যশোর রোডে অ্যালেন গিন্সবার্গ আর সুনীল
১৯৭১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। কলকাতা থেকে যশোর রোড ধরে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে রওনা দিয়েছিলেন অ্যালেন গিন্সবার্গ আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। উদ্দেশ্য, শরণার্থীশিবিরগুলো ঘুরে দেখা। এর প্রায় এক বছর আগে, ১৯৭০-এর ১৩ নভেম্বর এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। সেই বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ অনুরোধ জানিয়েছিলেন জর্জ হ্যারিসনকে। উদ্দেশ্য ছিল বন্ধুদের নিয়ে একটি দাতব্য কনসার্টের আয়োজন করা।
সেই প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ৫ লাখ মানুষ ঘুমন্ত অবস্থাতেই বঙ্গোপসাগরে তলিয়ে গিয়েছিল। সেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর হাজার মাইল দূরের পশ্চিম পাকিস্তান দুর্গতদের সাহায্যে কার্যত কিছুই করেনি। এরপর ছয় মাস যেতে না যেতে শুরু হয়ে যায় রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোষিত হওয়ার পাঁচ মাস পরেও সেই যুদ্ধ থামেনি। বৃষ্টির দাপটে পানির স্তর বাড়ছে, আর সীমান্ত পেরিয়ে কাতারে কাতারে মানুষ শরণার্থী হয়ে ঢুকছে পশ্চিমবঙ্গে। উপচে পড়ছে ত্রাণশিবিরগুলো। সপ্তাহের পর সপ্তাহ পথ হেঁটে সীমান্তে পৌঁছেও অনেক পরিবার স্রেফ খাবার, ওষুধ, অর্থ বা শৌচাগারের অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।
কলকাতায় তখন লিভিং থিয়েটার তাদের নতুন শাখা উদ্বোধন করছে। বাংলার বাউলদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শরণার্থীদের জন্য তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছিল তারা। বব ডিলানের ম্যানেজার অ্যালবার্ট গ্রসম্যানের মাধ্যমে আমেরিকার সঙ্গে বাংলার বাউলদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন গিন্সবার্গই। সেই সূত্র ধরেই রবার্ট ফ্রেজার নামে এক ব্যক্তি গিন্সবার্গের জন্য টিডব্লিউএ বিমানের যাতায়াতের টিকিট পাঠিয়ে দেন।
উইলিয়াম বারোজ লিখেছিলেন, 'রবার্ট ফ্রেজারকে তো চেনোই? রোলিং স্টোনস আর লিভিং থিয়েটারের বন্ধুদের পাশাপাশি এ দেশে মন্দিরের নৃত্যশিল্পীদের সঙ্গে যারা দিন কাটাচ্ছে, তাদের প্রায় সবার বন্ধু সে।' বারোজকেও যাওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু গিন্সবার্গের যাত্রার দশ দিন আগে পর্যন্ত তার হাতে টিকিট পৌঁছায়নি। বারোজের কথায়, 'শুনেছি কিথ যাচ্ছে, কিন্তু মিক আসবে কি না নিশ্চিত নই।' কনসার্ট ফর বাংলাদেশের সাফল্যে অভিভূত জন ওয়েনারও যাওয়ার কথা ভাবছিলেন। গিন্সবার্গ ফ্রেজারের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, সেখানে পৌঁছে তার কাজ কী হবে। ফ্রেজারের সংক্ষিপ্ত উত্তর ছিল—তার যা মন চায়।
শেষ পর্যন্ত বারোজ আর কলকাতায় আসেননি। স্রেফ এক সপ্তাহের জন্য এত টাকা খরচ করে আসার কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাননি তিনি। তা ছাড়া 'দ্য নেকেড লাঞ্চ' ছবির কাজ নিয়েও ব্যস্ত ছিলেন। তার দুই বছর আগেই অত্যধিক মদ্যপানে মৃত্যু হয়েছে জ্যাক কেরুয়াকের। গ্রেগরি করসো তখন চেলসি হোটেল থেকে বিতাড়িত। আর পিটার অরলভস্কি ব্যস্ত ছিলেন চেরি ভ্যালিতে গিন্সবার্গের খামারে শসা তুলতে। আগের শীতে ১৮৮ বোতল আচার মজুত করা হয়েছিল।
তাই সেবার একাই এসেছিলেন অ্যালেন। সঙ্গে ছিল কেবল তার নোটবুক আর বব ডিলানের উপহার দেওয়া শৌখিন টেপ রেকর্ডারটি। তার ইচ্ছের তালিকায় বেশ কিছু জিনিস ছিল—নতুন একটি হারমোনিয়াম কেনা, খদ্দরের জামা বানানো, পিটারের জন্য লুঙ্গি কেনা আর বারাণসী থেকে শিবের একটি ত্রিশূল সংগ্রহ করা।
আরও কিছু ভক্তিমূলক গানও শিখতে চেয়েছিলেন অ্যালেন। বেশ অনেক দিন ধরেই পেন্টাগনের বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঘুরেফিরে সেই একই কীর্তন, ভজন আর 'হরে কৃষ্ণ' জপ করে যাচ্ছিলেন তিনি। তার এই অবিরাম জপ বন্ধুবান্ধবদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৬৮-এর শিকাগো দাঙ্গার সময় পরিস্থিতি শান্ত করতে টানা সাত ঘণ্টা 'ওম' জপ করেছিলেন তিনি। সেই সময় এক ভারতীয় ভদ্রলোক চিরকুটে তাকে জানিয়েছিলেন, গিন্সবার্গের উচ্চারণ একেবারেই ভুল। সেই উচ্চারণ সংশোধনের ইচ্ছেও ছিল তার মনে। তালিকায় ছিল নিমতলা শ্মশান ঘাট, তারাপীঠ আর সিউড়ি। এককালে ভারত তার ভবিষ্যতের দিশা দেখিয়েছিল, এখন যেন এ দেশের কাছেই গচ্ছিত ছিল তার অতীতের চাবিকাঠি।
দমদম বিমানবন্দরের লাগোয়া ধানখেতের ওপর দিয়ে যখন বিমানটি নামছে, অ্যালেনের স্মৃতিতে ভেসে উঠলেন পিটার। মানসচোখে দেখলেন, আমজাদিয়া হোটেলের ছাদে কলকাতার সেই অসহ্য গরমে গোসল সেরে উঠছেন তরুণ পিটার—কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা ভেজা সোনালি চুল বেয়ে টপটপ করে ঝরছে পানি। স্মৃতির ভিড়ে ফের আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন তিনি। নিজেকেই প্রশ্ন করলেন, 'কয় জন্ম আগের কথা এসব?'
পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত শহর বনগাঁ থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে রামকৃষ্ণ মিশনের অফিসের প্রবেশপথে এক কর্মকর্তা স্বাগত জানালেন অ্যালেনকে। তিনি গিন্সবার্গকে আশ্বস্ত করে জানালেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। অ্যালেনের ক্যাসেট রেকর্ডারটি তখন চালু ছিল।
'বাংলাদেশের মানুষ বন্যায় ভয় পায় না, কারণ দেশটা পানিতে ভরা।'
অ্যালেন বললেন, 'কোথায় খাবার দেওয়া হচ্ছে, আমি তা দেখতে চাই।'
'দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসুন, প্লিজ।'
'আমি খাবার দেওয়ার জায়গাটা দেখতে চাই।'
'খাবার? দুস্থদের সাধারণত শুধু বৃহস্পতিবার খাবার দেওয়া হয়। আজ সেই দৃশ্য দেখতে পাবেন না।'
'আচ্ছা।'
'সপ্তাহে মাত্র এক দিন, বৃহস্পতিবার। তাই আজ ছবি তোলা আপনার পক্ষে সম্ভব হবে না।'
'ঠিক আছে, যা আছে তা-ই দেখি।'
'আমরা আর কীভাবে সাহায্য করতে পারি?'
'আপনাদের মূল্যবান সময় আর নষ্ট করতে চাই না।'
'স্থানীয় উদ্যোগে পরিচালিত আরেকটা কমিটি আছে। যারা নতুন আসছে, তাদের চাল দিচ্ছে তারা। আজই তাদের আসার কথা। এখন ওরা মেডিকেল বোর্ডের সামনে হাজিরা দিচ্ছে।'
'ওটা আমরা দেখেছি।'
'দেখেছেন? ওরা কিছু স্লিপ দিচ্ছে। সেই শিল্পের ভিত্তিতে স্থানীয় কমিটি চাল আর অন্যান্য সামগ্রী বিতরণ করছে। ওটাও কি দেখা হয়েছে? এর বেশি আর কিছু এখন মিলবে না।'
'রাস্তায় কতগুলো ক্যাম্প আছে?'
'ক্যাম্পের শেষ নেই। অসংখ্য ক্যাম্প।'
'ক্যাম্পগুলোর ভেতরের অবস্থা কেমন?'
'সব কটা ক্যাম্পই এখন বন্যাকবলিত।'
'আর মানুষগুলো?'
'না, না, ত্রাণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সবাই সাহায্য পাচ্ছে। আমরাও ওখানে ত্রাণ দিতে যেতাম।'
'সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন। নমস্কার।'
'নমস্কার।'
কর্মকর্তা একপাশে সরে গিয়ে নিচু স্বরে সুনীলকে বাংলায় জিজ্ঞেস করলেন, এই ভদ্রলোক কোথা থেকে এসেছে।
সুনীল উত্তর দিলেন, 'আমেরিকা।'
মাথা দোলালেন কর্মকর্তা। 'ঠিক। ঠিক আছে।'
আইওয়া ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রধানকে দেওয়া এক রিপোর্টে পল এঙ্গেল লিখেছিলেন, কলকাতায় থাকার সময় এসবের সূত্রপাত করেছিলেন অ্যালেন গিন্সবার্গ। এঙ্গেল মন্তব্য করেন: 'এতকাল যা কার্যত অসম্ভব ছিল, গিন্সবার্গ তা-ই করে দেখিয়েছেন—ভারতে আবর্জনা আমদানি করেছেন।'
একজন উদীয়মান বাঙালি লেখকের জন্য এক বছরের ফেলোশিপের ব্যবস্থা করতে এশিয়া ফাউন্ডেশন ১৯৬৩ সালের জুলাইয়ে পল এঙ্গেলকে ১ হাজার ৭০০ ডলারের একটি চেক পাঠায়। অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে এঙ্গেল জানিয়েছিলেন, তিনি কলকাতার এক তরুণ কবিগোষ্ঠীর নেতাকে বেছে নিয়েছেন। এঙ্গেলের বর্ণনায়, 'ওরা হাংরি জেনারেশন নামে একটি দলের সদস্য। কারণ, ওরা একাধারে ক্ষুধার্ত এবং ক্রুদ্ধ।' মলয় রায়চৌধুরী তখন তার এই দলের নাম নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। 'হাংরিয়ালিস্ট' দলে তখন প্রায় ৪০ জন লেখক। তাদের বিদ্রোহের আঁচ তখন তুঙ্গে। ধর্ম নিয়ে তাদের সাম্প্রতিক এক এক ইশতেহারের শুরুতেই লেখা হয়েছিল: '১. ঈশ্বর স্রেফ আবর্জনা।' এঙ্গেল লিখেছিলেন, 'একেবারে উন্মাদনা!'
এঙ্গেল অবশ্য যা ভেবেছিলেন, আসল ব্যাপার ছিল তার উল্টো। তার মনোনীত কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে 'হাংরি' বা 'হ্যাংরি জেনারেশনের' কোনো সম্পর্কই ছিল না। ফেলোশিপটি হাতছাড়া হওয়ায় শক্তি চট্টোপাধ্যায় নিশ্চিত ছিলেন যে তার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। তাই ক্ষোভে সুনীলকে বিদায় জানাতে বিমানবন্দরেও যাননি তিনি। তবে ১৯৬৩ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি, সুনীল যখন বিদেশযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, পিটার অরলভস্কি সবার কাছ থেকে বিদায় নিতে কলকাতায় এলেন। গিন্সবার্গ বিমানে ফেরার জন্য পিটারের কাছে টাকা পাঠাতে চাইলেও তিনি ঠিক করেছিলেন ফেরার পথটি হবে দীর্ঘ। পিটারের পরিকল্পনা ছিল পাকিস্তান, আফগানিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ হয়ে স্থলপথে একা নিউইয়র্কে ফিরবেন। বিচলিত সুনীল গিন্সবার্গকে চিঠিতে লিখেছিলেন, 'বিষয়টি আমার কল্পনারও অতীত।'
পিটারের বিদায়ের রাতে অঝোরে কেঁদেছিলেন সুনীল। হয়তো সেই কান্নায় নিজের আসন্ন বিদেশযাত্রার বিষণ্নতাও মিশে ছিল। অ্যালেন গিন্সবার্গের কাছে সুনীল স্বীকার করেছিলেন, 'জীবনের কোনো পুরুষের প্রতি এমন টান আমি কখনো অনুভব করিনি। ও কেন তোমার দেওয়া বিমানের টিকিট নিল না, সেটা আমার কাছে চিরকালই রহস্য থেকে যাবে।'
নিজের বিমান যখন পশ্চিমের দিকে উড়ল, জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে ছিলেন সুনীল—যেন রাজস্থানের মরুপ্রান্তরের তপ্ত বালুতে পিটারের নিঃসঙ্গ সফর দেখার চেষ্টা করছেন।
সুনীল চলে যাওয়ার পর আন্দোলনের হাল ধরলেন মলয় রায়চৌধুরী ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়। ক্রমাগত ক্ষোভ আর উগ্র শব্দবন্ধে ঠাসা ইশতেহারগুলো হাংরি জেনারেশনকে তাদের আরাধ্য কুখ্যাতি এনে দিল। কিন্তু গোল বাধল অন্য জায়গায়। কলকাতার বিশিষ্ট মহলে মলয় যখন কুরুচিকর ভাষায় টপলেস বেদিং স্যুট প্রতিযোগিতার আমন্ত্রণপত্র পাঠাতে শুরু করলেন, তখন শক্তি তার বিরুদ্ধাচরণ করলেন। সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়তে হাংরিয়ালিস্টদের ইশতেহার উদ্ধৃত করে দাবি করা হলো, এই গোষ্ঠী আসলে রাষ্ট্রব্যবস্থা ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
প্রশাসন শেষ পর্যন্ত পুলিশের দ্বারস্থ হলো। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ২৬ জনকে আটকে রাখা হয়। ষড়যন্ত্র ও অশ্লীলতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় পাঁচজনকে। পরে অবশ্য তারা জামিনে মুক্তি পান। এই মামলা চলাকালীন 'টাইম' ম্যাগাজিনের এক সাংবাদিককে উৎপল কুমার বসু বুঝিয়েছিলেন, 'আমাদের এই হতাশা কেবল ব্যক্তিগত নয়; এর মূলে রয়েছে সমাজের দারিদ্র্য, গ্লানি আর চরম অস্থিরতা।' প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর শিক্ষকতার চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন উৎপল। অ্যালেনকে চিঠিতে তিনি লিখলেন, 'আমি প্রায় শেষ হয়ে গেলাম।'
উৎপল বলেন, শক্তি তখন সংবাদমাধ্যমের 'প্রিয়পাত্র' হয়ে ওঠার নেশায় নিজের আদর্শ বিসর্জন দিয়ে 'আপস' করতে শুরু করেছেন। আইওয়াতে বসেই এই হাঙ্গামার খবর পেয়েছিলেন সুনীল। তিনি সমালোচনা করে বললেন, শহরের মূল সমস্যাগুলো থেকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি ফেরাতেই সরকার এই কবিদের ওপর দমনপীড়ন চালাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত মলয় ছাড়া বাকিদের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নেওয়া হলেও তাদের কাছ থেকে মুচলেকা লিখিয়ে নেওয়া হয়েছিল যে তারা আর কখনো অশ্লীল কিছু লিখবেন না। অ্যালেনের সহায়তায় উৎপল শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডে নির্বাসনে গেলেন। নিজেকে প্রকৃতই মহৎ কবি মনে করা মলয় তখন চরম একাকিত্ব আর বিশ্বাসঘাতকতার যন্ত্রণায় দগ্ধ। সবাইকে সমালোচনায় বিদ্ধ করে অ্যালেনকে লেখা চিঠিতে তিনি দাবি করলেন, আমেরিকায় কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তার কাজের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।
মলয়ের ভাষায়, 'আমিই বোধহয় একমাত্র মানুষ, যে ভারতকে ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা রাখে।'
ট্যাক্সির ইঞ্জিন আবার গর্জে উঠল। বাতাসের টানে আগুনের লেলিহান শিখার মতো বারবার পাল্টে যাচ্ছে ইঞ্জিনের আওয়াজ। রাস্তার ধার দিয়ে সাইকেল আরোহীরা সজোরে বেল আর হর্ন বাজিয়ে এগিয়ে চলেছেন। চারপাশের এই ভয়াবহ আর্তনাদ আর হাহাকারের মাঝে কিঞ্চিৎ সান্ত্বনা খুঁজতেই হয়তো অ্যালেন সুনীলকে জিজ্ঞেস করলেন, 'এখানকার সবাই কি মহামায়ার ধারণা সম্পর্কে সচেতন?' তিনি সম্ভবত বোঝাতে চেয়েছিলেন, সব দুঃখই আসলে মায়া বা ভ্রম।
'হ্যাঁ,' উত্তর দিলেন সুনীল, 'এই তল্লাটের মানুষ বড্ড বেশি নিয়তিবাদী।'
অ্যালেন সায় দিয়ে বললেন, 'হ্যাঁ, এটাই হওয়ার ছিল।'
'বৃষ্টি তো হবেই, সেটা সবাই জানে।'
'আমরা কি নেমে একটু হাঁটব?'
'চেষ্টা না করাই ভালো।'
'অন্য কোনো রাস্তা আছে?'
এক রিকশাওয়ালার সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে বাংলায় কথা বলছিলেন ট্যাক্সিচালক। সেই ফাঁকে এক কিশোর ট্যাক্সির জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে তাদের খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করল। গাড়ির দরজা খোলা আর বন্ধ হওয়ার শব্দ। রাস্তাটা এখন একেবারেই অগম্য। অগত্যা গাড়ি ছেড়ে দিয়ে রিকশা নিতে হলো তাদের।
'আমি ওটা বইতে সাহায্য করছি।'
'থাক, আমিই পারব।'
'জুতো এখানেই রাখুন।'
'আমরা ওই পথ দিয়ে হেঁটে যেতে পারি।'
'এখন এগারোটা বাজতে দশ। আমাদের পাঁচটার মধ্যে ফিরতে হবে, তাই দুটো নাগাদ উল্টো পথ ধরতে হবে।'
রিকশায় উঠে অ্যালেন ফের টেপ রেকর্ডার চালু করলেন, যাতে যা দেখছেন সব ধরে রাখা যায়। তার জার্নালের পাতাগুলোর মতোই—বাথরুমের আয়নায় নিজেকে দেখা হোক বা ফ্ল্যাটের পেছনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকা—দৃশ্যগুলো অত্যন্ত দ্রুত ভেসে আসছিল। এমনকি অবর্ণনীয় যন্ত্রণার বর্ণনার ক্ষেত্রেও তার কলম বা কণ্ঠ ছিল সমান ক্ষিপ্র। এই ক্যাসেট বা ভবিষ্যতে করা এমন সব রেকর্ডিং আদৌ কেউ কোনো দিন শুনবে কি না, তা নিয়ে অ্যালেন গিন্সবার্গ বিশেষ ভাবতেন না। তার দিনলিপিগুলোও যথানিয়মে টাইপ করে ফাইলে তুলে রাখা হবে।
পরে অ্যালেন 'যশোর রোড' নামে একটি কালজয়ী কবিতা লিখেছিলেন ঠিকই, তবে সেই মুহূর্তে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি যে শব্দগুলো উচ্চারণ করছিলেন, পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে তা যেন যথেষ্ট ছিল না। তিনি বলছিলেন: 'নদীর ওপর একটি লোহার সেতু, এখন সেটা পার হচ্ছি...টালির চালগুলো পানির নিচে ডুবে রয়েছে, জলের ওপর সেগুলোর প্রতিফলন...জানালার শিক দেখা যাচ্ছে...একটি চালের বাঁশগুলো সব পানির ওপর ভাসছে।'
রিকশার চাকা জলে ঘোরার ছলাৎ ছলাৎ শব্দের তোড়ে সেই বর্ণনাগুলো দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সেই চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যেও তার চোখ ছিল নির্লিপ্ত ও সন্ধানী।
পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক ব্যক্তির কথা সুনীল অনুবাদ করে দিচ্ছিলেন, আর অ্যালেন তা টেপ রেকর্ডারে তুলে নিচ্ছিলেন। অ্যালেনের বয়ানে, 'সবই তো পানির তলায়, অথচ সরকার কিছুই করছে না—আমাদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে এক দোকানদার এমনটাই বলছিলেন।'
ভারত এমন এক দেশ যেখানে সিদ্ধপুরুষ ও নারীদের ঈশ্বর জ্ঞান করা হয়। বলা হয়, মর্ত্যের সেই দেবতাদের চেনার অন্যতম উপায় হলো তাদের নির্নিমেষ ও অপলক দৃষ্টি। সেই চোখের মাধ্যমেই তাদের কাছে ধরা দেয় এই মর্ত্যলোক।
মূল: ডেবোরাহ বেকার
অনুবাদ: মারুফ হোসেন