অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ: মাহ্দী আমিন
অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন এবং সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ বিনির্মাণে জনগণের প্রতি সরকার পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন।
তিনি বলেন, 'অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, মানবাধিকার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে।'
শনিবার (১৮ জুলাই) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান। সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের 'পাঁচ মাস পূর্তি' উপলক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র আবু আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সালেহ শিবলী এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার এসএএম মাহফুজুর রহমান, উপ-প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা, শাহাদত স্বাধীন, সহকারী প্রেস সচিব শাহরিয়ার পামির প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রথম ১৫০ দিনের কার্যক্রম, বিভিন্ন উদ্যোগ এবং অর্জনের চিত্র তুলে ধরেন মাহ্দী আমিন। তিনি জানান, সরকার পাঁচ মাসে অর্জিত সাফল্যকে পাঁচটি প্রধান ক্ষেত্রে ভাগ করেছে। এগুলো হলো— জনগণের আস্থা, ভালোবাসা ও সমর্থন অর্জন; নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বার্থ রক্ষা; স্বল্প সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সফলতা; জনগণের স্বাধীনতা ও দেশের সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার; এবং প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্ব।
মাহ্দী আমিন বলেন, 'শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দ্রুত বিচার, আলোচিত কয়েকটি মামলার তদন্ত ও গ্রেপ্তার কার্যক্রমে অগ্রগতি, সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যৌথ বাহিনীর অভিযান সরকারের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।'
তিনি আরও বলেন, 'পরিবেশ সুরক্ষায় পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, ঢাকাকে দূষণমুক্ত করতে প্রাথমিকভাবে ২৫০টি সর্বাধুনিক পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক বাস চালুর উদ্যোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, চট্টগ্রাম বন্দরে স্বয়ংক্রিয় কার্গো রিলিজ ব্যবস্থা চালু, মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক অগ্রগতি সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রতিফলন।' পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় অপচয় কমাতে মন্ত্রীদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট সুবিধা গ্রহণ না করার সিদ্ধান্তও তিনি উল্লেখ করেন।
নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের বিষয়ে মুখপাত্র বলেন, 'সরকার কৃষক, নারী, ক্রীড়াবিদ ও প্রবাসীদের জন্য পৃথক কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যা ভবিষ্যতে একটি সমন্বিত 'ইউনিভার্সাল কার্ড'-এ রূপ দেওয়া হবে। তিনি জানান, ১২ লাখ ক্ষুদ্র কৃষকের কৃষিঋণ মওকুফ, নিম্ন আয়ের ৫৫ লাখ পরিবারের জন্য ১৫ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণ, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, ফ্রিল্যান্সারদের রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র, পথশিশু পুনর্বাসন প্রকল্প এবং শিক্ষকদের সম্মানী বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'অনার্স পর্যন্ত ছাত্রীদের বিনামূল্যে শিক্ষার ঘোষণা, স্মার্ট ক্লাসরুম, ফ্রি ওয়াই-ফাই, মিড-ডে মিল, নতুন পাঠ্যক্রম, স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষাঋণ, স্টার্টআপ তহবিল, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য মেট্রোরেল ভাড়ায় ছাড় এবং জেলা পর্যায়ে কর্মসংস্থান এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।' একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত, উপজেলা হাসপাতাল উন্নয়ন, ইউনিয়নভিত্তিক স্বাস্থ্য ইউনিট, ২ হাজার মিনি কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণ এবং সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সরকারের স্বল্প সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রসঙ্গে মাহ্দী আমিন বলেন, 'বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও সরকার জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রেখেছে এবং নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজার তদারকি জোরদার করেছে।' রমজান ও দুই ঈদে বাজার স্থিতিশীল রাখা, ভারতীয় গরুর অবৈধ প্রবেশ বন্ধ, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ নিশ্চিত, নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন, ব্যাংক খাতের জন্য পুনঃমূলধনী তহবিল গঠন, জুয়া প্রতিরোধ আইন পাস, পাচার হওয়া সম্পদ জব্দ ও ফেরত আনার উদ্যোগ এবং রপ্তানি বৃদ্ধিকে তিনি সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন। পাশাপাশি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প এবং বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের বিষয়ে মুখপাত্র বলেন, 'বর্তমান সরকার 'সবার আগে বাংলাদেশ' নীতির ভিত্তিতে সমতা ও জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে কূটনীতি পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা ও আইনের শাসন নিশ্চিতের পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।'
এ সময় মালয়েশিয়া ও চীন সফরে বিভিন্ন সমঝোতা স্মারক সই, বিনিয়োগ প্রস্তাব, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, ভারতের ভিসা সেবা পুনরায় চালু, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়। এছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারে আধুনিক রাডার ও সীমান্ত নজরদারি সরঞ্জাম স্থাপন, জাপানের নারিতা রুটে বিমানের সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালু, ব্যবসা নিবন্ধনের সময়সীমা ১৪ দিনে নামিয়ে আনা এবং ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির অংশ হিসেবে পাসপোর্টে 'এক্সেপ্ট ইসরায়েল' পুনর্বহালের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে প্রথমবারের মতো 'ককাস অব আমেরিকা ইন দ্য ন্যাশনাল পার্লামেন্ট অব বাংলাদেশ' গঠিত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন মাহ্দী আমিন।
প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের বিষয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, 'রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি জনকল্যাণ, অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র এবং সেবামুখী নেতৃত্বের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ, দেশপ্রেম, দূরদর্শী পরিকল্পনা, সামাজিক কল্যাণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতার যে বার্তা তিনি তুলে ধরছেন, তা অনেক মানুষের মাঝে ইতিবাচক প্রত্যাশা ও আস্থার সঞ্চার করেছে। একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উন্নয়নমুখী বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তাঁর উদ্যোগগুলো আমাদের চিন্তার নতুন নতুন দ্বার উন্মোচন করছে।' বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে সরাসরি নির্দেশনা, কৃষকদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে সম্পৃক্ততা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়, ভিআইপি সংস্কৃতি কমানো, সরকারি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, শিশুদের জন্য সংসদ অধিবেশন দেখার সুযোগ, শিক্ষার্থীদের ক্রীড়া ও উদ্ভাবনী কর্মসূচি এবং প্রাণীকল্যাণে উদ্যোগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
মাহ্দী আমিন বলেন, 'ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যাত্রা শুরু করে মাত্র ৫ মাসে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করা কেবল তখনই সম্ভব, যখন সরকারের পেছনে জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন ও আস্থা থাকে। তারেক রহমান সবসময় বিশ্বাস করেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। বিগত ১৫০ দিনে সরকার কেবল সমস্যার সমাধানই করেনি, বরং একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশের মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। ভবিষ্যতের দিনগুলোতেও এই অবারিত উদ্যম, দেশপ্রেম এবং দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করতে চাই।'
