‘প্রতিদিন ডজন ডজন সৈন্য মারা পড়ে’ - ইউক্রেনের ক্ষয়ক্ষতি এখনও ব্যাপক
ইউক্রেনীয় সেনা নিহত হওয়ার সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। নাম না প্রকাশ করে, যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন কর্মকর্তা নতুন একটি হিসাবের সূত্রে একথা জানিয়েছেন। ইউক্রেনের পূর্ব রণাঙ্গনে নিহতের সংখ্যার হিসাব রাখা নিত্যদিনের রুটিনে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে সেখানে যান বিবিসির সাংবাদিক কুইন্টিন সামারভিল। খবর বিবিসির
সামারভিল অকুস্থলে যা দেখেছেন, তারই বিবরণ এখানে তুলে ধরা হলো–
দনেয়স্কে যুদ্ধের সম্মুগভাগের অদূরেই ছোট্ট একটি মর্গ– এখানে অজ্ঞাত ইউক্রেনীয় সেনাদের মরদেহ স্তূপ করে রাখা হয়েছে। মর্গের কর্মী ২৬ বছরের তরুণী মার্গো। নিহতদের বিবরণ লিখে রাখাই তার কাজ। মর্গের ভারি দরজার বাইরে তার ডেস্ক, টেবিলে কাগজপত্রের এলোমেলো অবস্থা।
মার্গো জানান, তিনি মৃতদের উদ্দেশ্যে কথা বলেন। তার ভাষ্য, 'শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও আমি তাদের মৃত্যুর জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করি। কোনো না কোনোভাবে তাদের ধন্যবাদ জানাতে চাই। আমার মনে হয়, তারা সব শুনতে পায়, শুধু উত্তর দিতে পারে না।'
যুদ্ধ নিহত সেনাদের সঠিক সংখ্যা প্রকাশ করে না ইউক্রেন। দেশটির সামরিক বাহিনী বার বার বলেছে, যুদ্ধের হতাহতের সংখ্যা রাষ্ট্রের গোপনীয় তথ্য। কিন্তু, মার্গো জানেন, এই সংখ্যা বিপুল।
কিয়েভের পক্ষ থেকে রাখঢাক থাকলেও, বিভিন্ন সময় পশ্চিমা গণমাধ্যম তা জানার চেষ্টা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তত ৭০ হাজার নিহত এবং প্রায় এক লাখ ২০ হাজার ইউক্রেনীয় সেনা আহত হয়েছে।
যে দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য সংখ্যা মাত্র ৫ লাখ, তাদের মধ্যে এত হতাহতের এই সংখ্যা সত্যিই হতভম্ব করে দেয়। সে তুলনায়, এপর্যন্ত মাত্র ৯ হাজার ১১৭ বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করেছে জাতিসংঘ।
মার্গো পরেছিলেন কালো রঙের টি-শার্ট। ইংরেজিতে যেখানে লেখা 'আই অ্যাম ইউক্রেনিয়ান'। হাতের নখগুলোয় ইউক্রেনীয় পতাকার রঙ। তার বাম কব্জির পেছন দিকে এক মা ও শিশুর উল্কি আঁকা, তার সন্তানের জন্মতারিখও রয়েছে ট্যাটুতে। আর একজন মা হিসেবেও অন্য কারো সন্তান হারানোর বেদনাকে উপলদ্ধি করেন মার্গো।
বলেন, 'বয়স ২০ বা ২২ বছরও হয়নি, এমন তরুণদের মরদেহ চোখে দেখে সহ্য করাটা সবচেয়ে কঠিন। আরো বেদনাদায়ক এই কারণে স্বাভাবিক মৃত্যুও তাদের কপালে জোটেনি। তাদের হত্যা করা হয়েছে। নিজ দেশের মাটিতেই তাদের হত্যা করা হয়েছে। এটাই সবচেয়ে কষ্টের। এর সাথে মানিয়ে নেওয়া যায় না। এবার তাদের প্রিয়জনদের কাছে ফিরতে সাহায্য করাটাই আমার দায়িত্ব।'
মার্গোর স্বামী ২৩ বছরের আন্দ্রি, ২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর এক যুদ্ধে তিনি নিহত হন। ওইদিনই তার মরদেহ মর্গে আনা হয়। কর্মস্থলে এটাই ছিল মার্গোর সবচেয়ে কষ্টের দিন।
মার্গো সেদিনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'সে মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে মারা গেছে। কিন্তু, তারপরও মেনে নিতে পারছিলাম না। নিজেকে হাজারো বার এই বলে বুঝিয়েছি, মৃতদের সাহায্য করতে আমার এখানে থাকা দরকার।'
মার্গোর দাবি, মর্গের চাকরি তাকে ইস্পাতের মতো দৃঢ় করেছে। তাই মর্গে আনা মৃতদেহগুলো দেখে যতই কষ্ট হোক, কখনোই কারো সামনে কাঁদেন না।
'সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার আগপর্যন্ত সব কষ্ট বুকে চেপে রাখি, যাতে কেউ আমার অশ্রু দেখতে না পায়'- বলেন তিনি।
এদিকে গত এপ্রিলেও সাড়ে ১৭ হাজার ইউক্রেনীয় সেনা নিহত হওয়ার তথ্য জানা যায় পেন্টাগনের ফাঁস হওয়া নথির সূত্রে। সেখান থেকে খুব দ্রুতই নিহতের সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার পেছনে সম্ভবত ভূমিকা রাখছে দক্ষিণে ইউক্রেনের পাল্টা-আক্রমণ অভিযান।
এই অভিযানের শুরুটা বিশেষত ইউক্রেনের পদাতিক সেনাদের জন্য এক অগ্নি-পরীক্ষা ছিল বলে জানান সেখানে যুদ্ধরত একটি ব্রিগেডের কমান্ডার। তার মতে, 'পরিস্থিতি ছিল বাখমুতের চেয়েও ভয়াবহ'।
প্রসঙ্গত, দনেয়স্ক অঞ্চলের এই শহর গত মে মাসে রুশ সেনারা দখল করে। ইউক্রেন যুদ্ধে এপর্যন্ত সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ছিল বাখমুতের লড়াই।
সেনাদের প্রাণহানি কমাতে এই অঞ্চলে ইউক্রেন কৌশল পাল্টেছে। কিন্তু, তারপরও জুনের শুরুতে রুশ বাহিনীর প্রতিরোধ ব্যূহ ভেদ করতে গিয়ে চরম মূল্য চুকাতে হয়েছে। বিশেষত সদ্য প্রশিক্ষিত তরুণ সেনারা অকাতরে প্রাণ দিয়েছে।
দনেয়স্কের ভেলিকা নভোসিলকা গ্রামের এলাকায় যুদ্ধরত একজন সিনিয়র সার্জেন্ট গত জুনে বিবিসির সামারভিলকে জানান, 'প্রতিদিন ডজনে ডজন' নতুন সেনারা নিহত হচ্ছে।
নিহতদের মৃতদেহ রাখতে ফ্রন্টলাইনের অদূরে অনেক মর্গ গড়ে তোলা হয়েছে। মর্গের কর্মীরা সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা নিহত সেনাদের নাম-পরিচয় শনাক্ত করার কাজ করেন।
মার্গো যেখানে কাজ করেন, সেই মর্গের বাইরেও বডিব্যাগে ভরা লাশগুলো আসতেই, এক এক করে তাদের পরিচয় জানতে তল্লাশি শুরু হয়। প্রথম বডিব্যাগের ভেতরে ছিল এক তরুণের মরদেহ, তার চোখ দুটি তখনও খোলা, হাতগুলো ভাঁজ করে কোলের ওপরে রাখা হয়েছে। চেহারা কেটে গেছে, এক পায়ে গভীর ক্ষত।
আরেকটি লাশের ডান হাতের কোনো আঙ্গুল নেই, রক্ত ও যুদ্ধক্ষেত্রের কাদায় মাখামাখি ইউনিফর্ম।
মর্গের কর্মীরা দ্রুত মরদেহগুলোর পকেট কেটে তল্লাশি শুরু করেন। ভেতরে পাওয়া যায়- কিছু চাবি, মুঠোফোন, পারিবারিক ছবি থাকা ওয়ালেট ইত্যাদি। এসব ছোটখাট জিনিসই নিহতদের শনাক্ত করতে এবং এরপর তাদের মরদেহ পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করে।
আরেকটি বডিব্যাগের ওপর কালো মার্কার কলমে লেখা ছিল 'অজ্ঞাতপরিচয়'- কিন্তু পরে তার পরিচয় নিশ্চিত হতে পেরে মর্গের কর্মীরা তা মুছে ফেলে সেখানে নিহতের নাম, কোন কোম্পানির সেনা ছিলেন তা লিখে দেন। এভাবে আরো বডিব্যাগ আসে, কিন্তু এবিষয়ে সংবাদ প্রকাশে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ কিছু শর্ত দেওয়ায় সামারভিল সেই সংখ্যা উল্লেখ করেনি।
পরিচয় শনাক্তে কমান্ডাররাও সাহায্য করেন। সামারভিল সেখানে অবস্থান করার সময়েই পিকআপ ট্রাকে মর্গে আসেন একদল কমান্ডার। মরদেহগুলো দেখে তারা জানান, নিহত ব্যক্তি তাদের প্লাটুন, কোম্পানি বা ব্যাটালিয়নের সদস্য ছিলেন কিনা। এমনই একটি মৃতদেহ তারা পরীক্ষা করছিলেন, দেখে মনে হচ্ছিল কামানের গোলায় সে নিহত হয়েছে। তার মাথার একটি অংশ উড়ে গেছে, শরীরের ক্ষতগুলোও মারাত্মক। শবদেহ উল্টানোর পর আরো ভয়াবহ অবস্থা দেখা যায়।
'অ্যাভোকাট' (সাংকেতিক নাম বা কল সাইন) নামের একজন ডেপুটি ব্যাটালিয়ন কমান্ডার বলেন, 'অপ্রীতিকর এই কাজ করা সহজ নয়। কিন্তু, এটা আমার দায়িত্বেরই অংশ। ছেলেগুলোকে যথাযথ বিদায় তো জানাতেই হবে।'
তিনি জানান, তার ইউনিটের আরো অনেক নিহতকে এখানে শনাক্ত করার জন্য আনা হবে।
ইউক্রেনের গোরস্তানগুলো মৃতদের এই মিছিলের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। বিবিসির সাংবাদিক কুইন্টিন সামারভিল এমন একটি গোরস্তানেই যান এরপর।
নিপ্রো অঞ্চলের ক্রাসনোপিলস্ক গোরস্তানের দিগন্তে তখন শেষ বিকেলের সূর্য। চোখে পড়ে অনেকগুলো নতুন কবর, ধীরে ধীরে তাদের মিছিল যেন সীমানা প্রাচীরের দিকে এগিয়ে আসছে। নতজানু সুর্যমুখী ফুলগুলো যেন শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।
এমনই একটি কবরের পাশে একা একা কাঁদছিলেন ৩১ বছরের যুবতী ওকসানা। এই কবরে সমাহিত তার স্বামী পাভেল। পার্সোনাল ট্রেইনার এবং ভারোত্তলনে চ্যাম্পিয়ন পাভেল ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন জুনিয়র সার্জেন্ট। এর আগে ইউক্রেন যে কাউন্টার-অফেন্সিভ চালায়, তখন নভেম্বর মাসে ইঝিউম শহরের কাছে রুশ হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া মিসাইলে নিহত হন পাভেল।
ওকসানা বলেন, সে দেশকে রক্ষা করতে স্বেচ্ছায় যুদ্ধে যোগ দেয়। অন্তর থেকেই সে ছিল একজন যোদ্ধা– স্বাধীনতাপ্রেমী। ও ছিল আমাদের ইউক্রেনীয় চেতনারই প্রতিচ্ছবি।'
রাশিয়ান মিসাইলটি পাভেলদের কনভয়ে আঘাত হানে, এতে তিনিসহ আরো অনেকে নিহত হন। কিন্তু, পাভেল ও তার সহযাত্রীদের মৃতদেহ এতটা ভয়াবহভাবে পুড়ে যায় যে, তাদের শনাক্ত করতে দীর্ঘদিন লেগে যায়। অবশেষে শরীরে থাকা একটি ট্যাটু দেখে পাভেলকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এরপর ক্রাসনোপিলস্ক গোরস্তান হয়েছে তার শেষ ঠিকানা।
এখানে পাভেলের মতো আরো অনেক সেনা সমাহিত, প্রতিটি কবরের ওপর মৃদু বাতাসে উড়ছিল হলুদ ও নীল রঙা ইউক্রেনের পতাকা। এমন পতাকা শত শত। পূর্ব ও দক্ষিণ রণাঙ্গনে ইউক্রেনের বিপুল সেনা নিহত হওয়ার প্রতীক এগুলো। যাদের শব দেশটির শহর ও গ্রামগুলোর গোরস্তানগুলো ভরিয়ে দিচ্ছে।
টানা দেড় বছরের এই যুদ্ধের আগুনে প্রিয়জন হারায়নি ইউক্রেনে এমন পরিবার খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর। তারপরও লড়তে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ অনেকেই।
যেমন ওকসানা ও পাভেল প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, পাভেল মারা গেলে ওকসানা সেনাবাহিনীতে যোগ দেবেন। কথা রেখেছেন ওকসানা, বাখমুতের উপকন্ঠে মোতায়েন একটি ড্রোন নজরদারি ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
সামারভিলের সাথে আলাপের এক সপ্তাহ পরেই বর্ডি-আর্মারে সজ্জিত ওকসানা যুদ্ধের আরো সম্মুখভাগে রওনা হন। তার ইউনিটের দায়িত্ব ইউক্রেনীয় সাঁজোয়া বাহিনীর ওপর হামলা চালানো – রাশিয়ার একটি অ্যান্টি-ট্যাংক ইউনিটের সন্ধান।
ওকসানা পরে জানান, আমরা যখন সেখানে পৌঁছেছিলাম, তখন অবিরাম গোলাবর্ষণের আওয়াজে বধির হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা ছিল।
কেন নিজেকে বিপদের মুখে ঠেলে দিলেন– সামারভিলের এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এটা আমার নৈতিক দায়িত্ব।
'সে (পাভেল) যে কাজ শুরু করেছিল, আমাকে তা চালিয়ে যেতে হবে। যাতে ওর চেষ্টাগুলো বিফলে না যায়। স্বেচ্ছাসেবী হয়ে বা অনুদান দিয়ে অনেকেই সাহায্য করছে, আর সেটা ভালোও– কিন্তু আমি এই লড়াইয়ের, ভবিষ্যতে আমাদের বিজয়ের অংশ হতে চেয়েছি।'
এদিকে ইউক্রেনের উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হান্না মালিয়ার সম্প্রতি এক বিবৃতি জারি করে সতর্ক করেছেন যে, যারা যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করবে– তাদের ফৌজদারি আইনে বিচার করা হবে।
তথ্যের এই গোপনীয়তা কেন? – জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায়, শত্রুপক্ষ আমাদের হতাহতের সংখ্যা জানলে, এরপর আমরা কী পদক্ষেপ নেব– তার হিসেবনিকেশ করতে পারে। যদি শত্রুর কাছে এই তথ্য থাকে, তাহলে তারা আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ আগে থেকেই বুঝতে পারবে।'
