দিল্লিতে ককরোচ পার্টির বিক্ষোভ অব্যাহত; ‘ষড়যন্ত্রের’ খোঁজে পুলিশের মামলা; আলোচনার আশ্বাস শিক্ষামন্ত্রীর
ভারতের নিট পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের অভিযোগে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তরে 'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি)-র বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। এই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লির সংসদ ভবন এবং রফি মার্গসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের ব্যাপক ব্যারিকেড ও কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখা হয়েছে।
গত সোমবার সিজেপি-র বিক্ষোভ মিছিলের সময় সহিংসতা এবং ভাঙচুরের অভিযোগে পার্লামেন্ট স্ট্রিট, কনট প্লেস এবং অন্যান্য থানায় এ পর্যন্ত মোট ছয়টি এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, পুলিশ এই ঘটনার পেছনে কোনো 'বৃহৎ এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র' রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখতে পারে। এদিকে, পুলিশ বিক্ষোভ মঞ্চ ভেঙে দেওয়ার এবং এলাকাটি খালি করার পর গত সোমবার সন্ধ্যায় আন্দোলনকারীরা আবারও যন্তর মন্তরে ফিরে এসে সেখানে অবস্থান নেন।
অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ এবং কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রকে আটকের প্রতিবাদে কেরালা, জম্মু ও কাশ্মীর এবং আসামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কংগ্রেসের বিভিন্ন ইউনিট বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। গত মঙ্গলবার রাহুল, প্রিয়াঙ্কা এবং অন্যান্য কংগ্রেস নেতারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরে বিক্ষোভ দেখান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের বাইরে ধরনায় বসার কারণে সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবকেও আটক করা হয়।
দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশে সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে মেদান্ত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে, তবে সেখানেও তিনি তার আমরণ অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএনআই জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং এবং কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জগৎ প্রকাশ নাড্ডা গুরুগ্রামের ওই হাসপাতালে গিয়ে তার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন।
'চলো সংসদ' মিছিলে পুলিশি অ্যাকশন, আহত ও আটক বহু
গত সোমবার 'চলো সংসদ' বিক্ষোভ মিছিল থেকে অন্তত ৭০ জন আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়। এরপর সিজেপি, আম আদমি পার্টি (আপ) এবং অন্যান্য দলগুলো আটক হওয়া ছাত্র আন্দোলনকারীদের বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
সংসদ অভিমুখে যাত্রার এই ডাকে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার আন্দোলনকারী সমবেত হন। তবে দিল্লি পুলিশ এই মিছিলের অনুমতি দেয়নি এবং বিএনএসএস-এর ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে ব্যারিকেড, মেট্রো স্টেশন বন্ধ এবং মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ থাকা সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীরা যন্তর মন্তরে সমবেত হন এবং সেখান থেকে সংসদের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন।
হিন্দুস্তান টাইমস-এর আগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুপুরের মধ্যে কনট প্লেস, প্যাটেল চক, রাইসিনা রোড, ইন্ডিয়া গেট এবং অশোকা রোড রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। এতে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী আহত হন এবং তাদের লেডি হার্ডিঞ্জ ও আরএমএল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
আহত এক নারী আরএমএল হাসপাতালের আইসিইউ-তে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, এই সংঘর্ষের ঘটনায় তাদের ১১৮ জন সদস্য আহত হয়েছেন। পুলিশের দাবি, বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ও অন্যান্য জিনিস ছুড়ে আক্রমণ করে এবং তাদের আচরণ অত্যন্ত 'উচ্ছৃঙ্খল' ও সহিংস ছিল।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরে কংগ্রেসের এই বিক্ষোভের তীব্র সমালোচনা করেছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। তিনি দাবি করেন, সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনে 'বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার' করছে কংগ্রেস।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে প্রধান বলেন, 'শ্রী রাহুল গান্ধী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরে ধরনায় বসার পথ বেছে নিয়েছেন, যা জনগণের জন্য ভোগান্তির সৃষ্টি করেছে এবং নির্ধারিত নিরাপত্তা প্রটোকলকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছে।'
তিনি অভিযোগ করেন, সরকার আলোচনার জন্য প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেস 'গণতান্ত্রিক আলোচনার চেয়ে রাজনৈতিক প্রদর্শনীকে' প্রাধান্য দিয়েছে। প্রধান বলেন, 'রাহুল গান্ধীর কাছে এটি শিক্ষার্থীদের বিষয় নয়। আলোচনার সমস্ত সৎ পথ উন্মুক্ত করার পরও এটি মূলত সংঘাত সৃষ্টি করার একটি অপচেষ্টা।'
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আরও বলেন, সরকার 'সংসদ কক্ষে নিট নিয়ে আলোচনা করতে এবং আমাদের তরুণদের প্রতিটি যৌক্তিক উদ্বেগের সমাধান করতে শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ'। তিনি আরও যোগ করেন, শিক্ষার্থীরা 'কোনো রাজনৈতিক প্রচারণার অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার চেয়ে আরও অনেক বেশি ভালো আচরণ পাওয়ার যোগ্য।'
এর আগে গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও এই ইস্যুতে প্রথমবারের মতো মুখ খোলেন। তিনি প্রশ্ন ফাঁসের পেছনে জড়িতদের কঠোর শাস্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন এবং একটি ত্রুটিহীন পরীক্ষা পদ্ধতি গড়ে তুলতে তাঁর দলের সংসদ সদস্যদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
পরীক্ষা নিয়ে তরুণদের এই ক্ষোভ ও আন্দোলন নরেন্দ্র মোদির তৃতীয় মেয়াদের সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। সিজেপি-র এই দ্রুত জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি মূলত ভারতের যুবসমাজের কর্মসংস্থানের অভাব এবং বারবার প্রশ্ন ফাঁসের মতো ঘটনার প্রতি পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই প্রতিফলন। এটি বিরোধী দলগুলোকেও মোদি এবং তার দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ওপর চাপ সৃষ্টির একটি বড় সুযোগ করে দিয়েছে। অথচ তরুণ ভোটারদের নিজেদের মূল ভিত্তি মনে করা বিজেপি ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ার পরও বেশ কয়েকটি রাজ্য নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল।
গত মঙ্গলবার রাতে দিল্লির একটি স্টেডিয়ামে বন্দি থাকা অবস্থায় রেকর্ড করা এক ভিডিও বার্তায় রাহুল গান্ধী বলেন, 'কেন ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে? কেন প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে? ভারতে শিক্ষা এত ব্যয়বহুল কেন? কেন পরিবারগুলোকে তাদের সন্তানদের শিক্ষিত করতে গিয়ে আর্থিকভাবে ধ্বংস হতে হচ্ছে?'
তিনি আরও বলেন, 'এগুলো খুবই যৌক্তিক প্রশ্ন। আর এই প্রশ্নগুলো করার মধ্যে কোনো ভুল নেই।'
রাহুল গান্ধী দাবি করেন, বুধবার সংসদ অধিবেশনে শিক্ষার্থীদের এই সমস্যাগুলো নিয়ে বিতর্ক হওয়া উচিত এবং গত সোমবার শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি অ্যাকশনের জন্য নরেন্দ্র মোদির ক্ষমা চাওয়া উচিত। একই সাথে পরীক্ষা ও শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার যত দ্রুত সম্ভব শুরু করার দাবি জানান তিনি।
এই সিজেপি আন্দোলনটি সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের সমর্থনে আরও গতি পায়। তিনি গত ২৮ জুন থেকে আমরণ অনশন শুরু করেছিলেন, তবে গত শনিবার পুলিশ তাকে জোরপূর্বক একটি হাসপাতালে নিয়ে যায়। গত মঙ্গলবার তার স্ত্রীর দায়ের করা একটি পিটিশনের প্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তার স্ত্রীর অভিযোগ ছিল, ওয়াংচুককে বেআইনিভাবে হাসপাতালে আটকে রাখা হয়েছিল।
