সম্প্রীতির মেলবন্ধন সুদৃঢ় করছে সীমান্ত হাট
সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের জন্য ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা সীমান্ত হাট এখন দুই বাংলার মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে। ভৌগোলিক সীমারেখা পেরিয়ে প্রতি রোববার এই সীমান্ত হাটে মিলিত হন দুই বাংলার মানুষজন। বিশেষ করে যাদের পাসপোর্ট নেই তারা খুব সহজেই হাটে এসে কেনাকাটার পাশাপাশি সীমান্তের দুই পাড়ে থাকা নিজেদের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে পারেন। দুই বাংলার মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির মেলবন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করছে এই সীমান্ত হাট।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার তারাপুর ও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সিপাহীজলা জেলার কমলাসাগর সীমান্তে নির্মিত দুই দেশের যৌথ মালিকানার এ সীমান্ত হাট গত ২০১৫ সালের ৬ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে দুই দেশের ৫০টি করে মোট ১০০টি দোকান রয়েছে এই হাটে। কসবা উপজেলা পরিষদ থেকে ৩০ টাকা দিয়ে টিকিট নিয়ে প্রতি হাটে ১ হাজার মানুষ প্রবেশ করতে পারেন। মূলত সীমান্তের পাঁচ কিলোমিটার এলাকার বাসিন্দাদের জন্য এই টিকিট দেওয়া হলেও এখন সীমান্ত এলাকার বাইরের লোকজনই বেশিরভাগ ভারতীয় পণ্য কিনে নিয়ে যান বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
হাটে বাংলাদেশি পণ্যের তুলনায় ভারতীয় পণ্য বেচা-কেনা অনেক বেশি। প্রতি রোববার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে হাটের বেচা-কেনা। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা প্রতি হাটে জনপ্রতি ৫০ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত পণ্য বিক্রি করে থাকেন। আর বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা বিক্রি করেন জনপ্রতি মাত্র ৩ থেকে ১০ হাজার টাকার পণ্য। সীমান্ত হাট ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছ থেকে পাওয়া তথ্যেও ভারত-বাংলাদেশের ‘অসম’ বাণিজ্যের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া গেছে।
ভারতীয় ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশী পণ্যগুলোর মধ্যে জামদানি শাড়ি, ফলমূল, শুঁটকি, কুটির শিল্প ও প্লাস্টিক পণ্য, লৌহজাত পণ্য এবং ক্রোকারিজ সামগ্রীর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এর বিপরীতে বাংলাদেশি ক্রেতাদের কাছে ভারতীয় প্রসাধনী, বিস্কুট, চকলেট, চা পাতা, শাড়ি, থ্রি-পিস ও শিশুদের ডায়পারের চাহিদা বেশি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর ও পার্শ্ববর্তী কুমিল্লা, হবিগঞ্জ ও নরসিংদী জেলাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসে পণ্য কিনে নিয়ে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন।
কসবা সীমান্ত হাটে ভারত ও বাংলাদেশি এমন কয়েকজন নাগরিকের সঙ্গে কথা হয় দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড প্রতিনিধির- যারা কেনাকাটার পাশাপাশি সীমান্তের দুই পাড়ে থাকা নিজেদের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। এমনই একজন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা শহরের বরজলা এলাকার বাসিন্দা কল্যাণ চক্রবর্তী। তিনি হাটে এসেছেন কুমিল্লার বুড়িচংয়ে থাকা তার বন্ধু সজল মিত্রের সঙ্গে দেখা করতে।
সরকারি চাকরিজীবী কল্যাণ চক্রবর্তী বলেন, ‘‘সীমান্ত হাটে এসে কয়েক বছর পর বন্ধু সজলের সঙ্গে দেখা হলো। আমাকে হাটে আসার আগেরদিন ফোন করে জানিয়েছে সে হাটে আসবে। হাটে এসে ওর সাথে দেখা হয়ে অনেক ভালো লাগছে। সময়ের অভাবে এবং পাসপোর্ট ভিসা না থাকার কারণে বাংলাদেশের আত্মীয়-স্বজনদের কাছে যেতে পারি না। কিন্তু এই হাটের মাধ্যমে সবার সঙ্গে দেখা করতে পারছি।‘‘
কল্যাণ চক্রবর্তীর বন্ধু কুমিল্লার বুড়িচংয়ের আইনজীবী সহকারী সজল মিত্র বলেন, ‘‘ভারতের ত্রিপুরায় আমাদের অনেক আত্মীয়-স্বজন রয়েছে। কিন্তু সময়-সুযোগের অভাবে সবসময় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি না। এই হাটের মাধ্যমে অনেকদিন পর বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো। আগে কখনও এই হাটে আসি নি। এবারই প্রথম বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার জন্য হাটে এসেছি"।
আগরতলার বিশালগড় এলাকার ব্যবসায়ী বিদ্যুৎ রায় বলেন, ‘‘কুমিল্লা ও ঢাকায় আমার শ্বশুরবাড়ির অনেক আত্মীয়-স্বজন থাকেন। এই হাটে আসলে তাদের সঙ্গে দেখা করতে পারি। এটাই আমাদের আনন্দ। হাটটি এখন দুই বাংলার মানুষের মিলনমেলার কেন্দ্র।‘‘
হাটে কেনাকাটা করতে আসা ভারতীয় ক্রেতা রঘুনাথ সরকার বলেন, ‘‘আমরা ৮ জন মিলে হাটে এসেছি। মূলত ঘুরে দেখার জন্যই হাটে আসা। বাংলাদেশি চানাচুর কিনেছি। আমার কাছে এই চানাচুর খুবই ভালো লাগে। তবে ভারতের তুলনায় বাংলদেশি পণ্যের দাম একটু বেশি।‘‘
সুমন মিয়া নামে বাংলাদেশি এক ক্রেতা বলেন, ‘‘ভারতের প্রসাধনী সামগ্রীগুলো অনেক ভালো মানের। বাংলাদেশের বাজারে ভারতীয় পণ্যগুলোর দাম দ্বিগুণেরও বেশি। হাট থেকে তুলনামূলক কম দামে পণ্যগুলো কেনা যায়।‘‘
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সীমান্ত হাট ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত চারটি হাটে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা প্রায় ৭০ লাখ টাকা এবং ভারতীয় ব্যবসায়ীরা মোট ৪ কোটি ৭০ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেছে।
ভারতীয় ব্যবসায়ী মনিষ দাস জানান, ‘‘আমার দোকানে প্রসাধনি সামগ্রীর বেচা-কেনা সবচেয়ে বেশি। আমাদের বিক্রি এক লাখ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। গড়ে প্রতি হাটে ৭০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করতে পারি।‘‘
হাটে বাংলাদেশি ক্রেতা-দর্শনার্থীরা হুমড়ি খেয়ে পড়লেও ভারতীয়দের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। দুই দেশের ক্রেতাদের জন্য ২০০ ডলার সমমূল্যের পণ্য কেনার অনুমতি থাকলেও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কড়াকড়ির কারণে ভারতীয় ক্রেতারা ৪-৫ হাজার টাকার বেশি পণ্য কিনতে পারেন না বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা। পণ্য কেনার পর হাট থেকে বের হওয়ার সময় বিএসএফ এবং কাস্টমস এর লোকজন হয়রানি করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশী ক্রোকারিজ পণ্য ব্যবসায়ী মোস্তফা হারুন বলেন, ‘‘হাটে ক্রেতা কম, ব্যবসায়ী বেশি। টিকিট নিয়ে অধিকাংশ বাংলাদেশী পাইকার সাধারণ ক্রেতা সেজে ব্যবসা করার জন্য ব্যাগভর্তি করে ভারতীয় পণ্য কিনে নিয়ে যান। সেজন্য ভারতীয়দের ব্যবসা আমাদের তুলনায় অনেক ভালো।‘‘ বাংলাদেশীদের ব্যবসা ভারতীয়দের সমান না হলেও অন্তত অর্ধেক যেন হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশি কাপড় ব্যবসায়ী ওয়ালিউল্লাহ সরকার অতুল বলেন, ‘‘আমাদের পাইকাররা হাটে এসে ভারতীয় পণ্যের চাহিদা বাড়াচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য হাটে পাইকারদের আসা বন্ধ করতে হবে। এছাড়া সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা ব্যতিত অন্য কেউ যেন কার্ড না পায় সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে।‘‘
জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) ও কসবা সীমান্ত হাট ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান মিতু মরিয়ম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ‘‘ব্যবসায়িক লেনদেনের পাশাপাশি হাটের আরেকটি উদ্দেশ্য ছিলÑ দুই বাংলার মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির মেলবন্ধন যেন আরও জোরদার হয়। সেটা কিছুটা হলেও প্রতিফলিত হয়েছে। সীমান্তের পাঁচ কিলোমিটার এলাকার লোকজন শুধুমাত্র হাটে ঢোকার টিকিট পাবে। এর বাইরের লোকজনকে আমরা টিকিট দিচ্ছি না। বাণিজ্যিক উদ্দেশে পণ্য কিনছে- এমন যদি কারও ওপর সন্দেহ হয় সেটি আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বন্ধের চেষ্টা করছি।‘
পণ্য কেনার পর বিএসএফ সদস্যদের হয়রানির বিষয়ে ‘ডিসি-এডিএম’ সভায় আলোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
৬০ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের (বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্নেল ইকবাল হোসেন বলেন, ‘‘সীমান্ত হাটের সবকিছু অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নিয়ন্ত্রণে। বিজিবি শুধু হাটের গেইটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। হাটের ব্যবসা সম্পর্কে আমাদের কিছুই বলার নেই”।
