আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচের ইতিহাস: কখনো স্বপ্নপূরণ, কখনো অঘটন
বিশ্বকাপ ফুটবলে যেকোনো দলের জন্যই প্রথম ম্যাচটি প্রচণ্ড স্নায়ুচাপের। কেউ এই ম্যাচে দুর্দান্ত জয় দিয়ে টুর্নামেন্টের সুর বেঁধে দেয়, আবার কেউ অঘটনের শিকার হয়ে খাদের কিনারে চলে যায়। তবে ফুটবল বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় দল আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচগুলো যেন এক আস্ত রোলারকোস্টার! কখনো তারা শুভসূচনা করে বিশ্বজয়ের পথে হেঁটেছে, আবার কখনো প্রথম ম্যাচেই বড় হোঁচট খেয়ে খাদের কিনার থেকে ফিরে এসে ইতিহাস গড়েছে।
আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাসের পাতা উল্টালে প্রথম ম্যাচগুলোর এমন কিছু শ্বাসরুদ্ধকর গল্প পাওয়া যায়, যা যেকোনো ফুটবলপ্রেমীকে শিহরিত করবে।
১৯৩০: বিশ্বমঞ্চে প্রথম পা এবং প্রথম জয়
আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাস শুরু হয় ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী আসরে। সে বছর ১৫ জুলাই, ফ্রান্সের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচে মাঠে নামে আলবিসেলেস্তেরা। স্নায়ুচাপের সেই ম্যাচে ৮১ মিনিটে মিডফিল্ডার লুই মন্তির করা একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে আর্জেন্টিনা। সেই শুভসূচনা তাদের নিয়ে গিয়েছিল একদম ফাইনালে, যদিও শেষ পর্যন্ত স্বাগতিক উরুগুয়ের কাছে হেরে রানার্সআপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল তাদের।
১৯৮২ ও ১৯৮৬: চ্যাম্পিয়নদের পতন এবং মারাদোনার উত্থান
১৯৭৮ সালে ঘরের মাঠে প্রথমবার বিশ্বকাপ জয়ের পর, ১৯৮২ সালে স্পেন বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা মাঠে নেমেছিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে। কিন্তু নিজেদের প্রথম ম্যাচেই বড় ধাক্কা খায় তারা। বেলজিয়ামের কাছে ১-০ গোলে হেরে বসে ডিয়েগো মারাদোনার দল।
তবে ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে চিত্রটা ছিল ভিন্ন। ২ জুন দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ৩-১ গোলের দারুণ এক জয় দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করে কার্লোস বিলার্দোর শিষ্যরা। সেই আত্মবিশ্বাস দলটিকে আর থামতে দেয়নি, মারাদোনার জাদুতে সেবার নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তোলে আর্জেন্টিনা।
১৯৯০: ক্যামেরুন-ধাক্কা এবং ফিনিক্স পাখির মতো ফেরা
আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত এবং বিস্ময়কর ম্যাচগুলোর একটি হলো ১৯৯০ ইতালি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয় আফ্রিকার দেশ ক্যামেরুনের। বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়ে ক্যামেরুন ১-০ গোলে হারিয়ে দেয় মারাদোনার শক্তিশালী আর্জেন্টিনাকে। এই হারের পর অনেকেই ভেবেছিল আর্জেন্টিনার বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে সেই আর্জেন্টিনা প্রথম ম্যাচের ধাক্কা সামলে ঠিকই পৌঁছে গিয়েছিল ফাইনালে।
আধুনিক যুগ (২০১৪ ও ২০১৮): মেসি যুগের স্নায়ুক্ষয়ী শুরু
লিওনেল মেসির যুগেও আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচগুলো রোমাঞ্চের কমতি রাখেনি।
২০১৪ (ব্রাজিল): বিশ্বকাপ অভিষিক্ত বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ২-১ গোলের ঘাম ঝরানো জয় পায় আর্জেন্টিনা, যেখানে মেসি একটি দর্শনীয় গোল করেন। সেবারও দলটি ফাইনাল খেলেছিল।
২০১৮ (রাশিয়া): প্রথম ম্যাচে নবাগত আইসল্যান্ডের শক্ত রক্ষণভাগের সামনে আটকে যায় আর্জেন্টিনা। মেসির পেনাল্টি মিস এবং ১-১ গোলের হতাশার ড্র দিয়ে শুরু হয় তাদের বিশ্বকাপ, যার প্রভাব পড়েছিল পুরো টুর্নামেন্টেই।
২০২২: সৌদি আরব অঘটনের পর ৩ যুগের অপেক্ষার অবসান
আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় প্রথম ম্যাচটি সম্ভবত গত কাতার বিশ্বকাপেই দেখেছে বিশ্ববাসী। টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকার অবিশ্বাস্য রেকর্ড নিয়ে মাঠে নেমেছিল স্কালোনির দল। প্রতিপক্ষ শক্তিতে যোজন যোজন পিছিয়ে থাকা সৌদি আরব। প্রথমার্ধে মেসির গোলে এগিয়ে গেলেও দ্বিতীয়ার্ধে জোড়া গোল হজম করে ২-১ ব্যবধানে হেরে যায় আর্জেন্টিনা।
বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় এই অঘটনের পর অনেকেই তাদের নিয়ে সমালোচনা শুরু করেছিল। কিন্তু এরপরের গল্পটা সবার জানা। প্রথম ম্যাচের সেই হারই যেন বারুদ হয়ে জ্বলে ওঠে আলবিসেলেস্তেদের বুকে। টানা সব ম্যাচ জিতে, লুসাইল স্টেডিয়ামে ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বজয়ের মুকুট মাথায় পরে লিওনেল মেসির দল।
আর্জেন্টিনার জন্য বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ কেবলই একটি ৯০ মিনিটের খেলা নয়; এটি তাদের চরিত্র, মানসিকতা এবং ঘুরে দাঁড়ানোর এক দারুণ পরীক্ষা। ইতিহাস বলে, প্রথম ম্যাচে তারা উড়ন্ত জয় পাক বা অঘটনের শিকার হোক, তারা কখনোই সহজে হাল ছাড়ে না। আর এই অনিশ্চয়তা এবং রোমাঞ্চই আর্জেন্টিনাকে ফুটবল বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় দলে পরিণত করেছে।
