‘নদী থেকে সমুদ্র’: ফিলিস্তিনিদের জনপ্রিয় এ স্লোগানের আসলে অর্থ কী?
চলমান যুদ্ ধপরিস্থিতিতে জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত মুক্তির আহ্বান জানানো একটি স্লোগান পশ্চিমা বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনিপন্থী বিক্ষোভকারীদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে স্লোগানটিকে হুমকি মনে করে এর ব্যবহার দমানোর প্রচেষ্টাও দেখা গিয়েছে।
গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচারে বোমাবর্ষণের বিরুদ্ধে ও যুদ্ধবিরতির পক্ষে বৈরুত থেকে শুরু করে লন্ডন, তিউনিস থেকে রোম পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হচ্ছে মিছিল ও বিক্ষোভ। সেখানে স্লোগান দেওয়া হচ্ছে, "নদী থেকে সমুদ্র, ফিলিস্তিন হবে মুক্ত।"
বিক্ষোভে ফিলিস্তিনের পতাকা উড়িয়ে সমর্থকেরা স্লোগানে স্লোগানে অঞ্চলটির মানুষের দীর্ঘ সময় ধরে মুক্তির যে আকাঙ্ক্ষা, সেটির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে। কিন্তু ইসরায়েল এবং তার সমর্থকগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে স্লোগানটিকে হামাসপন্থী হিসাবে অভিহিত করা হয়। একইসাথে এটির মধ্যে 'ইহুদিবিরোধী প্রচারণা' ও 'সহিংসতার সুযোগ' রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
তারই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টি গত সোমবার দেশটির পার্লামেন্ট সদস্য অ্যান্ডি ম্যাকডোনাল্ডকে বহিস্কার করেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ফিলিস্তিনের সমর্থনে এক সমাবেশে বক্তৃতায় 'নদী ও সমুদ্রের মধ্যে' শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছেন।
অন্যদিকে চলতি মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিব সুয়েলা ব্র্যাভারম্যান প্যালেস্টাইনপন্থী বিক্ষোভকে 'ঘৃণাত্মক মিছিল' হিসেবে অভিহিত করেছেন। একইসাথে সতর্ক করেন যে, স্লোগানটিকে 'ইসরায়েলকে নির্মূলের জন্য একটি সহিংস আকাঙ্ক্ষার ইঙ্গিত' হিসাবে মূল্যায়ন করা উচিত।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে স্লোগানটি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
অস্ট্রিয়ান পুলিশও অনেকটা একই অবস্থান নিয়েছে। স্লোগানটিকে কেন্দ্র করে দেশটিতে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করেছে। তাদের দাবি, স্লোগানটি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাসের প্রতিনিধিত্ব করে।
যদিও স্লোগানটি মূলত প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) কর্তৃক সর্বপ্রথম প্রচার করা হয়েছিল। অন্যদিকে জার্মান কর্তৃপক্ষ স্লোগানটিকে অপরাধমূলক হিসেবে বর্ণনা করে নিষিদ্ধ করেছে। এছাড়াও দেশটির রাজধানী বার্লিনের স্কুলগুলোতে ফিলিস্তিনের ঐতিহ্যবাহী স্কার্ফ (কেফিয়াহ) পরিধানে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
১৯৬৪ সালে ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে সৃষ্টি হয় পিএলও। সংগঠনটি একটি একক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়; যা জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত।
ফিলিস্তিন নিয়ে এই বিতর্কটি ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের আগ থেকেই শুরু হয়। সেক্ষেত্রে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এরও এক বছর আগে একসময়ে ব্রিটিশ অধিকৃত ৬২ ভাগ এলাকা নিয়ে একটি ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। একইসাথে পাশাপাশি একটি পৃথক ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র তৈরিরও পরিকল্পনা পেশ করা হয়। যদিও তৎকালীন আরব নেতারা এই প্রস্তাব অন্যায্য বলে অভিহিত করে প্রত্যাখ্যান করেন।
পরবর্তীতে ৭ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে নিজেদের বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল; যা ইতিহাসে নাকবা কিংবা 'বিপর্যয়' নামে পরিচিত। যদিও পরবর্তীতে পিএলও'র নেতারা দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের পথটিই মেনে নেন।
কিন্তু ১৯৯৩ সালে অসলো শান্তি প্রক্রিয়া এবং ২০০০ সালে ক্যাম্প ডেভিডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততায় চূড়ান্ত চুক্তির মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়। ফলে সৃষ্টি হয় দ্বিতীয় ইন্তিফাদা; যা ফিলিস্তিনিদের বিদ্রোহের দিকে পরিচালিত করে।
এদিকে ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি বিশ্লেষকেরা স্লোগানে 'মুক্ত' শব্দটি নানাভাবে ব্যাখ্যা করে মূল্যায়ন করেছেন। সেক্ষেত্রে লন্ডনের স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের আইনের প্রভাষক নিমার সুলতানি মনে করেন বিশেষণটি 'ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিনের সমস্ত বাসিন্দাদের জন্য সমতার প্রয়োজনীয়তা' প্রকাশ করে।
নিমার সুলতানি বলেন, "যারা বর্ণবাদ এবং ইহুদি আধিপত্যবাদকে সমর্থন করে, তারাই সমতাবাদী স্লোগানকে আপত্তিকর বলে মনে করবে।"
স্লোগানে মুক্ত বা স্বাধীন বলতে বোঝায় যে, ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটেন ইহুদিদের ফিলিস্তিনে একটি আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার যে অনুমতি দিয়েছে, সেটিকে অস্বীকার করা। একইসাথে এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের উপলব্ধি থেকে যে বঞ্চিত করা হয়েছে, সেটিকে সামনে নিয়ে আসা হয়।
নিমার সুলতানি বলেন, "এটি এখনও সমস্যার মূল কারণ। সবার মতো সমতা, স্বাধীনতা এবং মর্যাদা নিয়ে বসবাসের যে অধিকার ফিলিস্তিনের রয়েছে, তাদেরকে সেটি থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।"
গত শনিবারও কয়েক হাজার ফিলিস্তিনিপন্থী বিক্ষোভকারী বৃষ্টিভেজা লন্ডনের পথে পথে বিক্ষোভ করেছে। এতে যুক্ত ছিল বেশ কয়েকটি ইহুদি সংগঠনও। তাই বিক্ষোভটিকে ও বিক্ষোভে ব্যবহৃত স্লোগানটিকে ইহুদি বিরোধী বলে ঢালাওভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
নিমার সুলতানি বলেন, "এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, স্লোগানটি মূলত ইংরেজিতে। এটি আরবীতে বলা হয় না। মূলত এটি পশ্চিমা দেশগুলিতে বিক্ষোভে ব্যবহৃত হয়। পশ্চিমা বিশ্বে ফিলিস্তিনের পক্ষ যে জনমত গড়ে উঠেছে, সেটি ঠেকাতেই এই বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে।"
ইসরায়েলপন্থী বিশ্লেষকেরা অবশ্য মনে করেন, স্লোগানটির একটি নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এ সম্পর্কে জেরুজালেম-ভিত্তিক রাবায় (ইহুদি ধর্মীয় নেতা) এবং ব্র্যান্ডেইস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইহুদাহ মিরস্কি বলেন, "ইহুদি ইসরায়েলিদের কাছে স্লোগানটির মানে হলো, জর্ডান নদী ও ভূমধ্যসাগরের মধ্যে শুধু একটি সত্তা থাকবে, সেটিকে বলা হবে ফিলিস্তিন। সেখানে কোনও ইহুদি রাষ্ট্র থাকবে না। এক্ষেত্রে যে সত্তার উদ্ভব হবে তাতে ইহুদিদের অবস্থান কেমন হবে সেটা স্পষ্ট নয়।"
ইহুদাহ মিরস্কি আরও বলেন, "এটি মুক্তির প্রতিশ্রুতির চেয়ে বরং অনেক বেশি হুমকির মতো শোনাচ্ছে। এটি এমন কোনো ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয় না যেখানে ইহুদিরা ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারবে এবং নিজেদের মতো করে থাকতে পারবে।"
মিরস্কি মনে করেন, যারা স্লোগানটি ব্যবহার করছে তারা 'হামাসের সমর্থক'। অন্যদিকে সুলতানি মনে করেন, ফিলিস্তিনিপন্থী বিক্ষোভকারীদের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সমর্থকদের সাথে তুলনা করা উচিত নয়।
অন্যদিকে বরখাস্ত হওয়া লেবার পার্টির সদস্য ম্যাকডোনাল্ড বলেন, "ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা শান্ত হব না। যতক্ষণ না নদী ও সাগরের মাঝের সমস্ত মানুষ, ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিরা শান্তিপূর্ণভাবে ও স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারে।"
তবে দেশটির লেবার পার্টির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, অভিযুক্ত ব্রিটিশ এমপি ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধ সম্পর্কে 'গভীর আক্রমণাত্মক' মন্তব্য করেছেন। যদিও ম্যাকডোনাল্ড অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানান, তার কথাগুলি শুধুই এই অঞ্চলে 'হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার জন্য আন্তরিক আবেদন' হিসাবে বলা হয়েছিল।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রক্ষণশীল ও জাতীয়তাবাদী ভাবধারার লিকুদ পার্টিও স্লোগানটির ঘোর বিরোধিতা করেছে। কেননা তারা ইসরায়েলের ভূমিতে ইহুদি জনগণের 'বাইবেল প্রদত্ত অধিকার' আছে বলে নীতিতে বিশ্বাস করে।
লিকুদ পার্টির ১৯৭৭ সালে প্রবর্তিত মূল ম্যানিফেস্টোতে বলা হয়েছে, "সাগর ও জর্ডানের মাঝখানে থাকবে শুধু ইসরায়েলি সার্বভৌমত্ব।" একইসাথে ম্যানিফেস্টোতে আরও বলা হয়, "একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ইহুদি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে।"
যুক্তরাজ্যে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত জিপি হোটোভেলি নদী থেকে সমুদ্র পর্যন্ত অঞ্চলে ইহুদিদের ঐতিহাসিক দাবির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আদায়ে কাজ করা প্রবর্তকদের মধ্যে একজন।
এরই ধারাবাহিকতায় দখলকৃত পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমে ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলি সরকার দ্বারা বসতি স্থাপনকে- ইসরায়েলের জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত ভূমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা- হিসেবে দেখা হচ্ছে। একইসাথে এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য ফিলিস্তিনিদের যে আকাঙ্ক্ষা, সেটি পুরোপুরিভাবে অস্বীকার করে।
ইহুদাহ মিরস্কি মনে করেন, ইসরায়েলি বিখ্যাত বহু ব্যক্তিই বিতর্কিত পুরো অঞ্চলে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব জারির জন্য বাইবেলেকে ব্যবহার করছেন। যদিও আধুনিক ইসরায়েলের ধারণার সাথে প্রসঙ্গটি 'চরমভাবে বিতর্কিত'।
মিরস্কি মনে করেন, বিভাজনের দিকে না যেয়ে বরং সমস্যাটির সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা উচিত। তিনি বলেন, "আসুন, সকলে মিলে বসি। আমরা এমন উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করি যা কার্যত ইহুদি এবং আরবদের জীবনকে আরও সহজ করে তুলবে। একইসাথে একটি নতুন স্লোগান নিয়ে আসি যা সকলকে মধ্যে বিভাজন তৈরি না করে মেলবন্ধন সৃষ্টি করবে।"
