যে প্রাকৃতিক ঘড়ি নির্ভুলভাবে কারো মৃত্যুর সময় বলে দিতে পারে
সময়টা ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি। মার্কিন রসায়নবিদ উইলার্ড লিবির একটাই লক্ষ্য—প্রকৃতিতে কার্বন-১৪ নামে কার্বনের এক তেজস্ক্রিয় রূপ খুঁজে বের করা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, যদি এর অস্তিত্ব থাকে, তবে প্রতিটি মৃত উদ্ভিদ আর প্রাণীর দেহে এটি এক অমোচনীয় চিহ্ন রেখে যাবে। তাদের দেহাবশেষে কতটা কার্বন-১৪ বাকি আছে, তা মাপতে পারলেই বেরিয়ে আসবে তাদের মৃত্যুর সঠিক সময়। এ যেন প্রকৃতির নিজস্ব এক মৃত্যু-ঘড়ি!
কিন্তু লিবির সামনে ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। তাকে প্রমাণ করতে হতো যে, প্রকৃতিতে কার্বন-১৪ ঠিক সেই পরিমাণেই রয়েছে যা তিনি ধারণা করেছিলেন। এর আগে বিজ্ঞানীরা শুধু গবেষণাগারেই কৃত্রিমভাবে এটি তৈরি করতে পেরেছিলেন।
লিবির যুক্তি ছিল অত্যন্ত সরল: জীবন্ত প্রাণীরা তাদের মলের মাধ্যমে নিশ্চয়ই এটি পরিবেশে ত্যাগ করে। আর এই ভাবনা থেকেই তিনি নজর দিলেন বাল্টিমোর শহরের পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার দিকে। এবং হ্যাঁ, তিনি যা খুঁজছিলেন, তা পেয়েও গেলেন!
লিবি তখন হয়তো কল্পনাও করেননি, তেজস্ক্রিয় কার্বন ব্যবহার করে বয়স বের করার এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি একদিন পৃথিবীর ইতিহাসকেই নতুন করে লিখবে।
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে আজ পর্যন্ত, রেডিওকার্বন ডেটিং অগণিত প্রাচীন নিদর্শনের বয়স নিশ্চিত করেছে, নিখোঁজ ব্যক্তির রহস্যের কিনারা করেছে, এমনকি হাতির দাঁতের চোরাকারবারিদেরও জেলে পাঠিয়েছে। এটি যেন এক জাদুর চাবিকাঠি, যা আমাদের পৃথিবীর রহস্যের একেকটি দরজা খুলে দেয়।
কিন্তু এই কার্বন-১৪ আসে কোথা থেকে?
লিবি বুঝতে পেরেছিলেন, মহাজাগতিক রশ্মি যখন ঝড়ের মতো পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ে, তখন তা বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন পরমাণুর গঠন বদলে দেয়, আর জন্ম হয় কার্বন-১৪-এর। এই তেজস্ক্রিয় কার্বন দ্রুত অক্সিজেনের সাথে মিশে তৈরি করে তেজস্ক্রিয় কার্বন ডাইঅক্সাইড।
গাছপালা বাতাস থেকে এই কার্বন শোষণ করে, আর সেই গাছপালা খেয়ে বেঁচে থাকা প্রাণীরাও—আমরা মানুষ সহ—তা গ্রহণ করি। যতক্ষণ কোনো প্রাণী বা উদ্ভিদ জীবিত থাকে, ততক্ষণ তার শরীরে কার্বন-১৪-এর জোগান চলতে থাকে। কিন্তু মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়। এরপর শুরু হয় ক্ষয়। যেহেতু কার্বন-১৪ একটি নির্দিষ্ট হারে ক্ষয় হয়, তাই কোনো জৈব বস্তুতে এর বাকি থাকা পরিমাণ মেপেই তার বয়স নির্ভুলভাবে বলে দেওয়া যায়। অর্থাৎ, এটি এমন এক ঘড়ি, যার কাঁটা চলতে শুরু করে মৃত্যুর মুহূর্ত থেকে।
বাল্টিমোরের পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থায় কার্বন-১৪ খুঁজে পাওয়ার পর লিবি যেন গুপ্তধনের চাবি পেয়ে গেলেন। তিনি ডেড সি স্ক্রোলের লিনেন কাপড় থেকে শুরু করে ৪,০০০ বছরের পুরনো মিশরীয় রাজার সমাধিতে পাওয়া জাহাজের টুকরো—সবকিছুর বয়স প্রমাণ করে দেখালেন।
লিবি পরে মজা করে বলেছিলেন, "এটা এতটাই খ্যাপাটে একটা কাজ ছিল যে কাউকে মুখ ফুটে বলাই যেত না! মহাজাগতিক রশ্মি যে মানব ইতিহাস লিখে ফেলতে পারে, এ কথা কেউ বিশ্বাস করত না। তাই আমরা ব্যাপারটা গোপন রেখেছিলাম।"
কিন্তু যখন তার পদ্ধতি প্রমাণিত হলো, তখন আর গোপন রাখার কিছু ছিল না। ১৯৬০ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার জিতে নেন উইলার্ড লিবি।
তার এই কৌশল প্রায় ৫০,০০০ বছর পর্যন্ত পুরনো জৈব পদার্থের বয়স নির্ধারণ করতে পারে। এর চেয়ে পুরনো হলে কার্বন-১৪-এর পরিমাণ এতটাই কমে যায় যে তা আর মাপা যায় না।
অক্সফোর্ড রেডিওকার্বন অ্যাক্সিলারেটর ইউনিটের র্যাচেল উড বলেন, "বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে তুলনা করতে এবং পরিবর্তনের গতি বুঝতে এই পদ্ধতিটি বৈপ্লবিক।" তাদের ল্যাবে মানুষের হাড়, কয়লা, বীজ, চুল থেকে শুরু করে অদ্ভুত সব জিনিসেরও বয়স মাপা হয়। যেমন? র্যাচেলের ভাষায়, "আমরা জীবাশ্মে পরিণত হওয়া বাদুড়ের মূত্রের মতো অদ্ভুত জিনিসের বয়সও বের করেছি!"
আধুনিক প্রযুক্তি এখন লিবির থেকেও হাজার গুণ উন্নত। এখন মাত্র এক মিলিগ্রাম নমুনা থেকেই বয়স বের করা যায়, যেখানে লিবির প্রয়োজন হতো অনেক বেশি পরিমাণ।
রেডিওকার্বন ডেটিং বহু পুরনো বিতর্কের অবসান ঘটিয়েছে। যেমন, ১৮২৩ সালে ওয়েলসে পাওয়া একটি মানব কঙ্কালকে আবিষ্কারক মাত্র ২,০০০ বছরের পুরনো বলে দাবি করেছিলেন। এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে কেউ তা ভুল প্রমাণ করতে পারেনি। কিন্তু রেডিওকার্বন ডেটিং দেখিয়ে দিল, কঙ্কালটি আসলে ৩৩,০০০ থেকে ৩৪,০০০ বছরের পুরনো! এক লহমায় ভেঙে গেল শতবর্ষের পুরনো ধারণা।
শুধু প্রাচীন রহস্যই নয়, আধুনিক অপরাধ জগতেও হানা দিয়েছে এই প্রযুক্তি!
১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে বাড়তি কার্বন-১৪ ছড়িয়ে দিয়েছিল। এই "বোমা পালস" ফরেনসিক বিজ্ঞানীদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। এর মাধ্যমে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে যেকোনো জৈব পদার্থের বয়স প্রায় এক বা দুই বছরের ব্যবধানেও বের করা যায়!
এই পদ্ধতি ব্যবহার করেই হাতে-নাতে ধরা পড়েছে হাতির দাঁতের চোরাকারবারিরা। ডিএনএ পরীক্ষায় হাতির দাঁতের উৎস জানা গেলেও, রেডিওকার্বন ডেটিং বলে দেয় হাতিগুলোকে ঠিক কবে হত্যা করা হয়েছিল—আইন চালু হওয়ার আগে, নাকি পরে। এই অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতেই অনেক চোরাকারবারিকে জেলে পাঠানো হয়েছে।
একইভাবে জাল শিল্পকর্মও ধরা পড়েছে। একজন জালিয়াত দাবি করেছিল তার আঁকা একটি ছবি ১৮৬৬ সালের। কিন্তু রেডিওকার্বন ডেটিং প্রমাণ করে দেয়, ছবিটি আসলে ১৯৮০-এর দশকে এঁকে কৃত্রিমভাবে পুরনো দেখানো হয়েছে!
বিজ্ঞানীরা রেডিওকার্বন রেকর্ড ব্যবহার করে অতীতে পৃথিবীর জলবায়ু কীভাবে বদলেছিল তা জানতে পারেন এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতের মডেলগুলোকে আরও নির্ভুল করে তোলেন। জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত নোবেলজয়ী আইপিসিসি রিপোর্টেও এই গবেষণার অবদান অনস্বীকার্য।
তবে জীবাশ্ম জ্বালানি—যেমন কয়লা, তেল ও গ্যাস—লক্ষ লক্ষ বছর পুরনো হওয়ায় তাতে কোনো কার্বন-১৪ নেই। এই জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বায়ুমণ্ডলে যে কার্বন মিশছে, তা পরিবেশের স্বাভাবিক কার্বন-১৪-এর ঘনত্বকে কমিয়ে দিচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, যদি কার্বন নির্গমন এভাবেই বাড়তে থাকে, তবে ভবিষ্যতে রেডিওকার্বন ডেটিং-এর নির্ভুলতা মারাত্মকভাবে কমে যাবে। এমনও দিন আসতে পারে, যখন সদ্য তৈরি হওয়া কোনো জিনিস আর ২,০০০ বছরের পুরনো কোনো জিনিসের মধ্যে পার্থক্য করা যাবে না।
গাছের গুঁড়ির রিং থেকে পাওয়া রেডিওকার্বনের সূক্ষ্ম পরিমাপের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা গত ১৪,০০০ বছরের এক অবিশ্বাস্য নির্ভুল ইতিহাস তৈরি করেছেন। কিন্তু জীবাশ্ম জ্বালানির দূষণ হয়তো সেই নির্ভুলতার যুগকে একদিন শেষ করে দেবে।
