আমরা কেন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে গুরুত্ব দেই না
দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো মনে করেন 'মানসিক রোগ' বলে আদতে কিছু নেই। কাজেই একে গুরুত্ব দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। কিছু ভুল ধারণা, কুসংস্কার ও বদ্ধমূল সামাজিক বিশ্বাসের কারণে এখনও অনেকেই 'মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা'কে হিসাবের মধ্যে আনেন না এবং এই সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যেতে চান না, বা যাওয়ার দরকার মনে করেন না।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সম্প্রতি সংসদে জানিয়েছেন, বাংলাদেশে প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রায় ১৬.৮ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের প্রায় ১২.৬ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। কিন্তু তাদের মধ্যে ৯২ শতাংশের বেশি ব্যক্তি কোনো ধরনের চিকিৎসা সেবাগ্রহণ করেন না। (সূত্র: জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮-১৯)
অন্যদিকে দেশে প্রতি এক লাখ জনগণের বিপরীতে মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ১.১৭ জন।
এই হিসাবটা কিন্তু সাত বছর আগের। এরমধ্যে আমাদের জীবনে টানাপোড়েন, দারিদ্র, বিভিন্ন ধরনের চাপ, অবিশ্বাস, ঘৃণা, সম্পর্কের ভাঙন, হতাশা এবং বিষন্নতাসহ আরো নানা সমস্যা বহুগুণে বেড়েছে। যদিও আমরা মনে করি মানসিক সমস্যা বলে কিছু নেই, কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে এটাই হবে ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা।
এরপরেও কেন আমরা মানসিক সমস্যাকে গুরুত্ব দিচ্ছি না? কারণ প্রথমত, এই দেশের অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন না যে মানসিক রোগ বলে কিছু আছে। দ্বিতীয়ত, অনেকেই মনে করেন মানসিক স্বাস্থ্য মানে পাগলের চিকিৎসা। কাজেই এ নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে লোকে রোগীকে পাগল ভাবতে পারে। তৃতীয়ত, শিশু আর নারীর মানসিক সমস্যা থাকতে পারে না। কাজেই তাদের ডাক্তারের কাছে কেন যেতে হবে? চতুর্থত, মনের রোগের জন্য কি আদৌ কোনো ডাক্তারের দরকার আছে? কারণ জিনে ধরলেই মানুষ পাগলামি করে। একে সারাতে হলে ডাক্তার নয়, দরকার কবিরাজ ও ওঝা-ঝাঁড়ফুক। এতগুলো কুসংস্কার নিয়ে আমাদের সমাজ চলছে। এই সমাজে মনের অসুখ বাড়বে বই, কমবে না।
মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা করা হয় বলে দেশে বাড়ছে অপরাধ, সহিংসতা, হত্যা ও আত্মহত্যার ঘটনা। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর আনুমানিক এক হাজার থেকে চৌদ্দশত মানুষ আত্মহত্যাজনিত কারণে মারা যান, যাদের উল্লেখযোগ্য অংশ তরুণ ও কিশোর-কিশোরী। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশে মানসিক রোগীর সংখ্যা, বিশেষ করে বিষন্নতার হার বাড়ছে। তরুণ-তরুণীদের বেশি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সালমা (ছদ্মনাম) এর প্রসঙ্গটি এখানে খুবই যুক্তিযুক্ত। মেয়েটির বয়স যখন ১৫/১৬ বছর, তখনই তার মধ্যে সিজোফ্রেনিয়ার কিছু লক্ষণ দেখা যায়। যেমন হেলুসিনেশন, অনেক রাগ, জেদ, অভিমান এবং আত্মহত্যার প্রবণতা। পরিবার ও সমাজ সালমার এই আচরণকে অসদাচরণ বলে মনে করতো। সালমা ক্রমশ সামাজিকতা থেকে বিছিন্ন হয়ে, একসময় সম্পূর্ণ সিজোফ্রেনিক হয়ে পড়ে।
একুশ বছর বয়সে সালমা যেদিন ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে, সেদিন ওর পরিবার বুঝতে পারে তারা কতটা ভুল করেছে। এই ভুলের মাশুল সালমার মা-বাবাকে সারাজীবন দিয়ে যেতে হবে। মনের ডাক্তাররা বলেন, আমাদের দেশে মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করার পর বা এই সিন্ড্রম প্রকট হলে, তবেই ডাক্তারের কাছে যায়। অথচ প্রথম থেকে নজর দিলে সহায়তা দেয়া সহজ হয়। আশঙ্কাজনক ব্যাপার হচ্ছে বিষন্নতা, উদ্বেগ, হতাশার পাশাপাশি আত্মহত্যার ঘটনা খুব স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে।
অধিকাংশ মানুষ 'মানসিক রোগ' বিষয়টিকে বিশ্বাস করে না বলেই এর প্রতি নজর দেয় না। 'উন্মাদ' না হওয়া পর্যন্ত মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি মোটামুটি উপেক্ষিতই থাকে। এর কারণ হিসেবে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার গণমাধ্যমকে বলেছেন, "যেকোনো শারীরিক রোগকে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখলেও মানসিক সমস্যাকে বাংলাদেশে এখনও ঠাট্টা, বিদ্রুপ বা হালকা বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়। মানসিক সমস্যা সিরিয়াস না হওয়া পর্যন্ত, বেশিরভাগ মানুষই চিকিৎসকের কাছে আসতে চান না বা রোগীকে নিয়ে আসা হয়না। কেউ কুসংস্কারের কারণে আসতে চান না, আবার অনেকে বুঝতেই পারেন না যে তিনি মানসিক সমস্যায় ভুগছেন।"
মানসিক রোগের নানা ধরনের শারীরিক প্রভাব আছে। সেইসব শারীরিক লক্ষণ দেখা দিলে, তবেই মানুষ ডাক্তারের কাছে যান। কিন্তু শারীরিক এই সমস্যার মূল কারণ যে মানসিক স্বাস্থ্য-এটা রোগী বুঝতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকরাও এটা বুঝতে পারেন না। কারণ এদেশের চিকিৎসাবিদ্যার স্নাতক পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি উপেক্ষিত আছে।
দেশে মানসিক রোগে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বিষণ্নতায় ভোগেন ৬.৭ শতাংশ, উদ্বেগজনিত রোগে আক্রান্ত ৪.৭ শতাংশ। শিশু-কিশোরদের মানসিক সমস্যার মধ্যে শীর্ষে আছে নিউরো-ডেভেলপমেন্ট ডিজঅর্ডার। এ রোগে আক্রান্তের হার ৫.১ শতাংশ। এটি এক ধরনের মানসিক ও স্নায়ুবিক সমস্যা, যা সাধারণত শিশু বয়সেই শুরু হয় এবং মস্তিষ্কের বিকাশ ও কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করে। এরপর রয়েছে উদ্বেগজনিত রোগ। (সূত্র: 'মানসিক স্বাস্থ্য: বাংলাদেশের তথ্যচিত্র-২০২৫'- জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল)
১৯৪৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া সংজ্ঞায় বলা হয়েছিল, 'কেবল নিরোগ থাকাটাই স্বাস্থ্য নয়; বরং শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকার নামই স্বাস্থ্য।'
অথচ দীর্ঘদিন ধরে 'স্বাস্থ্য' শব্দটি সীমাবদ্ধ হয়ে আছে 'শারীরিক' অংশটুকুর মধ্যে। তাইতো স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কুসংস্কার ও অসচেতনতার জন্যই দেশের মানসিক রোগীর ৯২ শতাংশের বেশি চিকিৎসা সেবাগ্রহণ করেন না। তাছাড়া জেলা উপজেলা পর্যায়ে কোনো মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নেই। যারা আছেন, তাদের বেশিরভাগই শহরকেন্দ্রিক। স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও নেই মানসিক স্বাস্থ্য সাপোর্ট। এ কারণে চাইলেও মানুষ চিকিৎসা নিতে পারছেন না।
মনোচিকিৎসকরা বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য অর্থ মানসিক রোগ বা পাগল হওয়া নয়। এটা কুসংস্কার ও ভুল ধারণা। মনে কোনো রোগ না হলেও মনের যত্নের প্রয়োজন আছে। যার কোনো মানসিক সমস্যা নেই, তারও উচিত মনটিকে সুস্থ রাখা।
কেউ যদি শিশুকালে, কৈশোরে বা তারুণ্যে সামান্যতম মানসিক সমস্যার ভেতর দিয়ে যান, তাহলে অবশ্যই সেই সময় থেকেই সচেতন হওয়া দরকার। সাহস ও ধৈর্য নিয়ে ব্যক্তিকে মানসিক রোগের মুখোমুখি হতে হয়, তাই তখন সমালোচনা না করে, সবার উচিত অসুস্থ মানুষটির পাশে থাকা।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার জন্য পরিবারে ও সমাজে স্পেস তৈরি করতে হবে। নয়তো এই সমস্যা দিনে দিনে আরো প্রকট হয়ে উঠবে। তাই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতা, তীব্র উদ্বেগ, আত্মহত্যার চিন্তা বা অন্যান্য গুরুতর মানসিক সমস্যায় সাইকিয়াট্রিস্ট, সাইকোলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কারদের পরামর্শ প্রয়োজন।
মানসিক অসুস্থতার সমাধান মানেই শুধু কাউন্সিলিং, সাইকোথেরাপি বা ওষুধ নয়। সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজন সামাজিক সংযোগ, অর্থপূর্ণ কাজ এবং মানুষ ও পরিবেশের সাথে সম্পর্ক। এই ধারণা থেকেই এসেছে 'সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং'।
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, "প্রায় সব ধরনের মানসিক সমস্যায় সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং কাজ করে বলে একাধিক গবেষণায় প্রমাণিত। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদী মানসিক রোগ যেমন সিজোফ্রেনিয়ায় রোগীকে সমাজের মেইনস্ট্রিমে নিয়ে আসতে এটি অনেক বেশি কার্যকরী। এছাড়া বিষণ্ণতা, সোশ্যাল এংজাইটি ডিসঅর্ডার, ওসিডি, ডিমেনশিয়া ইত্যাদি সমস্যাতেও সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং কার্যকরী হিসেবে প্রমাণিত।
এর পাশাপাশি নিজেকেও সচেতন হতে হবে। ব্যস্ততা, বিষণ্ণতা, সন্দেহ, উদ্বেগ-উৎকন্ঠা ও অপ্রাপ্তি আমাদের প্রতিদিন তাড়িত করছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপেও অনেকের জীবন কোণঠাসা। কিন্তু মানুষ কি এভাবে কোণঠাসা হয়ে থাকার জন্য তৈরি হয়েছে?
শত ব্যস্ততা ও অপ্রাপ্তির মধ্যেও আমাদের ভেতরে এখনো আনন্দময় পৃথিবীটা বেঁচে আছে। তাই প্রকৃতি, প্রাণী ও মানুষের ভেতরেও সম্পর্ক, দায়বদ্ধতা এবং অপরকে নিজের করে নেওয়াটা বাড়াতে হবে। এই সহানুভূতিটা ও সমানুভূতিটাও একটু একটু করে মানুষকে মানসিক অশান্তি থেকে মুক্ত করতে পারে।
মানুষ যখন নিজের ভেতরে আশ্রয় খুঁজে পায় না, তখন অনেক সময় সে ফিরে যায় প্রকৃতির কাছে। এই বোধই মানুষকে ভাবায় 'আমি এখনও পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত আছি।' মানুষের সুস্থ থাকার অনেক যাত্রাই শুরু হয় ঠিক এই অনুভূতি থেকে।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
- বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
