৪০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর বুকে হেঁটে বেড়াত বিশ্বের বৃহত্তম কাঁকড়াবিছা; আকারে ছিল কুকুরের সমান!
কল্পনা করুন, বেসবল ব্যাট বা একটা কুকুরের সমান বিশাল এক কাঁকড়াবিছা। শ্যাওলা ধরা পাথর আর বড়সড় গাছের মতো কাঠামোর ওপর দিয়ে তরতর করে হেঁটে যাচ্ছে। তারপর নীরবে গা ঢাকা দিচ্ছে কাছের কোনো পাহাড়ি স্রোতস্বিনীতে।
বিজ্ঞানীরা ঠিক এভাবেই বর্ণনা করেছেন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কাঁকড়াবিছাটিকে। প্রায় ৪১ কোটি ৫০ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে রাজত্ব করা এই দৈত্যাকার কাঁকড়াবিছার সন্ধান পেয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ধারণা, এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত সব কাঁকড়াবিছার মধ্যে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে বড়।
এই চমকপ্রদ উপসংহারে পৌঁছাতে বিশেষজ্ঞদের ঘাঁটতে হয়েছে লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম-এ রাখা এক শতাব্দীরও পুরোনো কিছু জীবাশ্ম। পুরোনো সেই নমুনাগুলোর সঙ্গে সম্প্রতি আবিষ্কৃত কিছু জীবাশ্ম জোড়া লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা এই প্রাণীর একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দাঁড় করান।
২ জুন 'প্যালিওন্টোলজি' জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানান, প্রিয়ার্কটুরাস গিগাস নামের এই কাঁকড়াবিছা লম্বায় ছিল প্রায় ১ মিটার—অর্থাৎ ৩ ফুটেরও কিছু বেশি। অর্থাৎ প্রায় একটি কুকুরের সমান।
এ গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের ড. রিচার্ড হাওয়ার্ড। তিনি জানান, প্রাপ্ত জীবাশ্মের টুকরোগুলো পরীক্ষা করে দেখা গেছে, প্রিআর্কটারাস গিগাসের সাঁড়াশিগুলোই ছিল প্রায় ১৬ সেন্টিমিটার লম্বা!
ওয়েলসের পাওয়িস থেকে শুরু করে ইংল্যান্ডের হিয়ারফোর্ডশায়ার ও ওরচেস্টারশায়ার পর্যন্ত বিস্তৃত সেন্ট মন্স স্যান্ডস্টোন ফরমেশন-এ মিলেছে এই দৈত্যাকার কাঁকড়াবিছার জীবাশ্ম।
এই প্রাণী বাস করত আর্লি ডেভোনিয়ান যুগে—আজ থেকে প্রায় ৪১ কোটি ৫০ লক্ষ বছর আগে।
হাওয়ার্ড বলেন, এই রহস্যের জট খুলতে অনেক সময় লেগেছে। জীবাশ্মগুলো নিয়ে টানা গবেষণা চলছে ২০০৮ সাল থেকে।
জীবাশ্মগুলো প্রথম আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৮৭০-এর দশকে, হিয়ারফোর্ডশায়ারে। এরপর ১৯৭০-এর দশকে বার্মিংহামে ও ২০১০-এর দশকে পাওয়িসের ট্রেডোমেন খনিতে মেলে আরও কিছু জীবাশ্ম।
তবে দীর্ঘ ১৫০ বছর ধরে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হতে পারছিলেন না, এই জীবাশ্মগুলো আসলে কোন প্রাণীর।
হাওয়ার্ড জানান, ১৯৮০-র দশকে কয়েকজন গবেষক এগুলোকে কাঁকড়াবিছার জীবাশ্ম বলে দাবি করলেও অনেকেই তা মানতে চাননি। খণ্ডিত জীবাশ্ম দেখে অনেকের ধারণা ছিল, এটি হয়তো কোনো অতিকায় ক্রাস্টেশিয়ান বা খোলসযুক্ত জলজ প্রাণীর দেহাবশেষ। 'তারা সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা দিলেও হাতে কোনো উন্নত ছবি ছিল না। ছিল কেবল কিছু হাতে আঁকা স্কেচ। ফলে সবাই তাঁদের তত্ত্বে বিশ্বাসও করেননি।'
কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নতমানের সংরক্ষিত জীবাশ্ম, সিটি স্ক্যান ও থ্রিডি মডেলিংয়ের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা এখন নিশ্চিত, জীবাশ্মগুলো 'দৈত্যাকার কাঁকড়াবিছারই'।
হাওয়ার্ডের মতে, এই রহস্যভেদের অন্যতম সূত্র হলো এর বুকের হাড় বা স্টার্নাম। কানাডায় আবিষ্কৃত এবং ২০১৫ সালে নথিভুক্ত হওয়া আরেকটি প্রাচীন কাঁকড়াবিছার জীবাশ্মের স্টার্নামের সঙ্গে এর হুবহু মিল পাওয়া গেছে। দুটো প্রজাতির বুকেই রয়েছে 'অস্বাভাবিক' লম্বাটে, ত্রিভুজাকার স্টার্নাম, যার মাঝ বরাবর একটি খাঁজ কাটা।
তিনি বলেন, 'এটাই প্রমাণ করে যে আমাদের জীবাশ্ম একটি কাঁকড়াবিছার। কারণ কানাডার ওই প্রাণীটি যে কাঁকড়াবিছা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাহলে এই একই অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য অন্য কোনো প্রাণীর থাকবে কেন? কানাডার ওই জীবাশ্মে পুরো প্রাণীটাই সংরক্ষিত ছিল। এটি শরীরের এতটাই সূক্ষ্ম একটি বৈশিষ্ট্য যে সাধারণ দৃষ্টিতে হয়তো চোখেই পড়বে না। কিন্তু যখনই আপনি দুটোকে মেলাবেন, চমকে উঠবেন—দুটো তো একদম এক!'
পানিতে এর চেয়েও বড় কাঁকড়াবিছা থাকার যে জল্পনা রয়েছে, সে প্রসঙ্গেও কথা বলেন হাওয়ার্ড। তিনি বলেন, সি স্করপিয়ন বা সামুদ্রিক কাঁকড়াবিছা (যাদের ইউরিপ্টেরিড বলা হয়) আসলে বিলুপ্ত আর্থ্রোপোডদের সম্পূর্ণ আলাদা একটি গোষ্ঠী।
তবে তার দলের হাতে কোনো সম্পূর্ণ প্রাণীর জীবাশ্ম নেই। তিনটি ভিন্ন জায়গা থেকে পাওয়া কিছু টুকরো দিয়েই চলছে গবেষণা।
হাওয়ার্ডের বলে, 'আমরা কেবল কিছু খণ্ড নিয়ে কাজ করছি, তাই নিশ্চিত করে বলা মুশকিল প্রাণীটা ঠিক কতটা বড় ছিল। সাঁড়াশির ডগা থেকে লেজের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত মেপে নিখুঁত মাপ দেওয়া আমাদের পক্ষে এখন অসম্ভব।'
তবে অন্যান্য কাঁকড়াবিছার জীবাশ্মের সঙ্গে প্রাপ্ত অংশগুলোর তুলনা করে একটা স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
এই কাঁকড়াবিছা একটি মাত্র সাঁড়াশির দৈঘ্যই প্রায় ১৬ সেন্টিমিটার। আধুনিক যুগের বড় কাঁকড়াবিছা, যেমন এম্পেরর স্করপিয়নের পুরো শরীরটাই হয় ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার।
'তাই আমরা নিঃসঙ্কোচে বলতে পারি, এটি বিশাল ছিল। জীবাশ্মের রেকর্ডে এমন কোনো কাঁকড়াবিছার অস্তিত্ব নেই, যার সাঁড়াশি এর ধারেকাছেও আসতে পারে,' বলেন হাওয়ার্ড।
তিনি আরও জানান, ৪১ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে বেঁচে থাকা এই প্রজাতিটি কার্বোনিফেরাস যুগের দৈত্যাকার আর্থ্রোপোডদের চেয়েও অনেক বেশি প্রাচীন। কার্বোনিফেরাস যুগে পৃথিবীতে বন-জঙ্গল, জলাভূমি ও স্থলজ বাস্তুতন্ত্র বেশ বিকশিত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তার অনেক আগের এই প্রজাতিটি হয়তো স্থলভূমির একেবারে আদিম এক বাস্তুতন্ত্রের সুযোগ পেয়েছিল। সেসময় অন্য কোনো বড় প্রাণীর সঙ্গে এদের প্রতিযোগিতাই ছিল না। আর সম্ভবত সেই কারণেই এরা এমন দানবীয় আকার ধারণ করতে পেরেছিল।
গবেষকরা এই প্রাণীর আচরণগত দিকগুলোও বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণা বলছে, ওই যুগের অন্যতম প্রাচীন স্থলচর প্রাণী হিসেবে অন্য কোনো শিকারির হাত থেকে বাঁচতেই হয়তো কাঁকড়াবিছাটি বিবর্তনের ধারায় এমন বিশাল আকার ধারণ করেছিল।
তবে এই বিশাল আকারটাই আবার ছিল এর জন্য বিরাট এক সমস্যা। কারণ ডাঙায় এদের প্রধান খাবার ছিল মাইট ও অন্যান্য অতি ক্ষুদ্র মাকড়সাজাতীয় প্রাণী।
হাওয়ার্ড বলেন, 'একটা কুকুরের সমান বড় প্রাণী নিশ্চয় এত ছোট ছোট পোকামাকড় খেয়ে পেট ভরাতে পারে না। আমি তো ভেবেই পাই না, এরা এসব খুদে প্রাণী ধরত কীভাবে!'
এই রহস্যের সমাধানে বিজ্ঞানীরা একটি বিকল্প তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন। তাদের অনুমান, পি. গিগাস মূলত উভচর জীবনযাপন করত। ওই যুগের জলাশয়ে বাস করা আদিম, চোয়ালবিহীন ও শক্ত বর্মযুক্ত মাছ শিকার করেই এরা নিজেদের বিশাল দেহের পুষ্টি জোগাত।
