ভ্যাট, শুল্ক ও কর সংস্কারের মাধ্যমে ব্যবসায়িক বাধা দূর করার লক্ষ্য আসন্ন বাজেটে
আসন্ন জাতীয় বাজেটে ব্যবসায়ীদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তির খবর থাকছে। নতুন কোনো কর আরোপের পরিবর্তে ব্যবসা-বাণিজ্যে বিদ্যমান বাধা দূর করা এবং ট্রেড ফ্যাসিলিটেশনের ওপর জোর দিয়ে একগুচ্ছ পদক্ষেপ আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাজেট প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সূত্র অনুযায়ী, প্রস্তাবিত সংস্কারের মধ্যে রয়েছে— প্রতি মাসের পরিবর্তে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সুবিধা চালু, সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ভ্যাট নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু এবং দ্রুত বন্দর ক্লিয়ারেন্স সুবিধা আরও সহজ করা।
বিভিন্ন সূত্রের বরাত অনুযায়ি, ব্যবসায়ীদের প্রতি মাসে ভ্যাট পরিশোধের নিয়ম চালু থাকলেও তিন মাস পরপর ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। এতে বছরে ১২টি রিটার্নের পরিবর্তে মাত্র ৪টি রিটার্ন দাখিল করতে হবে। মাসিক ভিত্তিতে ভ্যাট রিটার্ন জমা দেয়, এ রকম প্রায় ৫ লাখ প্রতিষ্ঠান এ সুবিধার আওতায় আসবে।
এছাড়া এনবিআর অনুমোদিত এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং (ইআরপি) সফটওয়্যার ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে ভ্যাট রিটার্ন ও অডিট-সংক্রান্ত কাগজপত্রের হার্ড কপি জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা বাদ দেওয়ার বিধান আসতে পারে।
এছাড়া অনলাইন ভ্যাট নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করা হতে পারে, যাতে ভ্যাট কর্মকর্তার অনুমোদনের প্রয়োজন না পড়ে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো, বন্দরে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স সময় ব্যাপকভাবে কমানো। বর্তমানে আমদানি করা পণ্য ও রাসায়নিক নমুনা শুধু বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনে পরীক্ষা করা যায়। এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে প্রায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত সময় ব্যয় হয়।
প্রস্তাবিত পরিবর্তনের আওতায় আন্তর্জাতিক মান সংস্থা (আইএসও) এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড (বিএবি) অনুমোদিত যেকোনো প্রতিষ্ঠানেও নমুনা পরীক্ষা করা যাবে। কর্মকর্তাদের মতে, এতে বিলম্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে।
এনবিআর অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও) সনদ পাওয়ার শর্ত শিথিল করার বিষয়টিও বিবেচনা করছে, যাতে আরও বেশি প্রতিষ্ঠান 'ট্রাস্টেড ট্রেডার' হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স সুবিধা পায়। এইও সনদধারীদের ক্ষেত্রে পণ্যের ফিজিক্যাল পরীক্ষার শর্তও আরও শিথিল হতে পারে।
চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদনে কতটুকু কাঁচামাল ব্যবহার হয় তা নির্ধারণকারী ইনপুট-আউটপুট কো-এফিশিয়েন্ট সংক্রান্ত ঘোষণাপত্র ও অনুমোদনের বিদ্যমান শর্তও শিথিল করা হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, "যেসব জায়গায় বাণিজ্যে বাধা রয়েছে, সেগুলো সহজ করার পরিকল্পনা আছে এই বাজেটে… এটি হবে 'নো ইমপোজিশন, লিটল এক্সেম্পশন—অনলি ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন' বাজেট।"
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান মার্চ ও এপ্রিল মাসে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে আগামী বাজেটে ব্যবসা-বাণিজ্যের বাধা দূর করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
এনবিআর বহুল সমালোচিত 'মিনিমাম ট্যাক্স' (ন্যূনতম কর) ব্যবস্থা থেকেও সরে আসতে পারে। বাজেট প্রস্তাবে নির্দিষ্ট সময় পর করদাতা যোগ্য হলে অগ্রিম কর বা উৎসে করে কেটে নেওয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার বিধান থাকতে পারে।
অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় আরও পূর্বানুমানযোগ্য কর ব্যবস্থা গড়ার প্রতিশ্রুতি থাকতে পারে। ব্যক্তি ও কোম্পানিভিত্তিক করদাতাদের জন্য নতুন ঘোষিত করহার পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য নির্দিষ্ট করার বিষয়ও আসতে পারে।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা প্রস্তাবিত সংস্কারকে স্বাগত জানিয়েছেন।
নেসলে বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালক দেবব্রত রায় চৌধুরী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "ভ্যাট ও কাস্টমস সংস্কার নিয়ে যা শোনা যাচ্ছে, তা বাস্তবায়িত হলে সত্যিকার অর্থেই ট্রেড ফ্যাসিলিটেশনে সহায়তা করবে।"
তিনি বলেন, "এটা স্পষ্ট হচ্ছে, সরকার ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করছে।"
তিনি জানিয়েছেন, বড় কোম্পানির জন্য মাসিক ভ্যাট রিটার্ন তেমন বড় সমস্যা না হলেও ছোট প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি জটিলতা তৈরি করে।
দেবব্রত বলেন, "ব্যবসায়ীদের নথিপত্র নিয়ে ভ্যাট অফিসে যেতে হয়, এতে অনেক সময় অতিরিক্ত খরচ হয়। একটি কার্যকর পেপারলেস ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে ব্যবসায়ী ও এনবিআর উভয়েরই উপকার হবে।"
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রস্তাবগুলোকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, "বাজেটে এমন উদ্যোগ ঘোষণা করা হলে আমরা তা স্বাগত জানাব।"
তিনি বলেন, "সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ট্রেড ফ্যাসিলিটেশনের কথা বলছে। এসব প্রস্তাব বাজেটে থাকলে সেটিই বাস্তব প্রতিফলন হবে।"
তিনি আরও বলেন, বর্তমান কর আদায় ব্যবস্থা ব্যবসার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। "এই ব্যবস্থায় ব্যবসা টিকবে না, বিনিয়োগও আসবে না।"
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আবদুল মজিদও প্রস্তাবিত সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি পূর্বে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এনবিআর সংস্কারের সুপারিশ প্রণয়নের জন্য গঠিত কমিটির প্রধান ছিলেন।
তিনি টিবিএসকে বলেন, "ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন অপরিহার্য, এর কোনো বিকল্প নেই। 'ইজ অব ডুয়িং বিজনেস' নিশ্চিত না হলে অর্থনীতি ঠিকভাবে চলবে না। আর অর্থনীতি না চললে রাজস্ব সংগ্রহও ব্যাহত হবে।"
তিনি বলেন, তার কমিটি এবং পরবর্তী সংস্কার কমিটিগুলোও সবসময় ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছে।
আবদুল মজিদ বলেন, "এই বিষয়গুলো বাজেটে গুরুত্ব পেলে তা অর্থনীতি ও রাজস্ব—উভয়ের জন্যই ইতিবাচক হবে। ভয় দেখিয়ে রাজস্ব বাড়ানো যায় না।"
দ্রুত নমুনা পরীক্ষা ও কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী আমদানি করা পণ্য বা রাসায়নিকের শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার প্রয়োজন হয়, যা শুধু বিএসটিআই ও বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের মধ্যেই সীমিত।
এর ফলে প্রায়ই পণ্য ঢাকায় পরীক্ষার জন্য পাঠাতে হয়। এতে চালান বন্দরে আটকে থাকে এবং আমদানিকারকদের ডেমারেজ চার্জ গুনতে হয়।
প্রস্তাবিত সংস্কারের আওতায় আইএসও সার্টিফায়েড এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড (বিএবি) অনুমোদিত যেকোনো প্রতিষ্ঠানেও পরীক্ষা করা যাবে। কর্মকর্তারা আশা করছেন, এতে পরীক্ষার সময় কমবে, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স দ্রুত হবে এবং ব্যবসার খরচ কমবে।
২০১৯ সালে চালু হওয়া অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও) কর্মসূচির আওতায় বিশ্বস্ত আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকরা তাৎক্ষণিক পরীক্ষার ছাড়াই বন্দরের পণ্য সরাসরি গুদামে নিতে পারেন।
তবে সুবিধা থাকা সত্ত্বেও গত ছয় বছরের বেশি সময়ে মাত্র ২০টি প্রতিষ্ঠান এইও লাইসেন্স পেয়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, যোগ্যতার শর্ত এখনও অনেক কঠিন, যার কারণে অংশগ্রহণ সীমিত। তাই বাজেটে এসব শর্ত শিথিল করা এবং সার্টিফায়েড প্রতিষ্ঠানের ফিজিক্যাল পরীক্ষা কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
কনসাইনমেন্ট দ্রুত ছাড়ের দাবি ব্যবসায়ীদের
পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানোকে স্বাগত জানালেও ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন, সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হবে পরীক্ষা চলাকালীনই বন্দরের কনসাইনমেন্ট ছাড় দেওয়া।
দেবব্রত রায় চৌধুরী বলেন, "কনসাইনমেন্ট বন্দরে রেখে নমুনা পরীক্ষা করলে রিপোর্ট পেতে প্রায় ১৫ দিন লাগে। কিন্তু চার দিন পর থেকেই ডেমারেজ শুরু হয়।"
তিনি বলেন, "এই ধরনের দেরির কারণে শুধু আমাদের কোম্পানিকেই বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকা ডেমারেজ দিতে হয়।"
দেবব্রত আরও বলেন, "এনবিআর যদি নমুনা পরীক্ষার সময়ই কনসাইনমেন্ট ক্লিয়ার করার অনুমতি দেয়, তাহলে আমদানিকারকদের বাড়তি ডেমারেজ দিতে হবে না। এটি আরও কার্যকর ব্যবস্থা হবে।"
মোহাম্মদ হাতেমও একই মত প্রকাশ করে বলেন, দ্রুত কনসাইনমেন্ট ছাড় দেওয়া হলে খরচ কমবে এবং বাণিজ্য দক্ষতা বাড়বে।
