আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত কমায় নেই অগ্রগতি
ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের মধ্যে সপ্তাহব্যাপী চলমান সংঘাতে কয়েক বছরের মধ্যে অঞ্চলটির বৈরিতা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ ও আন্তর্জাতিক বহু কূটনৈতিক তৎপরতার পরেও মঙ্গলবার পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা নিয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।
সোমবার রাতে ইসরায়েলি সেনারা জানান, হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি সংগঠন গাজা থেকে এখন পর্যন্ত তিন হাজার ৩৫০টি রকেট নিক্ষেপ করেছে। এর মধ্যে, কেবল সোমবারই ২০০টি ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।
ইসরায়েলের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, এখন পর্যন্ত ইসরায়েলের বিমান ও আর্টিলারি হামলায় ১৩০ জন ফিলিস্তিনি যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।
গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্যানুসারে, গত সপ্তাহে শুরু হওয়া সংঘাতে এ পর্যন্ত ৬১ শিশুসহ ২১২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, দুই শিশুসহ ইসরায়েলে নিহত হয়েছেন আরও ১০ জন।
শান্তি প্রতিষ্ঠায় সকল কূটনৈতিক তৎপরতা বিফলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা আর্মি জেনারেল মার্ক মাইলি।
ন্যাটো সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনায় সোমবার ব্রাসেলসে অবতরণের পর জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান মাইলি সাংবাদিকদের বলেন, 'ব্যক্তিগত মূল্যায়ন থেকে আমি মনে করি, এই লড়াই চলতে থাকলে অস্থিতীশীলতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পাশাপাশি নেতিবাচক পরিণতি ডেকে আনার ঝুঁকি থাকছে। যুদ্ধ চলতে থাকলে তা কারও জন্যই লাভজনক হবে না।'
এদিকে, সোমবার সারারাত ধরে ফিলিস্তিন নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ভোর হবার কিছু সময়ের মধ্যেই গাজায় দুটি ভবনে আঘাত হানে মিসাইল। সেখানে মুহূর্তেই ধোঁয়ার কারণে বাতাস ভারি হয়ে ওঠে।
গাজা উপত্যকা হতে যোদ্ধারা মঙ্গলবার সকাল থেকেই রকেট নিক্ষেপ শুরু করে। ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলের শহরগুলোতে সাইরেন বেজে ওঠায় স্থানীয় হাজার হাজার অধিবাসী বোমা থেকে বাঁচার জন্য ছুটে যান নিরাপদ আশ্রয়ে।
তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পক্ষ থেকেই হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
গত কয়েকদিনের তুলনায় গতকাল রাতে গাজা থেকে রকেট নিক্ষেপের পরিমাণ কমে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর রকেট সাইরেন সম্পর্কিত তথ্যানুসারে, ভোররাতে রকেট হামলা শুরু করার আগে, রাতে ছয় ঘণ্টা পরিস্থিতি ছিল নীরব।
এছাড়া, ইসরায়েল পরিবেষ্টিত ২০ লাখ ফিলিস্তিনির আবাসস্থল গাজা থেকে রাতভর রকেট হামলা বন্ধ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রয়টার্স প্রতিবেদক।
কূটনৈতিক তৎপরতা
হোয়াইট হাউসের বিবৃতি অনুযায়ী, সোমবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনকলে যুদ্ধবিরতি সমর্থনের কথা জানান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।
তবে নেতানিয়াহু এর আগেই ইসরায়েলিদের উদ্দেশে দেওয়া এক বক্তব্যে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চল এবং তাদের নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন।
সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকের পর টেলিভিশন বক্তৃতায় নেতানিয়াহু বলেন, 'নির্দেশনা অনুযায়ী সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত থাকবে। ইসরায়েলের সকল অধিবাসীদের নিরাপত্তা এবং শান্তি ফিরিয়ে আনতে আমরা যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ বজায় রাখব।'
হামাসের সশস্ত্র গোষ্ঠী পালটা জবাবে রকেট হামলা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে। সংগঠনটির মুখপাত্র আবু উবাইদা বলেন, 'কয়েক ঘণ্টা ধরে সন্ত্রাসী জায়োনিস্ট শত্রুরা আমাদের ঘর ও আবাসিক ভবনগুলোতে বোমা হামলা বাড়িয়ে দিয়েছে। আর তাই আমরা শত্রুদের সতর্ক করছি। তারা যদি অবিলম্বে হামলা বন্ধ না করে, তবে আমরাও তেল আবিব লক্ষ্য করে রকেট নিক্ষেপ অব্যাহত রাখব।'
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন উভয় পক্ষকেই বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা প্রদানের তাগিদ দিয়েছেন।
ইসরায়েলের নিজেকে রক্ষা করার অধিকারের ওপর জোর দিলেও ব্লিনকেন বলেন, গণমাধ্যম ভবনে হামাসের কার্যক্রম পরিচালনার দাবির সপক্ষে ইসরায়েল কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। গত সপ্তাহে ইসরায়েলের ছোড়া মিসাইলের আঘাতে গুঁড়িয়ে যাওয়া ভবনে ছিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অ্যাসোসিয়েট প্রেসসহ (এপি) একাধিক গণমাধ্যমের কার্যালয়।
হামাসও ওই ভবনে কার্যালয় থাকার কথা অস্বীকার করে। হামাসের মুখপাত্র ফাউজি বারহউম বলেন, 'বেসামরিক ভবন কেন্দ্র করে হামলাকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণিত করতেই এসব মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে।'
মিশর ও জাতিসংঘের মধ্যস্থতাকারীরাও কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে এগিয়ে এসেছে। বৃহস্পতিবার চলমান সহিংসতা নিয়ে আলোচনায় বসবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ।
এদিকে, ইসরায়েলের কাছে ৭৩৫ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে বাইডেন প্রশাসন। এসব অস্ত্র নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। কংগ্রেসের একটি সূত্র জানিয়েছে, আইনপ্রণেতাদের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তির বিষয়ে কোনো প্রতিবন্ধকতা আশা করে না।
সাম্প্রদায়িক সহিংসতা
পূর্ব জেরুজালেম থেকে বেশ কয়েকটি ফিলিস্তিনি পরিবারকে উৎখাতের বিষয়ে আদালতে চলমান একটি মামলা নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর গত ১০ মে হামাস রকেট হামলা চালানো শুরু করে। প্রতিহিংসাবশত পবিত্র রমজান মাসে মুসলিমদের তৃতীয় পবিত্র ধর্মীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত আল আকসা মসজিদে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে এ সময় সংঘর্ষে জড়ায় ইসরায়েলি পুলিশ।
পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিরা নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করে। ইসরায়েল ও হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজার মধ্যবর্তী বৈরিতাকে বাড়িয়ে তুলেছে পশ্চিম তীরে বাড়তে থাকা সহিংসতা।
বিভিন্ন অঞ্চলে ইসরায়েলের ইহুদি ও আরব গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের সংবাদ পাওয়া গেছে।
ইহুদি ও আরব ইসরায়েলিদের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা 'গৃহযুদ্ধে' রূপান্তর হতে পারে বলে সতর্ক করেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট।
মঙ্গলবার পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি এলাকা ও ইসরায়েলের আরব এলাকাগুলোতে গণ আন্দোলনে নামার পরিকল্পনা করেছেন ফিলিস্তিনিরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে 'ফ্রম দ্য রিভার টু দ্য সি' বা 'নদী থেকে সাগরের লক্ষ্যে' পোস্ট প্রকাশ করে আন্দোলনে সংহতি জানানোর আহ্বান জানানো হয়।
- সূত্র: রয়টার্স
