বিশ্বের অন্যতম উঁচু ভবন জয় করলেন ‘ফ্রি সোলো’ ক্লাইম্বার অ্যালেক্স হনল্ড
এক ঝকঝকে রোববারের সকাল। হাজারো দর্শক বুকভরা আতঙ্ক নিয়ে তাকিয়ে আছেন ওপরের দিকে। বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষও চোখ সরিয়ে নিতে পারছিলেন না টিভি বা মোবাইলের পর্দা থেকে। কারণটা আর কিছুই নয়, বিখ্যাত পর্বতারোহী অ্যালেক্স হনল্ডের এক মরণপণ প্রচেষ্টা। পৃথিবীর অন্যতম উঁচু আকাশচুম্বী ভবন 'তাইপেই ১০১' তিনি বেয়ে ওঠার দুঃসাহস দেখাচ্ছিলেন। এই শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান চলল দীর্ঘ ৯২ মিনিট।
স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৪৩ মিনিট। তাইপেই ১০১ ভবনের চূড়ার মেটাল স্পায়ারের শেষ ইঞ্চিটুকুও পার করলেন হনল্ড। ১ হাজার ৬৬৭ ফুট (৫০৮ মিটার) উচ্চতায় দাঁড়িয়ে বিজয়ের হাসি হাসলেন তিনি। নিচে উল্লসিত ভক্তদের উদ্দেশে হাত নাড়লেন। নিঃসন্দেহে পর্বতারোহণের ইতিহাসে এটি এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকবে।
তাইপেই ১০১ ভবনে 'ফ্রি সোলো' করা প্রথম ব্যক্তি তিনি। এর মানে হলো, তিনি কোনো দড়ি, সেফটি নেট বা অন্য কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করেননি। সম্বল ছিল শুধু খালি হাত আর গ্রিপ বা ধরার সুবিধার জন্য এক ব্যাগ চক পাউডার।
আরোহণ শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে হনল্ড বলেন, 'এটা এক অদ্ভুত অনুভূতি। আমি নিশ্চিত, এই ঘোর কাটতে আমার বেশ কয়েক দিন লাগবে। এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য।' তিনি আরও বলেন, 'আপনি হয়তো দীর্ঘ সময় ধরে ভাবছেন বা কল্পনা করছেন যে এটা করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে কাজটা করার অনুভূতি সব সময়ই অন্য রকম।'
৪০ বছর বয়সী হনল্ড প্রায় দুই দশক ধরেই পর্বতারোহীদের কাছে পরিচিত নাম। ২০ বছর বয়সের দিকেই তিনি কঠিন সব পথ দড়ি ছাড়া পাড়ি দিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন।
তবে ২০১৭ সালে তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান। সেবার তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইয়োসেমিটি ন্যাশনাল পার্কের খাড়া পাথুরে পাহাড় 'এল ক্যাপিটান' দড়ি ছাড়াই জয় করেছিলেন। সেই হাড়হিম করা অভিযানের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছিল পুরস্কারজয়ী প্রামাণ্যচিত্র 'ফ্রি সোলো'।
এরপর থেকেই তিনি নতুন নতুন রেকর্ড গড়ে চলেছেন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তাইপেই ১০১ ভবনের ওপর তার নজর ছিল। তবে নেটফ্লিক্সের প্রস্তাব পাওয়ার পরই সেই সুযোগটি বাস্তবে রূপ নেয়। নেটফ্লিক্স তার এই আরোহণ সরাসরি সম্প্রচার করেছে। হনল্ড একে 'শহুরে ভবনে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় ফ্রি সোলো' বলে অভিহিত করেছেন।
স্থানীয় সময় শনিবার সকালেই এই অভিযান হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে তা পিছিয়ে দেওয়া হয়। রবিবার আবহাওয়া ছিল চমৎকার। ঝকঝকে রোদ, নীল আকাশ আর বাতাসের বেগও ছিল কম। ফলে আরোহণের জন্য পরিবেশ ছিল একদম অনুকূলে।
হনল্ড বলেন, 'আমার জন্য ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল শান্ত থাকা। ভিড়, মানুষের কোলাহল আর পুরো পরিবেশ মিলিয়ে বেশ চাপ অনুভব করছিলাম।' তিনি আরও যোগ করেন, 'তবে ওপরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আমি ধীরে ধীরে শিথিল হতে থাকি। মনে হচ্ছিল, আরে! এটা তো বেশ মজার। এই আনন্দ পেতেই তো আমি এই কাজ করি।'
অবশ্য তাইপেই ১০১ ভবনে চড়া প্রথম ব্যক্তি হনল্ড নন। ২০০৪ সালে ফরাসি পর্বতারোহী অ্যালাইন রবার্ট এই ভবনের চূড়ায় উঠেছিলেন। তবে তিনি দড়ি ব্যবহার করেছিলেন। ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে রবার্টকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেদিন আবহাওয়া ছিল খুব খারাপ, ছিল বৃষ্টি আর ঝড়ো বাতাস। ফলে রবার্টের সময় লেগেছিল চার ঘণ্টা, যেখানে হনল্ড সময় নিলেন মাত্র দেড় ঘণ্টা।
রবার্ট ও হনল্ড দুজনেই বলেছেন, সচরাচর তারা যেসব পাহাড় বা পাথুরে দেয়াল বেয়ে ওঠেন, তার তুলনায় এই ভবনটি খুব একটা কঠিন বা জটিল ছিল না। যেমন, হনল্ডকে পিচ্ছিল কাচ ধরে ঝুলে থাকতে হয়নি। তিনি ভবনের ধাতব কাঠামো, কার্নিশ এবং বিম ধরে ধরে ওপরে উঠেছেন।
অবশ্য ওপরের দিকে কিছু কঠিন ধাপ ছিল। কিন্তু হনল্ড সেগুলো বেশ অনায়াসেই পার করেছেন এবং দ্রুতগতিতে ওপরে উঠেছেন। মাঝে মাঝে তিনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিয়েছেন এবং নিচের দর্শকদের উদ্দেশে হাত নেড়েছেন।
হনল্ডের স্ত্রী সানি ম্যাকক্যান্ডলেস তখন ভবনের ভেতরে। তিনি উৎকণ্ঠা নিয়ে স্বামীর ওপরের দিকে ওঠা দেখছিলেন। হনল্ড যখন তার ফ্লোর অতিক্রম করছিলেন, কাচের ওপাশ থেকে তিনি স্বামীর উদ্দেশে হাত নাড়েন। চূড়ায় ওঠার পর স্পায়ারের নিচের এক বারান্দায় তাদের দেখা হয়। স্বামীকে জড়িয়ে ধরে তিনি মজা করে বলেন, 'পুরো সময়টা আমার প্রায় প্যানিক অ্যাটাক হওয়ার জোগাড় হয়েছিল।'
২০০৪ সালে যখন তাইপেই ১০১ চালু হয়, তখন এটিই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন। পরে দুবাইয়ের ২ হাজার ৭১৭ ফুট (৮২৮ মিটার) উচ্চতার বুর্জ খলিফা সেই খেতাব কেড়ে নেয়। এরপর নিউ ইয়র্কের ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারসহ আরও ১০টি ভবন এর চেয়ে বেশি উচ্চতা নিয়ে তৈরি হয়েছে। তবে তাইপেই শহরে এটি এখনো সবচেয়ে উঁচু এবং দর্শনীয় ভবন।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে হনল্ডের এই 'সত্যিই স্নায়ুচাপ সৃষ্টিকারী' দৃশ্য দেখে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই ঘটনার মাধ্যমে বিশ্ববাসী 'তাইওয়ানের মানুষের উষ্ণতা এবং দ্বীপের সুন্দর পাহাড় ও নিসর্গ' দেখার সুযোগ পাবে।
আরোহণ শেষে হনল্ড বলেন, তিনি আশা করেন তার এই কাজ মানুষকে নিজেদের চ্যালেঞ্জ বা লক্ষ্য পূরণে অনুপ্রাণিত করবে। সবশেষে নিজের স্বভাবসুলভ ও সোজাসাপ্টা ভঙ্গিতে তিনি তার এই অর্জনকে অল্প কথায় বর্ণনা করলেন:
'খুবই ভালো লাগছে। কী চমৎকার একটা দিন!'
