চীনে পাড়ি জমাচ্ছেন নোবেলজয়ী মার্কিন বিজ্ঞানী ওমর ইয়াঘি; নেতৃত্ব দেবেন এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের
রসায়নে গত বছরের নোবেলজয়ী অভিবাসী বিজ্ঞানী ওমর ইয়াঘি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে ছেড়ে চীনে চলে যাচ্ছেন। সেখানে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে নতুন নতুন পদার্থ আবিষ্কারের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেবেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান গবেষণায় তহবিল সংকট চলছে। অন্যদিকে চীন বড় অংকের বাজেট দিয়ে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের টানার চেষ্টা করছে। ড. ইয়াঘির এই সিদ্ধান্তকে সেই পরিস্থিতিরই প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত সপ্তাহে বেইজিংয়ের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে বরণ করে নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি তাকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান রসায়নবিদ হিসেবে অভিহিত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, ইয়াঘি তার নতুন পদটিকে একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেছেন, 'এটি যা করা হয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি করা নয়। বরং আগের চেয়েও বেশি শক্তি, একাগ্রতা এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে বিজ্ঞানচর্চা করার সুযোগ।'
ওয়াশিংটনভিত্তিক 'আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্স'-এর বাজেট বিশ্লেষক আলেসান্দ্রা জিমারম্যান বলেন, 'চীন রসায়নসহ সামগ্রিকভাবে বিজ্ঞানের গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।' তিনি আরও জানান, চীন এখন রসায়নের শীর্ষ গবেষণাপত্রের দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান্টা বারবারার অধ্যাপক রাম শেষাদ্রি বলেন, ড. ইয়াঘির চীনে চলে যাওয়ার ঘটনাটি দুই দেশের মধ্যকার দ্রুত পরিবর্তনশীল সম্পর্কের দিকে আলোকপাত করে। চীনের বিষয়ে তিনি বলেন, 'মেটেরিয়াল সায়েন্স এবং রসায়নের অনেক ক্ষেত্রে তারা আমাদের ছাড়িয়ে গেছে। মেধাবীদের টানতে তারা বিশাল অংকের অর্থ বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত।'
মেটেরিয়াল সায়েন্স আধুনিক জীবনের অনেক উদ্ভাবনের মূলে রয়েছে। স্মার্টফোনের সিলিকন চিপ থেকে শুরু করে রেসিং সাইকেলের কার্বন ফাইবার কিংবা চিকিৎসায় ব্যবহৃত ইমপ্ল্যান্ট—সবই এর অবদান।
উদ্বাস্তু শিবির থেকে নোবেল বিজয়
ড. ইয়াঘি জর্ডানের আম্মানে এক ফিলিস্তিনি শরণার্থী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় তাদের এক কক্ষের বাড়িতে বিদ্যুৎ বা পানির সংযোগ ছিল না। খুব অল্প বয়সেই তিনি পরমাণুর গঠনের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তার বাবা ছিলেন একজন কসাই। ইয়াঘির বয়স যখন ১৫ বছর, তখন তার বাবা তাকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দেন।
গত বছর নোবেল নিতে স্টকহোম যাওয়ার আগে এক সাক্ষাৎকারে ড. ইয়াঘি ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি মন্তব্য করেন যে এই নীতিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়, কোম্পানি এবং সরকারের সমন্বয়ে গঠিত বিজ্ঞানচর্চার উৎকর্ষ-নির্ভর ব্যবস্থাকে বিপন্ন করে তুলছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিষয়ে তিনি বলেন, 'আমি মনে করি এটি দুঃখজনক।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'আমাদের বোঝা উচিত যে ভিন্ন ভিন্ন পটভূমি থেকে আসা মানুষেরা সবার মেধার মান বাড়িয়ে দেয়। এটি একটি চমৎকার বিষয়। বড় মাপের চিন্তাবিদেরা কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, পুরো বিশ্বের উন্নতি সাধন করতে পারেন।'
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞানে নোবেল পাওয়া ছয়জনের মধ্যে তিনজনই ছিলেন অভিবাসী। এই শতাব্দীতে এখন পর্যন্ত পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও চিকিৎসাশাস্ত্রে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে নোবেল পাওয়া বিজ্ঞানীদের ৪০ শতাংশই বিদেশি বংশোদ্ভূত।
নতুন দিগন্তের পথে
২০১২ সালে বার্কলেতে যোগ দিয়েছিলেন ড. ইয়াঘি। রসায়নের একটি সম্পূর্ণ নতুন জগত আবিষ্কারে সাহায্য করার জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। এখানে মূলত বিভিন্ন আণবিক উপাদানকে এমন এক ধরনের কাঠামোতে রূপ দেওয়া হয়, যার অভ্যন্তরীণ পৃষ্ঠদেশ অত্যন্ত বিশাল—যা এ পর্যন্ত জ্ঞাত যেকোনো পদার্থের চেয়ে বড়। তার আবিষ্কৃত এই ছিদ্রযুক্ত কাঠামোগুলো স্পঞ্জের মতো কাজ করতে পারে, যা খুব সহজেই বিভিন্ন গ্যাস ও বাষ্প শুষে নিতে, জমা রাখতে এবং নির্গত করতে পারে।
তিনি এগুলোর নাম দিয়েছেন মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্কস। এর ধাতব পরমাণুগুলো এমন একটি পরিবর্তনযোগ্য কাঠামো তৈরি করে, যা জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট রাসায়নিক—বিশেষ করে কার্বন পরমাণুকে ধরে রাখতে সক্ষম। সম্পূর্ণ তাত্ত্বিক হলেও, এই কাঠামোগুলো প্রকৃতিগতভাবে এতটাই মৌলিক, উদ্ভাবনী এবং নমনীয় যে পদার্থ বিশেষজ্ঞরা এবং বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো এর অনেক ধরনের বাণিজ্যিক ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখছেন।
উদাহরণস্বরূপ, এই কাঠামোগুলো মরুভূমির বাতাস থেকেও পানি সংগ্রহ করতে পারে। ২০১৮ সালে ড. ইয়াঘির শিক্ষার্থীরা ক্যালিফোর্নিয়ার মোজাভে মরুভূমিতে এই ধারণার সফল পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। তারা দেখেন যে একটি ছোট যন্ত্র প্রতিদিন প্রায় তিন কাপ পানের উপযোগী পানি তৈরি করতে পারে। এই ডিভাইসটি এখন বাণিজ্যিক উৎপাদনের একেবারে কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছে।
সাক্ষাৎকারে ড. ইয়াঘি জানান, ছোটবেলায় পরিবারের জন্য পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে যে কষ্ট তিনি করেছিলেন, তা থেকেই এই আবিষ্কারের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। তখন সপ্তাহে একবার বা দুইবার মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য পানি আসত। তিনি বলেন, অভিবাসীদের এই বিচিত্র অভিজ্ঞতা থেকেই অনেক সময় বড় ধরনের বৈজ্ঞানিক সাফল্য আসে।
২০২২ সাল থেকেই সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ড. ইয়াঘির যোগাযোগ রয়েছে। তখন তাকে সম্মানসূচক অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এখন তিনি সেখানে পূর্ণকালীন দায়িত্ব নিচ্ছেন। তিনি একটি নতুন এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হবেন যারা নতুন নতুন পদার্থের নকশা নিয়ে কাজ করবে।
বিশ্ববিদ্যালয়টি জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য হলো প্রচলিত পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে গবেষণার সময় কমিয়ে আনা এবং বিজ্ঞানের জয়যাত্রাকে আরও দ্রুততর করা।
