Skip to main content
  • অর্থনীতি
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • খেলা
  • বিনোদন
  • ফিচার
  • ইজেল
  • মতামত
  • অফবিট
  • সারাদেশ
  • কর্পোরেট
  • চাকরি
  • প্রবাস
  • English
The Business Standard বাংলা

বায়োস্কোপের নেশা আমার

শাদাকালো সিনেমার ইতিহাসে তিনটে দীর্ঘ হেঁটে আসা/যাওয়ার দৃশ্য অত্যন্ত অর্থপুর্ণ। ‘দ্য থার্ড ম্যান’-এ যোসেফ কটেনকে ছাড়িয়ে ভ্যালির চলে যাওয়া। ‘রোমান হলিডে’তে রাজকুমারী হেপবার্নের সভা ছেড়ে গ্রেগরি পেকের হেঁটে চলে যাওয়া। ‘বিলি লায়ার’-এ স্বপ্নের প্রেমিকার সঙ্গে স্বপ্নের শহরে পালাতে চেয়েও পালাতে পারে না বিলি, শহরের পথে কাকভোরে সে এক প্লাটুন অদৃশ্য সৈন্যকে পেছনে রেখে কাল্পনিক কুচকাওয়াজ করে বাড়ি ফিরে চলে।
বায়োস্কোপের নেশা আমার

ইজেল

সাগুফতা শারমীন তানিয়া
10 May, 2026, 04:35 pm
Last modified: 10 May, 2026, 04:37 pm

Related News

  • শিশু ধর্ষণ ঠেকাতে না পারা রাষ্ট্র কেন সিনেমা বন্ধে মদদ দেয়: রুমিন ফারহানা
  • তারা
  • ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এবার পুলিশি বাধায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’র প্রদর্শনী বন্ধের অভিযোগ
  • যেভাবে একটি সিনেমা হল থেকে এল গুলিস্তানের নাম
  • বাজেট মাত্র সাড়ে ৭ লাখ ডলার, আয় ৮০ মিলিয়ন, যেভাবে বছরের সবচেয়ে বড় ‘হিট’ এই ছবি

বায়োস্কোপের নেশা আমার

শাদাকালো সিনেমার ইতিহাসে তিনটে দীর্ঘ হেঁটে আসা/যাওয়ার দৃশ্য অত্যন্ত অর্থপুর্ণ। ‘দ্য থার্ড ম্যান’-এ যোসেফ কটেনকে ছাড়িয়ে ভ্যালির চলে যাওয়া। ‘রোমান হলিডে’তে রাজকুমারী হেপবার্নের সভা ছেড়ে গ্রেগরি পেকের হেঁটে চলে যাওয়া। ‘বিলি লায়ার’-এ স্বপ্নের প্রেমিকার সঙ্গে স্বপ্নের শহরে পালাতে চেয়েও পালাতে পারে না বিলি, শহরের পথে কাকভোরে সে এক প্লাটুন অদৃশ্য সৈন্যকে পেছনে রেখে কাল্পনিক কুচকাওয়াজ করে বাড়ি ফিরে চলে।
সাগুফতা শারমীন তানিয়া
10 May, 2026, 04:35 pm
Last modified: 10 May, 2026, 04:37 pm

সিনেমা নিয়ে কথা বলতে বললে আমার তোমার-দুয়ার-পারায়ে-আমি-যাই-যে-হারায়ে দশা হয়। পছন্দের মুহূর্তের কি শেষ আছে! বরং বিষয়ভিত্তিক আলোচনা সহজ। পর্দায় জাত্যাভিমান, নারীর প্রতি সহিংসতা, শিশুশিল্পীদের বিবর্তন, প্রাণীহত্যা, প্লেব্যাক, সাহিত্যনির্ভরতা ইত্যাদি কত শিরোনামে পৃথক হয়ে পড়ে সিনেমাগুলো। আপনি যদি বিষয় হিসেবে "সিনেমায় দস্তানা" বলেন, গড়গড়িয়ে বলে দেয়া যায়-

১. রিটা হেওয়ার্থ 'গিল্ডা'তে তাঁর ডানহাতের কালো সিল্কের দস্তানা খুলতে খুলতে গাইছেন- "পুট দ্য ব্লেম অন মেইম", অসহনীয় যৌনতার মুহূর্ত।

২. 'দ্য এজ অভ ইনোসেন্স'-এ ঘোড়ার গাড়ির ক্যারেজে মিশেল ফিফারের দস্তানার তলায় ড্যানিয়েল ডে-লুইসের স্বপ্ন-মায়া-মতিভ্রম মেলানো চুমু।

৩. 'অন দ্য ওয়াটারফ্রন্ট'-এ পেশাদার মুষ্টিযোদ্ধা ব্রান্ডো নিজের বেঢপ হাত ইভা মারী সেইন্টের দস্তানায় ঢোকাবার চেষ্টা করতে করতে কথা বলছে, সুরুচিতে-মার্জনায় নিজেকে খাপ খাওয়ানোর অবচেতন চেষ্টা কি সুন্দর সেই সামান্য দৃশ্যে।

৪. 'দ্য এয়ারেস'-এ খোশপোশাকি চতুর মন্টগমারি ক্লিফট শ্যাময় দস্তানা ফেলে গেছেন অলিভিয়া ডে হ্যাভিল্যান্ডের প্রাসাদোপম বাড়িতে, মুখচোরা- অপটু- গোবেচারা প্রেমিকা সেই দস্তানায় হাত মেলাতে চেষ্টা করছে, কেউ তার পাণিপ্রার্থনা করেনি এতকাল! 

৫. রফি-লতা ডুয়েট সও-সাল পেহলে, হাতে মুঠো করে রাখা কালো দস্তানা জোড়া দিয়ে নিজের বুক থাবড়ানোর আস্ফালনে দেব আনন্দ গাইছেন- "ইন পেয়ারকি রাহোঁ মে কহো তো আব খুদকো মিটা দু ম্যাঁয়।" 

'সিটি লাইটস' সিনেমার একটি দৃশ্যে চার্লি চ্যাপলিন।

দস্তানা সিনেমায় অসম্ভবকে সম্ভব করার কত মুহূর্তের প্রপ। কিন্তু যদি সীমানা না নির্ধারণ করে দেন, তবে তো মুশকিল। কুরোসাওয়া-কুব্রিক-কিয়ারোস্তমি কপচানো বন্ধুদের বলয়ের বাইরে আমার প্রিয় সিনেমার গ্রহাণুপুঞ্জের কক্ষপথ, আমার সিনেমারুচির সে জগত অমার্জিত, গভীরভাবে মেঠো- এঁদো- হাটুরে। আজ সেই জগতের ভাঙা টুকরোটাকরা নিয়ে গল্প করবো। 

আমাদের শৈশবে বাংলাদেশ টেলিভিশন  'মুভি অভ দ্য উইক'-এ বিশ্বের নামজাদা মুভিগুলো দেখাতো। আব্বাই প্রথম সিনেমার জগতের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেয়, ফলে আমার প্রথম সিনেমা-রুচি আব্বার রুচির ছাঁচে গড়ে উঠেছিল। তখন কত রাজ্যের মণিমুক্তা সেঁচে আনতো বিটিভি, একেবারে ধূসরতম শৈশবস্মৃতি ছানলেও মনে পড়ে- বলশয় থিয়েটারের 'আ লেজেন্ড অভ লাভ'-এ সারা পাহাড় শিরিঁ হয়ে উঠছে ফরহাদের ছেনির আঘাতে আর ভাগ্যাহত শিরিঁ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে যাচ্ছে। আব্বা আমাদের নিয়ে আগ্রহ করে দেশপ্রেম আর মানবিকতার জয়গান গাওয়া সিনেমা দেখাতো, একে একে সকল ক্রীতদাস স্বীকার করছে- সে স্পার্টাকাস, আর প্রকৃত স্পার্টাকাসের চোখ ফুঁড়ে টলমল অশ্রু ঝরে পড়ছে! আমাদের ডেকেডুকে আয়োজন করে আব্বা বিশ্বযুদ্ধকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র দেখতো। 'দ্য ট্রেন'। 'দ্য ডার্টি ডজন'। 'গানস অভ ন্যাভারোন'। 'অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট'— পরিখায় লুকিয়ে থাকা সৈন্যের সামনে একটা পাখি এসে বসেছে গাছে, সে সামলাতে পারেনি— স্কেচবুক বের করে স্কেচ করতে শুরু করেছে, তার মাথাটা পরিখার বাইরে সামান্য উঁচু হয়ে উঠেছে পাখিটাকে দেখতে গিয়ে, মুহূর্তে মাথায় স্নাইপারের গুলিতে লুটিয়ে পড়েছে সৈন্য। যোদ্ধার ভিতর যেন শ্যামলিমা থাকতে নেই... থাকলেই মরণ! সোভিয়েত রাশিয়ার 'দ্য ক্রেনস আর ফ্লাইয়িং' আব্বার খুব প্রিয় ছিল, আর 'ব্যালাড অভ আ সোলজার'-এর সেই দৃশ্য- কিশোর সৈনিক আর তার কিশোরী প্রেমিকা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে রেলগাড়ির দরজায়, রেল চলেছে, বিশাল রুশ আকাশে রাঙা রাঙা মেঘের কিনারা সোনালি হয়ে আছে, মেয়েটির বিনুনির চুল ঝোড়ো রেলের বাতাসে বিচ্যুত হয়ে অসংখ্য বিদ্যুতের রেখার মতো স্পর্শ করছে প্রেমিকের মুখ। কি সুন্দর সেই মুহূর্ত! দেখতাম যুদ্ধভিত্তিক সিনেমার কেন্দ্র ঘুর্ণিঝড়ের চক্ষুর মতো স্থির— সেখানে নিশ্চল মহিমায় বাস করে মানবতা-মমতা-দেশপ্রেম।

মুশকিল হলো শাদাকালো সিনেমার জগত তথা হলিউডের গোল্ডেন এজ এমন এক কৃষ্ণগহ্বর- যেখানে আমি একবার ঢুকে গেছি আর কখনো বের হয়ে আসতে পারিনি! আগেই বলেছি এর প্রথম দীক্ষা আব্বার হাতে, দ্বিতীয়টি বিলেতে একটি পাবলিক লাইব্রেরির হাতে- যেখান থেকে আমার ভাড়াবাড়ির কামরার দূরত্ব ছিল মাত্র তিন মিনিট। হোয়াটস্যাপহীন ফেসবুক মেসেঞ্জারহীন সেই পৃথিবীতে কার্ডকলে সামান্য সময় মা-বাপের গলার আওয়াজ শুনে বাড়ির রাস্তা ধরে ফেরার সময় চেঁচাতাম- "ইটি ফোন হোম!" লাইব্রেরি-বোঝাই কিচেনসিংক ড্রামা আর গোল্ডেন এজ হলিউডের শাদাকালো ও রঙিন মুভিই আমার আত্মীয় তখন। ভিএইচএস টেপে 'বাইসিকল থিভস' দেখে সে কি কান্না, লরেল অ্যান্ড হার্ডি সিরিজ দেখে হেসে গড়াগড়ি! কি করে ভুলি 'স্পেলবাউন্ড'-এর বার্গম্যান যেভাবে "লিভারওর্স্ট" উচ্চারণ করেছিলেন! 'দ্য ফিলাডেলফিয়া স্টোরি'তে প্রাক্তন স্ত্রীকে নতুন প্রেমিক প্রেম নিবেদন করছে দেখে নির্বাক ক্যারি গ্রান্টের সেই একমুহূর্তের তীরবিদ্ধ চাউনি, পুরুষ যায় তবু সামন্তপ্রভুর অধিকার রেখে যায়! 'মিস্টার স্মিথ গোজ টু ওয়াশিংটন'-এ জিমি স্টুয়ার্টের প্রাণান্তকর ফিলিবাস্টার। 'ক্যাসাব্ল্যাংকা'তে বোগার্টের সেই রাগত বিড়বিড়- "দুনিয়ার তাবত টাউনের তাবত পানশালা ছেড়ে সে এসেছে আমারটাতে!" 'দ্য রোরিং টোয়েন্টিজ'-এ গুলিবিদ্ধ ক্যাগনির সেই শেষ দৌড়। 'ব্রিফ এনকাউন্টার'-এর পরকীয়ার লজ্জা-বেদনা-পীড়া অথচ আনন্দ সইতে না পারা যুগল। 'সাইকো'তে হাতে বসা মাছিটাকেও থাবড়া মারতে গররাজি মাতৃহন্তা অ্যান্থনি পারকিন্স। 'সিটি লাইটস'এর হাসিকান্নায় ভেসে যাওয়া শেষ দৃশ্যে চ্যাপলিন অন্ধ মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন- "এখন দেখতে পাচ্ছ?" 'আ স্ট্রিটকার নেমড ডিজায়ার'-এ পাগলা গারদের যাত্রী ভিভিয়ান লীর উক্তি- "যে কেউ হও না কেন, আমি চিরদিন অচেনা মানুষের দয়ার ওপর নির্ভর করেছি!"...ওসব কি ভোলা যায়! "মিস জিন লুইস স্ট্যান্ড আপ, ইওর ফাদার ইজ পাসিং।" 'টু কিল আ মকিংবার্ড' মুভিতে কালো মানুষকে জড়িয়ে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে মামলা লড়বার পর যখন অ্যাটিকাস ফিঞ্চ (গ্রেগরি পেক) কোর্টঘর ছেড়ে যাচ্ছেন, তখন কালোদের রেভারেন্ড অ্যাটিকাস ফিঞ্চের ছোট্ট মেয়ে স্কাউটকে ভালো-নাম ধরে ডেকে ভক্তিগদগদ গলায় দাঁড়াতে বলছেন। দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানাও- বাবা চলে যাচ্ছ্নে। (কেননা তোমার বাবা একজন অসামান্য মানুষ, একজন শ্রদ্ধেয় মানুষ, কেননা তোমার জন্মদাতা বাবা পাশ দিয়ে যাচ্ছেন!) 'দ্য লায়ন কিং'-এর সেই দৃশ্যের মতো, অরণ্যের আদি হস্তিযুথের চলে যাওয়ার মতো করে বাবা যাচ্ছে, আশপাশের সব প্রাণী মাথা নত করে তাদের প্রণতি জানাচ্ছে। হাতিকে প্রণাম, কেননা সে বিশাল, সে বিপুল জীবনচক্রের মহাচিহ্ন। সম্ভবত- সিনেমার ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় বাবা অ্যাটিকাস ফিঞ্চ।

আলফ্রেড হিচককের 'স্পেলবাউন্ড' সিনেমার একটি দৃশ্য।

বিলেতে ক্রিসমাসের ছুটিতে প্রতি বছর দেখানো হয় 'ইটস আ ওয়ান্ডারফুল লাইফ'। যীশুর জন্ম উপলক্ষ্যে অসংখ্য সাধারণ মানুষের জন্মানোর শুভক্ষণকে অভিবাদন। ছোট শহরের হতাশা, ক্লেশ, বেকারত্ব আর দারিদ্রে ভুগতে ভুগতে জর্জ (জিমি স্টুয়ার্ট) আত্মহত্যা করতে গেলে স্বর্গ থেকে আগত এঞ্জেল তাকে কিছুক্ষণের জন্য নিয়ে যায় এমন এক সম্ভাবনায় যেখানে সে জন্মায়নি। জীবন নেই মানে সম্ভাবনা নেই, শুধু নিজের বিকাশের নয়, পারস্পরিক বিকাশের সম্ভাবনাও নেই। জর্জ তখন আরেকবার ফিরে পেতে চায় তার খুঁতে ভরা দিশাহীন জীবনকেই, ক্ষুদ্র শহরে ক্ষুদ্রতর জীবনের গ্লানিকেই। 

শাদাকালো সিনেমার ইতিহাসে তিনটে দীর্ঘ হেঁটে আসা/যাওয়ার দৃশ্য অত্যন্ত অর্থপুর্ণ। 'দ্য থার্ড ম্যান'-এ যোসেফ কটেনকে ছাড়িয়ে ভ্যালির চলে যাওয়া। 'রোমান হলিডে'তে রাজকুমারী হেপবার্নের সভা ছেড়ে গ্রেগরি পেকের হেঁটে চলে যাওয়া (ক্যামেরার এক মিনিট যে কী দীর্ঘ!), মুখে খেলছে এমন অনিবার্য বিচ্ছেদকে মানতে পারার- গিলতে পারার অপারগতা আর পারঙ্গমতা আর অবিশ্বাস- সেই অবিশ্বাসও দোলাচলময়- সে যে এসেছিল- ভালোবেসেছিল- ফিরে কি আর আসতে পারে না? একবারটি পেছন ফিরলে কি দেখা যাবে এই মুহূর্তটি চিরবিচ্ছেদের শুরু নয়! 'বিলি লায়ার'-এ স্বপ্নের প্রেমিকার সঙ্গে স্বপ্নের শহরে পালাতে চেয়েও পালাতে পারে না বিলি, সহসা চেনা ঘৃণ্য শহরকে মূককীটের একান্ত গুটি মনে হয় তার, শহরের পথে কাকভোরে সে এক প্লাটুন অদৃশ্য সৈন্যকে পেছনে রেখে কাল্পনিক কুচকাওয়াজ করে বাড়ি ফিরে চলে। 

হিচককের মুভি নিয়ে আলাদা পরিসরে বিশাল কলেবরে লেখা সম্ভব, কিছুটা লিখেছিও আগে। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে 'স্ট্রেঞ্জারস অন আ ট্রেন'-এ শিশুর বেলুন অহেতুক সিগ্রেটের আগুনে ফুটো করে দেয়ার ভিতর দিয়ে হিচকক বুঝিয়েছিলেন- লোকটা কত বাজে। হিচককের রঙিন মুভি- 'রিয়ার উইন্ডো', 'ভারটিগো', 'রোপ', 'ডায়াল এম ফর মার্ডার', 'নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট', 'ফ্রেঞ্জি'... ভেবেছিলাম শাদাকালোর গভীর কিয়েরোস্কুরো থেকে বের হয়ে এলে ভয় কম লাগবে, হায়! 

এখানে স্মরণ করছি 'দ্য আর্টিস্ট' (নির্বাক চলচ্চিত্রযুগের নায়কের সঙ্গে টকিজ আমলের দ্বন্দ্ব), 'ব্লু জে' (পুরনো শহরে ফিরে পুরনো জখম নাড়াচাড়া), আর 'বেলফাস্ট' (বাড়ি বদলে যায়)- নয়া জমানার শাদাকালো মুভি, দেখে খুব ভালো লেগেছিল। শাদাকালোয় 'শিন্ডলার্স লিস্ট'-এর সহ্যাতীত নিষ্ঠুরতা আমাকে বহুদিন তাড়িত করেছিল। ১৯৬৪তে শাদাকালোয় সুইডিশ একটি মুভি তৈরি হয়েছিল- 'ডিয়ার জন', পিন্টারেস্ক ভঙ্গিতে অতীত-বর্তমান আগুপিছু করে লেখা চিত্রনাট্য, দুর্দান্ত। কিচেনসিংক ড্রামা নিয়ে বিস্তারিত আগেই লিখেছি ইজেলে, এখানে আর লিখছি না, শাদাকালোর তীক্ষ্ণ ক্ষিপ্র অথচ মাদক তন্ময় ভঙ্গিকে কত যুতসইভাবে সিনেমায় ব্যবহার করা যায় তার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বিলেতের কিচেনসিংক মুভি। 'ডেস্ট্রি রাইডস অ্যাগেইন', 'দ্য ম্যান হু শট লিবার্টি ভ্যালান্স', 'দ্য ম্যান ফ্রম লারামি', 'হাই নুন', 'মাই ডার্লিং ক্লেমেন্টাইন'... সত্যের জয় আর মানুষের কল্যাণে মানুষের আহুতি নিয়ে কত চমৎকার সব গোগ্রাসে গিলবার মতো মুভি বানানো সম্ভব তা দেখিয়েছে ওয়েস্টার্ন মুভি! মনে আছে টেকনিকালার দুনিয়ার ওয়েস্টার্ন 'শেইন'-এ কয়েকদিনের অতিথি শেইন চলে যাবার বেলায় মরুময় রাতের আকাশ কাঁপিয়ে শিশুটির সেই চিৎকার- "শেইন!!" সে অনেককিছুর দোহাই দিয়েছে, মায়ের বাপের কত কাজ বাকি আছে শেইনের সঙ্গে মিলে করবার, অবশেষে শেইন যখন কিছুতেই ফিরত আসছে না- সে কেবল মর্মন্তুদ চিৎকার করে নাম ধরে ডেকে জানিয়ে দিয়েছিল তার শিশুহৃদয় এ বিরহ মানতে নারাজ, এতক্ষণের আমড়াগাছি আসলে তারই অপূর্ণ স্নেহভূক প্রাণের আহ্বান। 

'দেবদাস' সিনেমার একটি দৃশ্যে দিলীপ কুমার ও সুচিত্রা সেন।

'ইন দ্য হীট অভ দ্য নাইট'-এ অসহনীয় রাগে মুখ বিকৃত করে সিডনি পোয়াটিয়ের সংলাপ- "দে কল মি মিস্টার টিবস!" 'গন উইথ দ্য উইন্ড'-এ প্রেমিকাকে স্ত্রী এবং সন্তানের মা হিসেবে পাবার পরেও পুরোপুরি পেতে অক্ষম ক্লার্ক গেবল আধা-হাসি আধা-বিদ্রুপে চলে যেতে যেতে বলছেন- "ফ্র্যাংকলি মাই ডিয়ার, আই ডোন্ট গিভ আ ড্যাম!"...চিরনির্ভর প্রিয়জন চলে যাচ্ছে, পরমুহূর্তে ভিভিয়ান লী ভাবছেন- কাল ভাববো, কাল কাঁদবো, কাল ওকে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করবো, "আফটার অল টুমরো ইজ অ্যানাদার ডে!" 'বুচ ক্যাসিডি অ্যান্ড দ্য সানড্যান্স কিড'কে স্মরণ না করে এ লেখা এগোনো অসম্ভব, শেষ দৃশ্যে অত সুন্দর দুটি মানুষ কি মরে গেল নাকি অমর হয়ে রইলো... অল্পবয়সের ধন্ধ আমার। 'দ্য স্নোজ অভ কিলিমাঞ্জারো'তে মৃত্যুর গন্ধ জেঁকে ধরেছে নায়ক হ্যারিকে (গ্রেগরি পেক), পায়ের আঘাত থেকে গ্যাংগ্রিন হয়ে গেছে, যেন তার আসন্ন মৃত্যুর গন্ধেই মগডালে শকুন এসে বসেছে- বিহঙ্গদৃষ্টিতে পর্যালোচনা করছে পরবর্তী খাদ্য। তিক্ত-সংরক্তমুখে হ্যারি একটি সংলাপ বলে- "একদমকায় দরজাটা হঠাৎ খুলে গেলেই দেখা যাবে অনন্ত রিক্ততার ভেতর অনন্তকাল ধরে মৃত্যু দাঁড়িয়ে ছিল!" যুদ্ধভিত্তিক সিনেমা অথচ পাদপ্রদীপের প্রগাঢ় আলো পড়েছে মানবিকতায়, এমন দুটি ভারী প্রিয় মুভি 'লাইফ ইজ বিউটিফুল' আর 'দ্য পিয়ানিস্ট'। আর প্রিয় কিছু সামাজিকভাবে অযোগ্য- বোকাসোকা- একাগ্র লোককে নিয়ে মুভি- 'এডওয়ার্ড সিজারহ্যান্ডস'। 'প্যাটারসন'। 'ইল পস্তিনো'। অ্যানিমেশন হিসেবে ভীষণ প্রিয় 'দ্য বয়, দ্য মোল, দ্য ফক্স অ্যান্ড দ্য হর্স', 'হুইস্পার অভ দ্য হার্ট' আর 'ওয়াল-ঈ'। 

নারীকে কেন্দ্র করে কিছু মর্মভেদী মুভি তৈরি হয়েছে, এখানে আমার তেমন কিছু প্রিয় মুভির নাম উল্লেখ করছি- 'বেলজ অভ সেন্ট ম্যারিজ', 'গন উইথ দ্য উইন্ড', 'আউট অভ আফ্রিকা', 'ভেরা ড্রেক', 'ফিলোমিনা', 'দ্য ফ্রেঞ্চ লেফটেন্যান্টস ওম্যান', 'দ্য রিডার', 'মডি', 'দ্য শেপ অভ ওয়াটার'। সিনেমায় নারী নিয়ে আরেকটি লেখায় বিশদ করে লিখেছি, কেমন করে স্কারলেট ও'হারা উপন্যাসে মাতা অথচ সিনেমায় সন্তান নেই, কেমন করে সিনেমা হিট হলো অথচ পর্দায় স্কারলেটের কৃষ্ণাঙ্গী দাসীরা সেই দৃশ্য দেখতে পেলেন না, এমনি অজস্র খুঁটিনাটি। এখানে আর ভারাক্রান্ত করলাম না। 'রোমান হলিডে'র অপূরিত কামনার ফসল যেন 'নটিং হিল', খুব ভালো লেগেছিল আমার। নায়ক-নায়িকা-পটভূমি সবের বিচারে ভীষণ প্রিয় 'দ্য ইংলিশ পেশেন্ট'। আমার বহু প্রিয় সিনেমা প্রথম ছিল মঞ্চনাটক, তীক্ষ্ণ সংলাপ, ক্ষুরধার মনীষা, নিষ্ঠুর বাস্তব। যেমন 'শশাঙ্ক রিডেম্পশন', 'দ্য গডফাদার', 'শিন্ডলার্স লিস্ট'।  'ব্রোকব্যাক মাউন্টেন' অবশ্য সিনেমায় এসেছিল নন্দিত ছোটগল্প হবার পরে। 'লাইফ অভ পাই' যতবার দেখি চোখ সজল হয়, ভয়াল সমুদ্র যেখানে 'সকলি সমান করে', যেখানে অত ক্ষমতাধর বাঘের চোখেও মরবার ভয়। ডাঙার নাগাল পেতেই পাইয়ের মহাসমুদ্রের মিতা সেই বাঘ চলে গেল অরণ্যের দিকে, থমকালো কিন্তু ফিরে তাকালো না। পাই প্রায়-অচেতন অবস্থায় ডুকরে কাঁদলো, এতদিনের বন্ধুকে তো বিদায় বলা হলো না। 

'দ্য ক্রেইনস আর ফ্লাইং' সিনেমার একটি দৃশ্য।

হিন্দি সিনেমার কথা না বললে তো আমাদের সত্তুর-আশির দশকের শৈশব অপূর্ণ থেকে যায়। শাদাকালো হিন্দি সিনেমা নিয়ে আমি আলাদা করে লিখতে চাই, দিলীপ কুমার- দেব আনন্দ- মীনাকুমারী- নার্গিস- মধুবালা... শাদাকালোয় 'পিয়াসা', 'সাহেব বিবি গোলাম'-এর গুরু দত্তকে ভোলা অসম্ভব, বিমল রায়ের 'বন্দিনী' নূতন ভাইদুজের গীত গাইছেন যাঁতা পিষতে পিষতে আর 'দেবদাস'-এ দিলীপকুমার মেঘলাদিনে হতভম্ব হয়ে দীঘির পাড়ে বসে আছেন। এ-লেখায় রঙিন নিয়েই বলছি। তখন হিন্দি সিনেমার প্রথম দশ মিনিটে খুন-জেলহাজত-ধর্ষণ-প্রতিহিংসার ইন্ধন এইসব স-ব হয়ে যেত। তারপর কারো কোলে একটি নবজাতক কেঁদে উঠতো, সেটি অবধারিতভাবে ছেলেশিশু (সিনেমা জানে কোন লিঙ্গের শিশু করিৎকর্মা এ চরাচরে)। শিশুটি জন্মাতেই বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হতো। শিশুটির একমাত্র জীবিত অভিভাবক ঠিক করতো—এই পুরুষই হবে আগামী তিন ঘন্টা তিলকে তাল করবে, খুন-জখম-রাহাজানি-চোরাচালানের শাস্তি দেবে, প্রেম করবে জবায় জবা ঘষে—তখন শুয়ে শুয়ে গল্প করবে আর দৌড়ে দৌড়ে গান করবে। কলাবতীর ঝোপঝাড় থেকে চকিতে লাফিয়ে উঠবে নায়িকা— আদি নারী পৃথিবীতে অবতরণের পর থেকে আজ অব্দি অমন দগদগে যৌন-আবেদনময় (শব্দটা কী নিরাবেদন!) আর কিছু সৃষ্টি হয়নি, কাজলটানা চোখ- জরিমোড়া বিনুনি- অভ্রজ্বলা ঠোঁট- কপাল ঘিরে ঘনকৃষ্ণ চুলের ফ্রিঞ্জ, মাংসল পেটের মোচড়। টানা তিন ঘন্টার ঝাঁ ঝাঁ অর্কেস্ট্রার উত্তুঙ্গ বাদন শুনে মাথা ধরে যেত, সিনেমা ফুরালে মনে হতো, যে সারাজীবন নোংরামো করলো, পাহাড়প্রমাণ অনিষ্ট করলো, সেই খুনিয়ার শুধু ফাঁসি হলো বা অপঘাতে মৃত্যু হলো, অথবা আরো বিশ্রী ব্যাপার হলো—পুলিশ শেষ অব্দি অকুস্থলে এসে নায়ককে অনুনয় করলো—"আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না।" ভালো-মন্দের খুব তফাত তখন বুঝতাম না, পর্দায় যাকেই মন্দমতন মনে হতো, তার দিকে আঙুল তুলে বড়দের জিজ্ঞেস করতাম—"আচ্ছা, ও কি ভালো না খারাপ?" অমিতাভ বচ্চন কোথাও মারা গেলে হাপুসনয়নে কাঁদতাম। 'সিলসিলা'য় উত্তাল প্রেম রেখার সঙ্গে অথচ শেষ দৃশ্যে স্ত্রী জয়া ভাদুড়ি সন্তানসম্ভবা, আমার মনে একটুও খটকা লাগতো না (অবনীন্দ্রনাথের 'ক্ষীরের পুতুল'-এ প্রাসাদপরিত্যক্তা দুয়োরাণীর পেটে ছেলে এসেছে শুনে রাজা নেচে উঠতেন, খটকা লাগতো কি?)! সিনেমার গোরু দিব্যি গাছে উঠতো, তাতেও তো সন্দেহ জাগতো না মনে। 'মাদার ইন্ডিয়া' ভারতবর্ষের এক প্রত্যন্তপল্লীর বধুর জীবনসংগ্রামের গল্প, কিন্তু কোথাও গিয়ে সেটি গ্র্যান্ড মেটাফর। সার্থক সিনেমা দর্শকের চোখে কখনো আতশীকাঁচ ধরে, কখনো মাইক্রোস্কোপ, কখনো বাইনোকুলার। কিন্তু দর্শক যা দ্যাখে তা তাকে বৃহত্তর মহত্তর গাঢ়তর একটি জীবনসত্যে উত্তীর্ণ করে। 

যদি বলি, ঐসব সিনেমার কারণে ছোট্টবেলার স্বপ্নগুলো দক্ষিণী কাঞ্চিপুরম শাড়ির মতো তীব্র রঙের! ওসব সিনেমার কারণে একটা 'সত্যমেব জয়তে'-মার্কা সিনেমাটিক বোধ আমাকে কিছুতেই ছাড়তে চায়নি! শেষপাতে রইতো সিনেমায় দেখা— 'সিনসিনারি'। সবুজতম পাইন অরণ্য, নীল আকাশে আইসক্রিম মেশিনে জমানো ফোলা ফোলা মেঘ, উপলখন্ডের ওপর ঝাপটানো ফেনিল ঝর্ণা, আদিগন্ত টিউলিপের উদ্যান, কুতুব মিনার- শালিমারবাগ- ডাল লেক, আমরা জোকার দিয়ে উঠতাম—"সব সুন্দর জায়গা ইন্ডিয়া নিয়া নিছে!" ওসবের বাইরেও হিন্দি মুভি ছিল। শাবানা আজমী- স্মিতা পাতিল- দীপ্তি নাভাল- ডিম্পল কাপাডিয়া- নাসিরুদ্দিন শাহ- ওম পুরি ভয়ানক বাস্তবের এমন তোবড়ানো ফল হাতে দিতেন যে গ্রহীতা শিউরে উঠতো। কখনো অমল পালেকর- ফারুক শেখের মিষ্টি হাসির মুভি। 

'দ্য ম্যান হু শ্যুট লিবার্টি ভ্যালান্স' সিনেমার একটি দৃশ্য।

বাংলা সিনেমার প্রসঙ্গ এলে উত্তম-সুচিত্রা আসবেন সর্বাগ্রে। এঁদের দুজনের অভিনীত সিনেমা আলাদা একটি মস্ত লেখা দাবী করে, ছুটির দুপুরে তারিয়ে তারিয়ে ইলিশের ঝোল দিয়ে ভাত খাবার মতো করে ওসব লেখা চাই। ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব, সাহিত্যভিত্তিক চিত্রনাট্য, চোখা সংলাপ, প্রাণঢালা অভিনয় আর অসাধারণ রুপবান/বতী দুটি মানুষ, বাঙালি তখন জানতো- প্রেমকে কেন্দ্রে রেখে সমস্ত সংঘাত সার্থক করে তোলা সম্ভব। ব্যক্তিগতভাবে আমার এ জুটির সবচেয়ে প্রিয় মুভি 'জীবনতৃষ্ণা'। উত্তমকুমার 'অগ্নিপরীক্ষা'য় যত স্মার্ট, হিন্দি 'ছোটিসি মুলাকাত'-এ তা নন, কারণ বৈজয়ন্তীমালা সুচিত্রা সেনের মতো করে বাল্যবিবাহিতা আধুনিকা নারীর যন্ত্রণা আর দ্বিধাদীর্ণ চরিত্র ফোটাতে পারেননি। উত্তমকুমারহীন সিনেমাগুলোয় সুচিত্রা সেন- নার্স রাধা মিত্র, শিক্ষিকা অর্চনা দত্ত, ডাক্তার শর্বরী... কি অঢেল প্রতিভা নিয়ে জন্মেছিলেন মানুষটি। 

সত্যজিত রায়ের 'কাঞ্চনজঙ্ঘা' আর 'অরণ্যের দিনরাত্রি' আমার খুব প্রিয়। নাম বদলাবার বাতিক ছিল তাঁর, 'নষ্টনীড়'-এর চারুবালাকে চারুলতা, 'সমাপ্তি'র অপূর্বকে অমূল্য, 'অরণ্যের দিনরাত্রি'র রবিকে হরি করা হলো, কিন্তু সঞ্জয়ের চরিত্রটা দেয়া হলো শেখরকে আর শেখরকে বানানো হলো সঞ্জয়। বালায় আর লতায় যে মার্জনার তফাত তা তিনি জানতেন নিশ্চয়ই, চারু তো শুরুতে বালা-ই ছিল, একান্ত অন্তঃপুরিকা। মনে আছে, ক্লাস সিক্সে রেজাল্ট বের হবার পরে আব্বা কাছে বসিয়ে দেখালো 'সোনার কেল্লা'। প্রিয় ঋত্বিক ঘটকের উন্মনা 'সুবর্ণরেখা' আর সংরক্ত 'তিতাস একটি নদীর নাম', প্রিয় মৃণাল সেনের 'মৃগয়া'তে আদিবাসী যুগলের সেই খড়ের মেঝেয় বিবাহবাসর, মিঠুন চক্রবর্তী গুঁড়ি মেরে প্রতীক্ষমান মমতাশংকরের কাছে এসে বলেন- "তোকে আমি বাঘের মতো উঠিয়ে নিয়ে যাবো! আমি তোকে বাজের মতো উড়িয়ে নিয়ে যাবো!" অভিভূত হয়েছিলাম অপর্ণা সেনের 'থার্টিসিক্স চৌরঙ্গী লেন' দেখে, 'পরমা'ও খুব ভালো লেগেছিল। ঋতুপর্ণ ঘোষের 'চোখের বালি' কিংবা 'নৌকাডুবি' আমার ভালোলাগেনি, বরং ঢের ভালো লেগেছে 'বাড়িউলি', 'মেমোরিজ ইন মার্চ', 'রেইনকোট', 'তিতলি', 'দোসর', 'অসুখ'। 

বড় হয়েছি অত্যন্ত সংরক্ষিত পরিবেশে, বাড়িতে এফডিসির বাংলা সিনেমা বা সিনেমার গানের অনুষ্ঠান 'ছায়াছন্দ' দেখতে দেয়া হতো না, সিনে-পত্রিকা এমন করে সরিয়ে রাখা হতো যেন আমি ধূর্ত উই- পেলেই ঝুরঝুরে করে কেটে ফেলবো। মনে পড়ে আব্বা-আম্মা কেবল দেখিয়েছিল জহির রায়হানের- 'জীবন থেকে নেয়া', আর সম্ভবত 'তেরো নম্বর ফেকু ওস্তাগর লেন'। রাজ্যের রেডিও বাজতো আশপাশের বাড়িতে, ফলে সিনেমার গান তো মুখস্তই হয়ে যেত। ওরে নীল দরিয়া। এক নদী রক্ত পেরিয়ে। এই বৃষ্টিভেজা রাতে চলে যেও না। বেলা বয়ে যায় মধুমতী গাঁয়। আমার গোরুর গাড়িতে। পাথরের পৃথিবীতে কাঁচের হৃদয়। সিনেমার গানে আলতাফ মাহমুদ আর খান আতার ফোকের ব্যবহার খুব ভালো লাগতো। সকালের ইত্তেফাকে দুই পাতাজোড়া সিনেমার পোস্টার, সেই পোস্টারে নায়কনায়িকার ঘর্মাক্ত ব্যথাক্লিষ্ট প্রেমাতুর চেহারার আশপাশে অসংখ্য সাইড ক্যারেক্টারের চেহারা, এক অদেখা পৃথিবী! ঈদেচাঁদে আত্মীয়দের বাড়িতে গেলে তবেই দেখতাম সামাজিক ছবি চলছে। শাবানা একে একে সাতটি সন্তানকে দত্তক দিচ্ছেন, দশাসই জসীম এখনো পরীক্ষা-দেয়া ছাত্র। ভিক্ষাজীবী হিসেবেও ববিতার ঠোঁটে গোলাপি লিপস্টিক আর প্লাক করা ভ্রু। ঝন্টুর ফোক নায়কদের পায়ে বুট। রঙ-জ্বলা ছবি আর ক্রমাগত শীৎকার-হাসি-ঢিসুম। সম্ভবত এসএসসির সময় আম্মাদের সঙ্গে সিনেমা হলে গিয়ে দেখতে পেলাম প্রথম সিনেমা 'শঙ্খনীল কারাগার', দেখে আমার মেজাজ বিগড়ে গেল, উপন্যাসের চরিত্রগুলোর চেয়ে সব অভিনেতা কম করে হলেও পনেরো-বিশ বছরের বড়! 'আগুনের পরশমণি' দেখলাম এরপর, প্রিয় উপন্যাস। গ্লোরিফাইড নাটকই দেখলাম মনে হলো, সিনেমার মতো লাগলো না। উপন্যাসের মতো সিনেমারও তো গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ আছে, সে যা বলে তার চেয়েও বিশালতর কিছুর আভাস দেয়, নাটকের চেয়ে তার জৌলুস আলাদা, স্থিতিস্থাপকতা বেশি। 'সূর্যদীঘল বাড়ি' দেখে মুগ্ধ-বিস্মিত হলাম। 'সীমানা পেরিয়ে' দেখে অল্পবয়সেই কেন মনে হলো- গোঁজামিল! একে একে দেখলাম 'চিত্রা নদীর পারে', 'নদীর নাম মধুমতী'। 'মুক্তির গান' অডিটোরিয়ামে দেখলাম, বুয়েটের-মেডিকেলের বন্ধুরা অশ্রুকম্পিত গলায় প্রেক্ষাগৃহ কাঁপিয়ে বললাম- জয় বাংলা! টেলিফিল্মের জমানায় দেখলাম, সংলাপ চোখা নয়, লাগসইও নয়, পুনরাবৃত্ত তবে কথ্যভাষার ডায়লগ। আর সংলাপের পরিবর্তে মিউজিকে ডুবিয়ে দেয়া হচ্ছে কথোপকথন, আহা বাস্তব থেকে যদি বাস্তবিকই ওভাবে উদ্ধার পাওয়া যেত! 

'সিটি লাইটস' সিনেমার একটি দৃশ্য।

সিনেমা হলের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় 'মধুমিতা'য়, বাপের কোলে, অত বিশাল পর্দা দেখে নাকি ভয়ে কেঁদে ফেলেছিলাম। বাংলাদেশের সিনেমা হলের বাংলা নামগুলো আমার খুব ভালো লাগতো- মানসী, সাগরিকা, জলসা, বলাকা, অভিসার, উজালা। হাজার হাজার হল বন্ধ হয়ে গেছে, কত বিভাগীয় শহরেও আর সিনেমা হল নেই। দেশ জুড়ে টিকে আছে বোধ করি ৭০টি। মানুষ ছুটি পেতে যাবে কোথায়? তার খোলা উদ্যানও নেই, বদ্ধ প্রেক্ষাগৃহও নেই! আজ ফিরে দেখি- অঞ্জু ঘোষের র আর ড় উচ্চারণ কত সাবধানী আর পরিচ্ছন্ন। অলিভিয়া কি স্মার্ট। কবরী অনায়াস সাবলীল। রাজ্জাক বা রহমানের বুদ্ধিদীপ্ত অভিনয়। মনে ব্যথা বাজে, যখন পড়ি- উত্তমকুমারের কত সিনেমা সংরক্ষণই করা হয়নি। 

শাদাকালোয় 'ডেস্ট্রি রাইডস অ্যাগেইন'-এ মাতাল-অকেজো শেরিফ ঘোষণা করছেন- দুপেয়ে ক্যাকটাসটাতে (অপরাধী) তিনি এত জল ঢালবেন যেন কান দিয়ে লিলিফুল বের হয়ে আসে! কাউন্সিল ফ্ল্যাটে পোষ্য একটি সবুজাভ লিজার্ড, বাচ্চারা তার নাম দিয়েছে 'মানি' (টাকা)। ধুলিঝড়ে আটকা পড়া দুটি মানুষ পৃথিবীর মানচিত্রে রকমারী সব বাতাসের গল্প করছে। দমকা হাসির কিংবা রোমাঞ্চের কত নিরালা মুহূর্ত আমার, সাক্ষী শুধু সিনেমা। বিপন্ন বিস্ময়ও তো সিনেমা-ই, 'শিন্ডলার্স লিস্ট' যিনি বানাতে পারেন তিনি 'টেম্পল অভ ডুম' কী করে বানান? এলিয়া কাজানের মুভিতে ব্রান্ডোর সেই "আই কুডা হ্যাভ ক্লাস, আই কুডা বিন আ কনটেন্ডার, আই কুডা বীন সামবডি"...উক্তিটি পৃথিবীজোড়া বহু অকৃতকার্য অমীমাংসিত জীবনের স্বগতোক্তি হয়ে থাকবে। 'হাড'-এ পল নিউম্যান নেগেটিভ রোল করেছিলেন, একটি সংলাপ আমার খুব মনে আছে, দাদা তাঁর অনাথ নাতিকে বলছেন- "যেসব মানুষকে আমরা ভক্তি করছি, তার ভিত্তিতে ধীরে ধীরে আমাদের দেশের মুখ বদলে যাচ্ছে।" আজো ভারী লাগসই এই উক্তি।

Related Topics

টপ নিউজ

ইজেল / সিনেমা / বায়োস্কোপ / ক্ল্যাসিক / মুভি / বাংলা সিনেমা

Comments

While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.

MOST VIEWED

  • ছবি: পিটিআই
    দিল্লির হোটেলে অগ্নিকাণ্ড: নিহত ২১, আহত ৫ বাংলাদেশি
  • বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে পতাকা। ছবি: সংগৃহীত
    বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের ওপর ১০%–১২.৫% নতুন শুল্ক আরোপের প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের
  • তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দলটি থেকে বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: হিন্দুস্তান টাইমস
    ভাঙনের মুখে মমতার তৃণমূল, বহিষ্কৃত নেতা ঋতব্রতকে সমর্থন দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়কের
  • ছবি: সংগৃহীত
    মরুভূমির দেশ হয়েও যে কারণে বালু আমদানি করে সৌদি আরব
  • জেনিফার গোমেজ তার দাদি জিন ম্যাকনিল সার্জেন্টের একটি প্রতিকৃতি হাতে ধরে আছেন। ছবি: এজে+ ডাইরেক্ট ফ্রম/আল জাজিরা
    ইসরায়েলি সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য মার্কিন নৌবাহিনীর কাছে কি ‘মরদেহ বিক্রি’ করছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো?
  • ছবি: সংগৃহীত
    বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাদের ‘প্রগতি স্কিম’-এ অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ: সর্বজনীন পেনশনে জোর দিচ্ছে সরকার

Related News

  • শিশু ধর্ষণ ঠেকাতে না পারা রাষ্ট্র কেন সিনেমা বন্ধে মদদ দেয়: রুমিন ফারহানা
  • তারা
  • ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এবার পুলিশি বাধায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’র প্রদর্শনী বন্ধের অভিযোগ
  • যেভাবে একটি সিনেমা হল থেকে এল গুলিস্তানের নাম
  • বাজেট মাত্র সাড়ে ৭ লাখ ডলার, আয় ৮০ মিলিয়ন, যেভাবে বছরের সবচেয়ে বড় ‘হিট’ এই ছবি

Most Read

1
ছবি: পিটিআই
আন্তর্জাতিক

দিল্লির হোটেলে অগ্নিকাণ্ড: নিহত ২১, আহত ৫ বাংলাদেশি

2
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে পতাকা। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ

বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের ওপর ১০%–১২.৫% নতুন শুল্ক আরোপের প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের

3
তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দলটি থেকে বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: হিন্দুস্তান টাইমস
আন্তর্জাতিক

ভাঙনের মুখে মমতার তৃণমূল, বহিষ্কৃত নেতা ঋতব্রতকে সমর্থন দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়কের

4
ছবি: সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক

মরুভূমির দেশ হয়েও যে কারণে বালু আমদানি করে সৌদি আরব

5
জেনিফার গোমেজ তার দাদি জিন ম্যাকনিল সার্জেন্টের একটি প্রতিকৃতি হাতে ধরে আছেন। ছবি: এজে+ ডাইরেক্ট ফ্রম/আল জাজিরা
আন্তর্জাতিক

ইসরায়েলি সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য মার্কিন নৌবাহিনীর কাছে কি ‘মরদেহ বিক্রি’ করছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো?

6
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ

বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাদের ‘প্রগতি স্কিম’-এ অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ: সর্বজনীন পেনশনে জোর দিচ্ছে সরকার

The Business Standard
Top

Contact Us

The Business Standard

Main Office -4/A, Eskaton Garden, Dhaka- 1000

Phone: +8801847 416158 - 59

Send Opinion articles to - [email protected]

For advertisement- [email protected]

Copyright © 2022 THE BUSINESS STANDARD All rights reserved. Technical Partner: RSI Lab