দেম্বেলের হ্যাটট্রিক শো দেখাল কেন ফ্রান্স বিশ্বকাপ ফেভারিট
মাঠের সব আলো কেড়ে নেওয়ার কথা ছিল কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হালান্ডের। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে ম্যাচের আসল নায়ক বনে গেলেন উসমান দেম্বেলে। এমবাপ্পে ও হালান্ডকে ছাপিয়ে ২৫ মিনিটের হ্যাটট্রিক ঝড়ে নরওয়েকে গুঁড়িয়ে দিলেন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড। দেম্বেলের এই তাণ্ডবের দিনে নরওয়েকে ৪-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের শক্তির জানান দিল ফ্রান্স।
ফরাসি আক্রমণের ধার এতটাই যে, দলের একজন ব্যর্থ হলে গোল করার জন্য প্রস্তুত থাকেন অন্যজন। দেম্বেলে বা এমবাপ্পে তো আছেনই, সঙ্গে মাইকেল অলিস, ব্র্যাডলি বারকোলা কিংবা শেষ দিকে গোল করা দেজিরে দুয়েদের নিয়ে গড়া ফরাসি আক্রমণভাগ যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্যই এক আতঙ্কের নাম।
ম্যাচের আগে সবার নজর ছিল এমবাপ্পে বনাম হালান্ড দ্বৈরথের দিকে। কিন্তু নরওয়ের কোচ স্টেল সোলবাকেন প্রথম স্থান পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তার দলের ১০ জন নিয়মিত খেলোয়াড়কে বিশ্রামে রাখার বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেন। ফলে প্রিয় তারকা হালান্ডকে ছাড়াই মাঠে নামতে হয় নরওয়েকে। বস্টনের ফক্সবরো স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে আসা নরওয়ের সমর্থকেরা, যারা হাজার হাজার ক্রোন খরচ করে এসেছিলেন, তারা শুরু থেকেই গ্যালারিতে 'আমরা হালান্ডকে চাই' বলে চিৎকার করছিলেন। কিন্তু তাদের কপালে হালান্ডের খেলা না জুটলেও, তারা দেখলেন উসমান দেম্বেলের চোখ ধাঁধানো এক প্রদর্শনী।
ম্যাচে নিজের চেনা রূপ দেখান দেম্বেলে। প্রথমার্ধের মাত্র ২৫ মিনিটের ঝড়ে তুলে নেন দর্শনীয় এক হ্যাটট্রিক। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় ছিল তাঁর গোলগুলোর ধরনের সাদৃশ্য। প্রায় প্রতিটি গোলেই এই ফরোয়ার্ড ভেতরের দিকে বল কেটে নরওয়ের গোলরক্ষক এগিল সেলভিকের ডান দিক দিয়ে বাঁ পায়ের জোরালো শটে বল জালে জড়ান।
এর মধ্যে ম্যাচের মাত্র ৭ মিনিটের মাথায় করা প্রথম গোলটি ছিল সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন, যা ম্যাচের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। গোলটির নেপথ্যে ছিল রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড এমবাপ্পের এক চমৎকার পাস। প্রতিপক্ষ যখন এমবাপ্পের কাছ থেকে অন্য কিছু আশা করছিল, ঠিক তখনই তিনি এই অ্যাসিস্টটি করে ফরাসি আক্রমণের বৈচিত্র্য প্রমাণ করেন। অলিসের পাস এবং দুয়ের মুভমেন্টের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। ম্যাচের শেষভাগে দুয়ে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোলটি করে প্রমাণ করেছেন যে, ম্যাচটি কেবল দেম্বেলে একার ছিল না।
দেম্বেলের তিন গোল এবং এমবাপ্পের গোল না পাওয়ার সমীকরণ দেম্বেলেকে গোলদাতার তালিকায় তাঁর সতীর্থের সমকক্ষ করে তুলেছে। সেই সঙ্গে কিছু ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানও নতুন করে লেখা হয়েছে।
১৯৭৪ সালের পোল্যান্ড দলের পর ফ্রান্সই প্রথম দল, যাদের দুই খেলোয়াড় গ্রুপ পর্বেই ৪টি করে গোল করার কীর্তি গড়লেন। এর আগে পোল্যান্ডের জেগোরজ লাতো ও আন্দ্রেজে শারমাখ এই কীর্তি গড়েছিলেন। এছাড়াও, বর্ধিত দল নিয়ে আয়োজিত এই আসরটিই ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ—যেখানে গ্রুপ পর্বেই পাঁচজন খেলোয়াড় ৪ বা তার বেশি গোল করার অনন্য রেকর্ড গড়লেন।
বিশ্বকাপের পরবর্তী পর্বে নরওয়ে তুলনামূলক সহজ গ্রুপে পড়ার সুযোগ পেলেও, ফ্রান্সের সামনে ফাইনালে ওঠার পথটি বেশ কঠিন। তাদের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের তালিকায় রয়েছে জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, মরক্কো এবং স্পেন। তবে ফলাফল যাই হোক না কেন, ফরাসিরা তা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নয়।
ফরাসি দলের প্রতিভা নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ ছিল না, তবে এই ম্যাচে তারা দেখিয়েছে যে যেকোনো দুর্বলতা—এমনকি নিজেদের রক্ষণভাগের খামতিও তারা কাটিয়ে উঠতে পারে। নরওয়ের ইয়র্গেন স্ট্র্যান্ড লারসেনের পেনাল্টি শট ফিরিয়ে দেন ফরাসি গোলরক্ষক মাইক মেনিও। এর আগে থেলো আসগার্ড নরওয়ের হয়ে একটি চমৎকার গোল করেছিলেন।
খেলার এই কম গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দিদিয়ে দেশমের দলের রক্ষণভাগের দুর্বলতা কিছুটা প্রকাশ পেয়েছিল। তবে ফরাসি কোচ দেশম তাঁর মায়ের শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার কারণে ম্যাচে অনুপস্থিত ছিলেন। দলের এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স সম্ভবত শোকের এই কঠিন সময়ে তাঁকে কিছুটা সান্ত্বনা দেবে। ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন জানিয়েছে যে, শোক প্রকাশ করতে কালো আর্মব্যান্ড পরার জন্য ফিফার কাছে আবেদন করা হলেও ফিফা তা নাকচ করে দেয়, যা বেশ বেদনাদায়ক।
তবে মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে শোককে শক্তিতে রূপান্তর করেছে দল। ফরাসি এই আক্রমণের গতি যেন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত চেইন শপ 'হোল ফুডস'-এ যাওয়ার মতো—যেখানে পণ্যের বিপুল সমাহার দেখে ক্রেতারা খেই হারিয়ে ফেলেন।
তবে ফরাসি ফুটবলের এই প্রাচুর্য কেবল পুঁজিবাদের ফসল নয়, বরং দেশটির ক্রীড়া অবকাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিনিয়োগের ফল। স্থানীয় সরকারগুলোর উদ্যোগে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে আধুনিক ফুটবল সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা হয়েছে, যা অভিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিভার মাধ্যমে আরও বিকশিত হয়েছে। ফলস্বরূপ, দক্ষিণ লন্ডন এবং সাও পাওলোর পাশাপাশি প্যারিসও এখন ফুটবলার তৈরির অন্যতম সেরা উর্বর ভূমিতে পরিণত হয়েছে।
ফ্রান্স যেভাবে যুগের পর যুগ ধরে এই বিশাল ফুটবল প্রতিভাকে লালন-পালন ও শাণিত করেছে, তা এক অনন্য উদাহরণ। সেখানে ফুটবল প্রতিভার শারীরিক গঠনের চেয়ে কৌশলগত দক্ষতাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়।
ইউরোপের অন্যতম ধনী দেশ হওয়া সত্ত্বেও ফরাসি ঘরোয়া লিগ (লিগ ওয়ান) অন্যান্য বড় দেশের তুলনায় বেশ কিছুটা পিছিয়ে। তবে এটিও কিন্তু জাতীয় দলের শক্তির অন্যতম কারণ হতে পারে।
দেম্বেলে, দুয়ে কিংবা বারকোলা—সবাই এই টুর্নামেন্টে খেলতে এসেছেন সম্পূর্ণ সতেজ হয়ে। দেম্বেলের মতো ফরোয়ার্ড যখন যেকোনো মুহূর্তেই গোল করার সামর্থ্য রাখেন, তখন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে অতিরিক্ত ম্যাচ খেলে ক্লান্ত ননি মাদুয়েকেদের নিয়ে গড়া থমাস টুখেলের ইংল্যান্ড দলের জন্য তা চিন্তার কারণ হতেই পারে।
অবশ্য ফ্রান্স এসব হিসেব-নিকেশ নিয়ে মোটেও ভাবছে না। এবারের বিশ্বকাপটি যেন তাদেরই হতে চলেছে, কারণ ফরাসি স্কোয়াডে এমন অনেক তারকা আছেন, যারা যেকোনো মুহূর্তে 'সুপারনোভা'র মতো বিস্ফোরিত হয়ে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন।
