদিকে ব্র্যাক ব্যাংক বর্তমানে এক লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার একটি পোর্টফোলিও পরিচালনা করছে, যার ৮৩ শতাংশই 'টেকসই অর্থায়ন' হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ। এ ছাড়া গত ২৫ বছরে ব্যাংকের সিএসআর (প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক দায়বদ্ধতা) কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ ইতিবাচকভাবে উপকৃত হয়েছেন বলেও তিনি জানান।
