বিশ্বকাপে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার হার, ইসরায়েলকে ইঙ্গিত করে ফিলিস্তিনের অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্টে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট
এবারের ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে স্পেনের জয়ের পর ইসরায়েলকে খোঁচা দিয়ে পোস্ট করেছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অফিসিয়াল 'এক্স' (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট।
অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের জয়সূচক গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে স্পেন, যার মধ্য দিয়ে লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ অভিযান হারের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
ইসরায়েলের মিত্র দেশ আর্জেন্টিনা ট্রফি জিতুক—প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সেটা নিয়ে নিজের ইচ্ছার কথা গোপন করেননি। গত শনিবার তিনি আর্জেন্টিনাকে শুভকামনা জানিয়ে 'ভামোস আর্জেন্টিনা' বলেছিলেন। দেশটির উগ্র-ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও আর্জেন্টিনার জয়ের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছিলেন।
ফিলিস্তিনের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট একটি ছবি রিপোস্ট করেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে—যেদিন নেতানিয়াহু আর্জেন্টিনার প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছিলেন, সেদিন ইসরায়েলে নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত শিমন অ্যাক্সেল ওয়াহনিশ নেতানিয়াহুকে একটি ফুটবল ও জার্সি উপহার দিচ্ছেন। ওই ছবির সাথে স্পেনের বিজয়ী দলের একটি ছবি যুক্ত করে ক্যাপশনে লেখা হয়, 'ক্যাম্পেওনেস দেল মুন্দো' (বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন)। এই প্রতিবেদনটি লেখার সময় পর্যন্ত ছবিটি প্রায় নব্বই লাখ (৯ মিলিয়ন) বার দেখা হয়েছে।
নেতানিয়াহু এবং আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই এর মধ্যে বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে; ইসরায়েলি নেতা মিলেই-কে দেশটির একজন 'মহান বন্ধু' হিসেবে অভিহিত করেছেন। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েল হামলার পর মিলেই জানিয়েছিলেন, তিনি বিশ্বের সবচেয়ে জায়নবাদী প্রেসিডেন্ট হতে পেরে গর্বিত।
গত এপ্রিলে ইসরায়েলের ৭৮তম স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন অনুষ্ঠানে মিলেই বলেছিলেন, ইসরায়েল ও আর্জেন্টিনা অভিন্ন নৈতিক মূল্যবোধে ঐক্যবদ্ধ, আজীবনের অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ।
এদিকে স্পেন শুরু থেকেই ইসরায়েলের অন্যতম কট্টর সমালোচক হিসেবে ভূমিকা রাখছে এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ প্রকাশ্যেই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগ এনেছেন। তবে ইসরায়েল বরাবরই তাদের বিরুদ্ধে আনা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে বার্সেলোনার শিরোপা উদযাপনের প্যারেডে ১৯ বছর বয়সী স্প্যানিশ খেলোয়াড় লামিনে ইয়ামাল ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়ানোর পর, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ তার বিরুদ্ধে 'ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ঘৃণা উসকে দেওয়ার' পথ বেছে নেওয়ার অভিযোগ তোলেন।
ইয়ামালের এই পদক্ষেপের পর গাজা উপত্যকার ধ্বংসস্তূপের ওপর তার দেয়ালচিত্র আঁকেন ফিলিস্তিনি শিল্পীরা; একই সাথে ফিলিস্তিনিরা এই কিশোর ফুটবলারের প্রতি সমর্থন জানাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় মেতে ওঠেন।
গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় তাদের অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া বাড়ছে। চলমান এই বোমা হামলায় ইতোমধ্যে ৭৩ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
গত বছরের অক্টোবরে নরওয়ে যখন একটি বাছাইপর্বের ম্যাচে ইসরায়েলের মুখোমুখি হয়েছিল, তখন নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশন ঘোষণা করেছিল যে এই ম্যাচ থেকে প্রাপ্ত সমস্ত লভ্যাংশ গাজায় ত্রাণ সহায়তার জন্য দান করা হবে। সে সময় গ্যালারিতে ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়ানো হয় এবং 'ফ্রি প্যালেস্টাইন' স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে স্টেডিয়াম।
ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর যেভাবে রাশিয়াকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, ঠিক একইভাবে ইসরায়েলকেও বরখাস্ত করার জন্য চাপ দিয়ে আসছে ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। এর পক্ষে যুক্তি হিসেবে তারা গাজায় নৃশংসতা, অবৈধ পশ্চিম তীরের বসতিতে ফুটবল ক্লাব পরিচালনা এবং আরব অ্যাথলেটদের প্রতি বৈষম্যের কথা উল্লেখ করেছে।
এছাড়াও, চলতি বছরের ৮ জুলাই গাজায় মিসর বনাম আর্জেন্টিনার ম্যাচ প্রদর্শনের আয়োজনকারী একজন ফিলিস্তিনি ত্রাণ কর্মকর্তাকে খেলা শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে ইসরায়েল হত্যা করার পর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে দেশটি।
ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৮৯৪ জন ফিলিস্তিনি ক্রীড়াবিদ নিহত হয়েছেন।
ডিয়েগো ম্যারাডোনাসহ অন্যান্য আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়রাও অতীতে ফিলিস্তিনের প্রতি খোলাখুলি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন। ২০১৮ সালে এই ফুটবল কিংবদন্তি ঘোষণা করেছিলেন, আমার হৃদয়ে, আমি ফিলিস্তিনি।'
