‘অশুভ’ তকমা ঘুচিয়ে জাতীয় সম্পদ: যেভাবে নারী বাহিনীর হাত ধরে বিলুপ্তির মুখ থেকে ফিরল হাড়গিলা পাখি
একসময় এই পাখি দেখলেই মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিত, ভাবত 'অশুভ'। অথচ সেই ঘৃণিত পাখিটিই এখন হাজার হাজার নারীর পরম মমতায় মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে। ভারতের আসামে বিলুপ্তপ্রায় 'হাড়গিলা' বা গ্রেটার অ্যাডজুট্যান্ট স্টর্ক বাঁচাতে গড়ে উঠেছে ২০ হাজার নারীর এক বিশাল বাহিনী। তাদের হাত ধরেই লেখা হচ্ছে এক অবিশ্বাস্য ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।
গল্পের শুরু ২০০৭ সালের এক তপ্ত দুপুরে। জীববিজ্ঞানী পূর্ণিমা দেবী বর্মণ তখন আসামের দাদারা গ্রামে, ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে। চারদিকে সবুজ বন আর জলাভূমি থাকলেও তাঁর চোখ আটকে গেল এক নিষ্ঠুর দৃশ্যে।
গ্রামের মানুষ সবেমাত্র একটি বিশাল কদম গাছ কেটে ফেলেছে। আর সেই গাছের ভাঙা ডালপালার নিচে পড়ে আছে বিশাল সব পাখি। কালো-সাদা পালক, লম্বা পা আর ধারালো ঠোঁটের এই পাখিগুলোর নিথর দেহ মাটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। এগুলোই আসামের বিখ্যাত কিন্তু বিপন্ন পাখি—গ্রেটার অ্যাডজুট্যান্ট স্টর্ক।
ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কয়েকটি ছানা তখনো ধুকপুক করছিল। পূর্ণিমা দেবী একটি ছানাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি বলেন, 'আমি ওর হৃৎস্পন্দন টের পাচ্ছিলাম। অবুঝ প্রাণীটার কষ্ট আমি হাড়েমজ্জায় অনুভব করছিলাম।' নিজের যমজ সন্তানদের কথা ভেবে পাখিটির এই দুর্দশা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
তখন তিনি বন্যপ্রাণী নিয়ে পিএইচডি করছিলেন। কিন্তু সেই মুহূর্তটি তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি ঠিক করলেন, শুধু দূর থেকে গবেষণা করলেই চলবে না, এদের বাঁচাতে সরাসরি মাঠে নামতে হবে।
কেন এই পাখির নাম 'হাড়গিলা'?
স্থানীয়রা এই পাখিকে ডাকে 'হাড়গিলা' নামে। প্রায় ৫ ফুট লম্বা এই বিশাল পাখি দেখতে একটু ভয়ংকর হতে পারে, কিন্তু পরিবেশের জন্য এরা আশীর্বাদ। এরা মরা পশুর মাংস ও হাড় খেয়ে জলাভূমি পরিষ্কার রাখে, রোগজীবাণু ছড়াতে দেয় না এবং মাটিতে পুষ্টি ফিরিয়ে দেয়।
একসময় এশিয়াজুড়ে এদের রাজত্ব ছিল। কিন্তু এখন কেবল আসাম, বিহার এবং কম্বোডিয়ার কিছু জায়গায় এদের দেখা মেলে। আইইউসিএন-এর লাল তালিকায় এরা 'বিপন্ন' প্রায়।
ঘৃণা থেকে ভালোবাসার যাত্রা
আসামের গ্রামগুলোতে হাড়গিলাকে আপদ মনে করা হতো। মানুষ ভাবত এরা অশুভ, এদের দেখলে অমঙ্গল হয়। আবার কোথাও কোথাও কুষ্ঠরোগের ওষুধ হিসেবে এদের মাংস খাওয়ার জন্য শিকার করা হতো। এরা মানুষের বাড়ির গাছে বাসা বেঁধে জায়গা নোংরা করত বলে গ্রামবাসী আরও বিরক্ত হতো।
এই পরিস্থিতিতে হাড়গিলা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যেতে পারত। কিন্তু দৃশ্যপট বদলে দিল 'হাড়গিলা আর্মি'। পূর্ণিমা দেবী বুঝতে পেরেছিলেন, বিজ্ঞান দিয়ে নয়, মানুষের মন জয় করেই পাখি বাঁচাতে হবে।
২০০৭ সালেই তিনি নারীদের দুয়ারে দুয়ারে যাওয়া শুরু করলেন। তিনি মায়েদের প্রশ্ন করতেন, 'তোমাদের সন্তানের সঙ্গে কেউ যদি এমন নিষ্ঠুর আচরণ করত, তবে কেমন লাগত?' তাঁর এই আবেগঘন যুক্তি নারীদের মনে দাগ কাটে।
৩৫ বছর বয়সী প্রতিমা কলিতা রাজবংশী বলেন, 'একসময় আমরাই পাখিদের পাথর ছুড়ে মারতাম। কিন্তু পূর্ণিমা দিদি যখন আমাদের শিশুদের সঙ্গে পাখির ছানাদের তুলনা করলেন, তখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। সেদিনই শপথ নিলাম, এদের বাঁচাব।'
হাড়গিলা আর্মি: ২০ হাজার নারীর এক পরিবার
পূর্ণিমা দেবী এক অভিনব কৌশল নিলেন। আসামে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য 'সাধ' বা 'বেবি শাওয়ার' অনুষ্ঠান হয়। তিনি সেই অনুষ্ঠানে হাড়গিলার আদলে তৈরি মুখোশ ও পোশাক পরে নাচের ব্যবস্থা করলেন। এতে আনন্দের সঙ্গে পাখিটির একটি আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হলো।
তিনি গ্রামের নারীদের দিয়ে কাপড়ে, শাড়িতে ও কুশনে হাড়গিলার ছবি বোনা শুরু করালেন। এতে নারীদের আয়ের পথও তৈরি হলো। দাদারা গ্রামের লাভিতা বৈশ্য সেলাই করে এখন নিজের সংসার চালাচ্ছেন এবং অন্যদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।
এভাবে অল্প কয়েকজন নারী নিয়ে শুরু হওয়া দলটি এখন ২০ হাজার সদস্যের বিশাল বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। তাদের চেষ্টায় ২০০৭ সালে যেখানে মাত্র ৪৫০টি পাখি ছিল, এখন আসামে তা বেড়ে ১৮০০-তে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনীতি ও পরিবেশের মেলবন্ধন
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির পরিচালক সুসান সি গার্ডনার বলেন, এই উদ্যোগ সফল হওয়ার মূল কারণ হলো—এটি পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে নারীদের পকেটের উন্নয়নেও ভূমিকা রেখেছে। নারীরা এখন হাড়গিলা থিমযুক্ত পণ্য বিক্রি করে আয় করছেন। তাদের আত্মপরিচয় ও সম্মান বেড়েছে।
তবে চ্যালেঞ্জ এখনো শেষ হয়নি। জলাভূমি ভরাট করে উন্নয়ন কাজ চলায় পাখিদের বাসস্থান কমছে। শিমুল ও কদম গাছ—যা হাড়গিলার প্রিয় বাসা—সেগুলোও কাঠ পাচারকারীরা কেটে ফেলছে।
পূর্ণিমা দেবী বলেন, 'হাড়গিলা বাঁচানো মানেই গাছ বাঁচানো। কিন্তু সমস্যা হলো অনেক গাছই মানুষের ব্যক্তিগত জমিতে। তাই জনসচেতনতাই আমাদের প্রধান হাতিয়ার।'
তিনি বিশ্বাস করেন, নারীরা যখন একজোট হন, তখন কোনো বাধাই আর বাধা থাকে না। পূর্ণিমা দেবী বলেন, 'পরিবর্তনের প্রথম শর্ত হলো আওয়াজ তোলা। আমরা দেখিয়ে দিয়েছি, নারীরা চাইলে যেকোনো কিছু রক্ষা করতে পারে।'
