৩ থেকে ৭ নভেম্বর: একজন শিশু যা দেখেছে এবং জেনেছে…
ঘুম ভেঙে দেখি
আমি যে সময়ের কথা বলছি, তখন আমার বয়স ১০ বছর। মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়া ছাড়া তেমন বড় কোনো ঘটনার স্মৃতি নেই ঐটুকু জীবনে। তবে এই ঘটনাগুলো এতটাই শক্তিশালী যে, মনের মধ্যে গেঁথে আছে। আর আমার পরিবারের, মানে আব্বার সম্পৃক্তার কারণে আরও বেশি করে জেনেছি, বুঝেছি।
শিশু মনোবিদরা বলেন, যেকোনো বড় ঘটনা শিশুরা ২ বছর থেকেই মনে রাখতে পারে।
সে যাক, যে ঘটনার কথা বলছি, তার দিন-তারিখও আমি সেসময় ঠিক জানতাম না; পরে বুঝতে পেরেছি। শুধু মনে আছে বেশ রাতে, নাকি খুব ভোরে আমাদের ঘুম ভেঙে গেল। দেখলাম, ঘরের বাতি নিভানো। আব্বা, আম্মা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে কী যেন দেখার চেষ্টা করছেন, আর ফিসফিস করে কথা বলছেন।
আমারও ঘুম ভেঙে গেল। আমিও ওদের সঙ্গে, না বুঝেই জানালা দিয়ে দেখেছিলাম। সামনে ফাঁকা মাঠ থাকায় লাইটপোস্টের আলোতেও কিছু কিছু দেখা যাচ্ছিল। অস্পষ্টভাবে মনে করতে পারি, আসাদ গেট নিউ কলোনির বড় মাঠটির পাশের রাস্তা দিয়ে, যা এখন আসাদ গেট আড়ংয়ের পাশের রাস্তা বলে চিনি, সেদিক দিয়ে দুয়েকটি গাড়ি বারবার আসা-যাওয়া করছিল।
কেন এই অসময়ে, এই ভেতরকার রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলাচল করছে, আব্বা-আম্মা বুঝতে পারছিলেন না। কয়েক মাস আগে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে, কয়েকদিন আগে জাতীয় চার নেতাকে জেলখানায় হত্যা করা হয়েছে। ফলে এভাবে রাতের আঁধারে গাড়ি চলতে দেখে আব্বার খুবই সন্দেহ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, খারাপ কিছু ঘটছে। কারণ, সে সময়ে এই শহরে দিনের বেলাতেই হাতেগোনা কিছু গাড়ি চলত।
কেনই-বা আব্বা-আম্মা এভাবে আলো নিভিয়ে জানালা দিয়ে দেখছেন? সেসময় আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। মনে আছে, আব্বা পরদিন আম্মাকে বললেন, 'আমরা রাতে যে গাড়ি চলাচল করতে দেখেছিলাম, তা মনে হয় খালেদ মোশাররফের ছিল। ওনাকে মেরে ফেলা হয়েছে। সঙ্গে নিহত হয়েছেন আরও অনেকে।'
ক'দিন থেকেই গুমোট পরিবেশ
কদিন ধরেই একটা গুমোট পরিবেশ টের পাচ্ছিলাম। কিন্তু কোথায় কী হচ্ছে বা হতে যাচ্ছে, সেটা বোঝার বয়স বা প্রেক্ষিত কিছুই আমার ছিল না। শুধু বুঝতে পারছিলাম, বঙ্গবন্ধু আগস্ট মাসে নিহত হওয়ার পর সব সময়ই চারদিকে কেমন যেন একটা শুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। আর আব্বার অস্থিরতা বহুগুণ বেড়েছে। একদম কথাবার্তা বন্ধ করে দিয়েছেন। বাসায় আর হাসাহাসি, গল্পের পরিবেশ নাই। খামোখাই কেন যেন সবাই খুব লঘু স্বরে কথা বলছেন।
অনেক পরে বুঝতে পেরেছি, সেই সময়টা, মানে ৩ থেকে ৭ নভেম্বর ছিল আমাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়। ১৫ আগস্ট থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত যা ঘটেছিল, তা ছিল খুবই অনভিপ্রেত, শোকাবহ ঘটনা। সাধারণ মানুষ কেউই আসলে স্পষ্টভাবে বলতে পারে না বা জানে না ঠিক সে সময়টাতে কে, কী ভূমিকা পালন করেছিলেন? কতগুলো মানুষ এবং কতগুলো ঘটনা নিয়ে রহস্য থেকেই গেছে। যদিও বেশ কয়েকটি বই আছে এই সময়কে ঘিরে, কিন্তু তাও রহস্যটি ভেদ হয়নি।
আমার আব্বা শামসউল হুদা তখন প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ছিলেন তথ্য মন্ত্রণালয়ের। ফলে অনেক ঘটনার সাক্ষী ছিলেন তিনি। আমি বড় হওয়ার পর বহুবার তাকে বলেছি, ঐ সময়ের ঘটনাগুলো নিয়ে বই লিখে ফেলতে। যেন একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে একটি বই থাকে। উনি ভেবেছিলেন, অবসরে গিয়ে লিখবেন; কিন্তু হঠাৎ চলে গেলেন। অবসরে যাওয়া আর হয়নি, তাই আর লেখাও হয়ে উঠেনি।
কেন ৩রা নভেম্বরের অভ্যুত্থান
বড় হওয়ার পর আমি বিভিন্ন সময় আব্বার কাছ থেকে এ বিষয়ে অনেক কিছু জানতে পেরেছি। যেমন, ৩রা নভেম্বর জেনারেল খালেদ মোশাররফ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সেনাবাহিনীতে 'চেইন ইন কমান্ড' পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল, তিনি তাদের বঙ্গভবন থেকে সরাতে চেয়েছিলেন এবং তা পেরেছিলেনও। বলা যায়, ঘাতকদের বিরুদ্ধে তিনিই ছিলেন প্রথম প্রতিবাদী কণ্ঠ।
জেনারেল জিয়াউর রহমানকে এ সময় বন্দি করা হয়। জেনারেল খালেদ মোশাররফ অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু কোনো রক্তপাত ঘটাননি।
খালেদ মোশাররফ ভারতীয় হাইকমিশনারকে কেন ফুল দিতে দেননি
অভ্যুত্থানের পর খালেদ মোশাররফকে অনেকে ভারতীয় দালাল বলে প্রচার করেছে, যদিও সেনাবাহিনীর অধিকাংশই তা মনে করতেন না। এটা ছিল কিছু পাকিস্থানপন্থী ও চীনপন্থী রাজনীতিবিদ, সামরিক বাহিনী সদস্য এবং সাংবাদিক বা গণমাধ্যমের একটি প্রচারণা।
আব্বার কাছ থেকেই শুনেছি, চার জাতীয় নেতার মরদেহ যখন জেল থেকে বের করে আনা হয়, তখন তৎকালীন ভারতীয় হাইকমিশনার মুক্তিযুদ্ধের এই মহান নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য তাদের মরদেহের ওপর ফুলের তোড়া অর্পণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু খালেদ মোশাররফ তাতে রাজি হননি। কিন্তু কেন রাজি হননি? তিনি ভারতের দালাল হলে তো তার না করার কথা ছিল না।
১৯৯১-তে এসে কর্নেল রশীদের বয়ান
ফ্রিডম পার্টির নেতা এবং বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্নেল রশীদ জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছিল ১৯৯১-তে তাদের এক সংবাদ সম্মেলনে। তার অভিযোগ:
১. জিয়া সাহেব মুজিব হত্যাকাণ্ড আগে থেকেই জানতেন।
২. মুজিবকে মারার পর জিয়া সাহেব নিজেই রাষ্ট্রপ্রধান হতে চেয়েছিলেন।
৩. জিয়া সাহেব চার নেতা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
৪. জিয়া সাহেবই ৩ নভেম্বরের ক্যু ঘটিয়েছেন। জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ছিলেন খালেদ মোশাররফ।
তবে তার এসব দাবির সত্যাসত্য বিচার করার জন্য যাদের দরকার ছিল, তারা কেউই তখন বেঁচে ছিলেন না।
আব্বা মারা গেছেন ১৯৯২ সালে। তিনি জোরালোভাবে বিশ্বাস করতেন এবং বলতেন, এই দেশে একদিন বঙ্গবন্ধু হত্যার ও জেল হত্যার বিচার হবেই। তখন হয়তো অনেক না জানা কথা বেরিয়ে আসবে। তার মৃত্যুর অনেক পরে সেই কথা সত্য হয়েছে।
চার নেতার একজন এএইচএম কামরুজ্জামানের মেয়ের স্মৃতি থেকে
এএইচএম কামরুজ্জামান স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী চার নেতার একজন। তিনি ছিলেন আমার বন্ধু বন্দনার রুমি আপার বাবা। বন্দনার সেজদির বন্ধু ছিল রুমি আপা। সেজদির সঙ্গেই ও রুমি আপাদের বাসায় যেত। বারান্দায় ইজি চেয়ারে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত বসে থাকতেন রুমি আপার বাবা। কি যে শান্ত আর সৌম্য ছিল তার চেহারা!
একবার রুমি আপার এক খালার বিয়ে হলো ওনাদের বাসায়। দেশে তখন চরম খাদ্যাভাব চলছে বলে কিছুই রান্না করা হলো না। খুব হালকা খাবার দিয়ে বিয়ে পার করে দেওয়া হলো। রুমি আপা বলেছিলেন, 'বাবা চান না এসব হোক। দেশের লোক না খেয়ে আছে, আর আমরা ভালো-ভালো খাবার খাব, তা হয় না।'
জেলখানা থেকে ফেরত এলো খাবার
৩ নভেম্বর ১৯৭৫, জেলহত্যার সেই কাল দিন। মুহূর্তেই ওলট পালট হয়ে গেল রুমি আপাদের বাসার সব কিছু। বাবার জন্য জেলখানায় নিয়ে যাওয়া খাবার ফেরত এলো। রুমি আপা বলেছেন, জেলখানায় বাবার জন্য খাবার নিয়ে গিয়ে ফেরত আসতে হয়েছিল ৩রা নভেম্বর এবং এরপর তিন দিন। ৪ নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল ৩ তারিখেই; কিন্তু খাবার নিয়ে গেলে জেল কর্তৃপক্ষ বলত, তাদের জেল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তারা হত্যার কথাই যেখানে গোপন রাখল, সেখানে তো লাশ দেবার প্রশ্নই ওঠে না। লাশ দেওয়া হয়েছিল ৩ দিন পরে। আর এই ৩ দিনই বাবার জন্য কারাগারে ভাত নিয়ে গেছে– কিন্তু ফেরত এসেছিল প্রতিবারই।
এর কিছুদিনের মধ্যেই রুমি আপারা সেই সুন্দর বাড়িটা ছেড়ে চলে গেলেন ধানমন্ডিতে, একটা ভাড়া বাড়িতে, আর তারও কিছুদিন পর দেশের বাড়ি রাজশাহীতে।
কিছু প্রশ্ন, কিছু উত্তর
আমার বারবার মনে প্রশ্ন জেগেছে, কেন ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে মারা হলো? কেন ৩রা নভেম্বর জেলে ৪ নেতাকে হত্যা করা হলো? কেন ঐ একই তারিখে খালেদ মোশাররফ অভ্যুত্থান ঘটালেন এবং ৭ নভেম্বর কর্নেল আবু তাহের পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফাঁসিকাষ্ঠে প্রাণ দিলেন?
৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান নিয়েও আব্বার কাছ থেকে শোনা আরও কিছু তথ্য তুলে ধরার ইচ্ছা রয়েছে। কারণ, আমার দেখা ঐ গাড়িগুলোর যাতায়াতের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে ৭ নভেম্বরের আরও কিছু ইতিহাস, আরও কিছু উত্তর। এই সময়টাই বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অস্পষ্ট অধ্যায়। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে যে কালো অধ্যায় শুরু হয়েছিল, ৭ নভেম্বরে তা পূর্ণ রূপ পেল।
রেডিওতে ভেসে আসা মেজর ডালিমের কণ্ঠস্বর, তাদের অপকর্মের কথা জোর গলায় ঘোষণা- এসবই অস্বচ্ছ রাজনীতি। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর দুপুর ১১টার দিকে একজন আব্বাকে বলল রেডি হয়ে নিতে; কারণ, আব্বাকে নিতে গাড়ি পাঠানো হয়েছে। ততক্ষণে আমরা জেনে গেছি, বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। তার আশেপাশে যারা ছিলেন, তাদেরও এক-এক করে হত্যা করা হয়েছে। আম্মা চিৎকার করে আব্বাকে বলতে থাকলেন, 'ওরা তোমাকেও মেরে ফেলবে, ওরা জানে তুমি বঙ্গবন্ধুর লোক।'
বেলা ১২টার দিকে সেনাবাহিনীর একটি জিপ এসে আব্বাকে নিয়ে গেল। নিউকলোনির মানুষ যার যার বাসা থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়ল সেই দৃশ্য দেখার জন্য। চরম একটা অনিশ্চিত ও ভীতিকর অবস্থা। বাসায় সব কাজ বন্ধ। চারদিকে অসম্ভব থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এরপর প্রায় দেড় দিন চলে গেল, আব্বার কোনো খবর পেলাম না। আম্মার কাঁদতে কাঁদতে পাগল হওয়ার অবস্থা। সেই যে শুরু, সেই ষড়যন্ত্রের শেষ হয়নি আজো।
১০ বছর বয়সে আমি যা বুঝিনি, পরবর্তী সময়ে এর অনেকটাই বুঝেছি। বুঝেছি ইতিহাসে কালো অধ্যায় একবার যোগ হলে, তা বারবার ফিরে আসে। ১৯৭৫-এ সামরিক বাহিনীর সেই অপরাধকে যারা সমর্থন করেছিল, তারা নিজেরাই একদিন সেই জঘন্য কাজের বলি হলো। বারবার সামরিক অভ্যুথানে ক্ষত-বিক্ষত হলো দেশ ও দেশের মানুষ।
আমি এখনও বিশ্বাস করি এবং সারাজীবন বিশ্বাস করে যাব, ১৫ আগস্টের সেই হত্যাযজ্ঞ, ৩ নভেম্বরের জেলহত্যা বাংলাদেশকেই পরাজিত করেছে এবং এর জের আমাদের বয়ে বেড়াতে হবে। বিশ্বাসঘাতকদের শাস্তি মানুষ না দিলেও প্রকৃতি দেবেই।
- ৩ নভেম্বর ২০২০
- লেখক: সিনিয়র কোঅর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন
