ভারতবর্ষে সম্মোহনচর্চায় ‘জাদু হাসপাতাল’ খুলেছিলেন স্কটিশ ডাক্তার এসডেইল, পেয়েছিলেন সাফল্যও
পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তি তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ব্যবহার করে উপমহাদেশকে 'সভ্য করেছে' বলে অনেকে বিনাতর্কে মেনে নেন। স্থানীয় বিশ্বাস ও আচারপ্রথাগুলোবে উৎখাত করে পশ্চিমারা তার স্থলে নিজেদের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাকে বসিয়েছিল। তবে এসবের বিপরীত পশ্চিমা প্রতীক হিসেবে উপমহাদেশে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন ড. জেমস এসডেইল। জেস্টর ডেইলি'র প্রতিবেদনে জানা গেছে উপমহাদেশে কাজ করা এ স্কটিশ সম্মোহনবিদের কথা।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হয়ে হুগলি হাসপাতালে কাজ করার জন্য অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন ড. জেমস এসডেইল ১৮৩৯ সালে হুগলি পৌঁছান। এডনিবরা থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি নিয়েছিলেন এসডেইল। ফুসফুস দুর্বল থাকায় ডাক্তারের তাকে উষ্ণ পরিবেশে বায়ু পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেজন্যই বাংলাকে বেছে নেন তিনি।
বাংলায় থাকার সময়ে সম্মোহনবিদ্যা তথা মেসমারিজম বিষয়ে পড়ালেখা শুরু করেন এসডেইল। মেসমারিজমকে অ্যানিমেল ম্যাগনেটিজমও বলা হয়। হিপনোসিস বা সম্মোহনবিদ্যার চর্চা ১৭৭৫ সালে ফ্রাঞ্জ মেসমার নামক জার্মান এক চিকিৎসক আবিষ্কার করেছিলেন।
ব্রিটেনে ১৯ শতকের দিকে সম্মোহনচর্চা জনপ্রিয় হতে শুরু করে। বলা হতো, সম্মোহনবিদ্যার মাধ্যমে ব্যক্তিকে অবেদন করা সম্ভব ছিল এবং এটি ব্যবহার করে স্নায়ুরোগে ভোগা রোগীদের চিকিৎসা করা যেত।
এসডেইল মেসমারিজম ইন ইন্ডিয়া, অ্যান্ড ইটস প্র্যাকটিক্যাল অ্যাপ্লিকেশন ইন সার্জারি অ্যান্ড মেডিসিন শীর্ষক একটি বই লিখেছিলেন। সেখানে তিনি বর্ণনা করেন, ১৮৪৫ সালের এপ্রিল মাসে মাধব কৌরা নামক জনৈক হিন্দু ব্যক্তির মুষ্কে অস্ত্রোপচারের জন্য হুগলি কারাগার থেকে তার কাছে পাঠানো হয়।
অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর যন্ত্রণা দেখে এসডেইল তার সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন, স্থানীয় মেডিকেল কলেজের নেটিভ শিক্ষার্থীর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করেন তিনি কখনো সম্মোহন দেখেছেন কিনা। উত্তরে ওই উপ-সহকারী সার্জন জানান, তার মেডিকেল কলেজে তিনি সম্মোহনের ব্যবহার হতে দেখেছেন, কিন্তু সেটা কখনো অভীষ্ট ফল দিতে পারেনি।
এসডেইল তখন ভাবলেন, 'বই পড়ে সম্মোহন শিখেছি তো কী হয়েছে, একবার চেষ্টা করে দেখাই যাক না।'
'আমি রোগীর হাঁটুজোড়া আমার দুই হাঁটুর মাঝে স্থাপন করলাম। এরপর তার মুখ থেকে ইঞ্চিখানেক দূরে ধীরে ধীরে আমার হাতদুটোকে আন্দোলিত করতে শুরু করলাম। তারপর সেগুলোকে তার পাকস্থলি সমান নামিয়ে আনলাম। এ প্রক্রিয়া চলল প্রায় আধাঘণ্টার মতো…' এসডেইল লিখেন।
যদিও তার সম্মোহনে কাজ হয়েছিল, তবে রোগীর যন্ত্রণা উপশম ও সংজ্ঞাহীন হতে এসডেইলের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় লেগেছিল। রোগীর এ সমাধিদশার গভীরতা মাপতে এসডেইল রোগীর হাঁটুর কাছে আগুনের ছোঁয়াও লাগিয়েছিলেন। তাতেও রোগী কোনো প্রকার বেদনা অনুভব করেননি।
ওই বছর কোনো বেদনানাশক ছাড়াই সম্মোহন প্রয়োগ করে আরও ৭২টি অপারেশন করেছিলেন ড. এসডেইল। এরপর সরকার একটি কমিটি তৈরি করে। ওই কমিটিতে একাধিক ম্যাজিস্ট্রেট ও ইনস্পেক্টর জেনারেল অব হসপিটালস-এর মতো ঔপনিবেশিক বাংলার সব রাঘববোয়ালরা ছিলেন। তারা মেডিকেল অফিসারদের পর্যবেক্ষণের সাপেক্ষে জেমস এসডেইলকে একটি পরীক্ষামূলক সম্মোহন হাসপাতাল পরিচালনার অনুমতি দেন।
এসডেইলের সম্মোহনচর্চা স্থানীয়দের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। ইতিহাসবিদ অ্যালান গল্ড লিখেছেন, এসডেইল সম্মোহনবিদ্যা প্রয়োগ করে কয়েকশ অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেছিলেন এবং তার রোগীদের মৃত্যুহার ছিল কেবল পাঁচ শতাংশ। অন্য পদ্ধতিগুলোতে এ হার ছিল ৫০ শতাংশ বা তার চেয়েও বেশি।
হুগলি হাসপাতাল 'জাদু হাসপাতাল' নামে স্থানীয়দের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। তবে হাসপাতালের কাজকারবারের জন্য যতটা না এটি এমন তকমা পেয়েছিল, তার চেয়ে বেশি হয়েছিল এসডেইলের 'বিলেতি মন্তর' (দ্য ইউরোপিয়ান চার্ম) শব্দ ব্যবহারের কারণে। তিনি যখন কোনো ভারতীয় সহকারীকে সম্মোহন বোঝাতেন, তখন প্রক্রিয়াটিতে 'বিলেতি মন্তর' হিসেবে বর্ণনা করতেন।
প্রাথমিকভাবে এসডেইলের পরীক্ষণকে রিভিউ কমিটি অনুমোদন করলেও, সম্মোহনকে তখনো মোটামুটি সিউডোসায়েন্স ও বনেদি ইউরোপীয়দের জন্য তামাশা হিসেবে বিবেচিত হতো। এসডেইল জানিয়েছেন, সম্মোহন করতে গিয়ে তিনি প্রচুর ক্লান্ত হয়ে যেতেন।
নিজের হাসপাতালে সম্মোহন পরিচালনার জন্য এসডেইল তাই স্থানীয় সহকারীদের ব্যবহার করতেন। এ সম্মোহনকারীরা রোগীকে একটি অন্ধকার ঘরে নিয়ে গিয়ে তাদের কাজ করতেন। কাজ শেষ হলে এসডেইল এসে পরীক্ষা ও নিশ্চিত করতেন সম্মোহন সম্পূর্ণ হয়েছে কিনা।
কোনো কোনো রোগীকে সম্মোহন করতে অনেকদিন লেগে যেত। রোগী সম্মোহিত হওয়ার পর এসডেইল অস্ত্রোপচার শুরু করতেন। যেসব ডাক্তার এসডেইলের এ চর্চা পর্যবেক্ষণ করতেন তারা লিখেছেন, সম্মোহনকারীভেদে সমাধিদশা সৃষ্টি করার প্রক্রিয়া আলাদা হতো। এটির সুনির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ড তৈরি করা কঠিন ছিল।
আরেকটি প্রতিবন্ধকতা ছিল, সম্মোহন ও জাদুবিদ্যা প্রায় একই মনে হতো। এদিকে এসডেইল চেয়েছিলেন নিজেকে 'ফেইথ হিলিং' থেকে দূরে সরিয়ে সম্মোহনকে বিজ্ঞান হিসেবে উপস্থাপন করতে।
আর সে কাজটা কিছুটা তিনি করেছেনও ইউরোপীয়দের চিকিৎসার ওপর সম্মোহনচর্চা চালিয়ে। এসডেইল তার কাজের ফলাফল স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে লিখতেন। এটারও উদ্দেশ্য ছিল নিজের কাজকে বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
জেমস এসডেইলের বেশিরভাগ রোগী ছিলেন নেটিভ তথা ভারতীয়। সাধারণ নাগরিক বা আসামীদের থেকেই রোগীর জোগাড় হতো তার। এসব রোগীদের তিনি বর্ণনা করেছেন 'দুর্বলচিত্ত, অপুষ্ট জাত, ও স্নায়বিক শক্তিতে অত্যাশ্চর্যভাবে ঊন' হিসেবে।
তবে শেষ পর্যন্ত আর্থিক কারণে এসডেইলের সম্মোহন হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য এর পেছনে বিজ্ঞানের অগ্রগতির ভূমিকাও ছিল।
সম্মোহনবিদ্যার প্রয়োগ একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া ছিল। এসডেইলের সম্মোহনের সমালোচক, অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন ড. ফ্রেডেরিক জে. মুয়াট লিখেছেন, ওই হাসপাতালে সম্মোহনের জন্য বাড়তি আরও ৭৫০ রুপি খরচ করা হতো। কারণ প্রতি চার জন রোগীর জন্য একজন করে সম্মোহনকারীর দরকার হতো।
এছাড়া, ১৮৪০-এর দশকের শেষের দিকে ইথার ও ক্লোরোফর্ম ব্যবহার শুরু হয়। এগুলো ছিল তুলনামূলক সস্তা, আরও বেশি কার্যকরী, ও পশ্চিমা চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে জুতসই। একপর্যায়ে অনিচ্ছুক এসডেইলও স্বীকার করেছিলেন, সম্মোহনের চেয়ে ওই রাসায়নিক উপাদানগুলোর ক্ষমতা বেশি ছিল।
১৮৪৮ সালে প্রেসিডেন্সি সার্জন হন এসডেইল। ১৮৫১ সালে স্কটল্যান্ডে ফিরে যান এ শল্যচিকিৎসক। এরপর নিজের ফুসফুসের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে স্কটল্যান্ড ছেড়ে লন্ডনের সিডেনহামে বাস করতে শুরু করেন তিনি। ৫১ বছর বয়সে ১৮৫৯ সালে সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ড. জেমস এসডেইল।
