‘মোদিরও পদত্যাগ চাই’: ভারতের সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রা করতে ‘ককরোচ পার্টি’র সদস্যদের অবস্থান
ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের দাবিতে 'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি)-র ডাকে দেশটির সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রায় অংশ নিতে জড়ো হয়েছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী, অভিভাবক, অধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। ভারতের রাজধানী দিল্লির প্রতিবাদ স্থলটি এখন আন্দোলনকারীদের স্লোগানে উত্তাল এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে কয়েক শত পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
গত শনিবার দিল্লির মঞ্চে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যখন সিজেপির সমর্থনে টানা ২১ দিন ধরে আমরণ অনশনে থাকা বিশিষ্ট অধিকারকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুককে জোরপূর্বক হাসপাতালে নিয়ে যায় পুলিশ। তবে হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থাতেও তিনি তার অনশন অব্যাহত রেখেছেন।
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, আন্দোলনকারীদের এই সংসদ অভিযানের কোনো অনুমতি নেই। তবে সিজেপির একজন মুখপাত্র বিবিসি-কে বলেছেন, অনুমতি না থাকলেও তারা পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী পদযাত্রা এগিয়ে নিয়ে যাবেন।
অভিজিৎ দিপকের হাত ধরে গত মে মাসে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে একটি অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন হিসেবে 'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি) আত্মপ্রকাশ করে। অত্যন্ত দ্রুতই এটি তরুণ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। প্রথম থেকেই তারা ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আসছে।
গত শনিবার পুলিশের এই বলপ্রয়োগের পর সিজেপি এখন শিক্ষামন্ত্রীর পাশাপাশি খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিরও পদত্যাগ দাবি করেছে। অভিজিৎ দিপক বলেন, 'এত দিন আমরা ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করছিলাম, কিন্তু পুলিশের এই ঘৃণ্য আচরণের পর আমরা এখন নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগ দাবি করব।'
শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান অবশ্য সিজেপি এবং তাদের সমর্থকদের 'উচ্ছৃঙ্খল ও ধ্বংসাত্মক চক্রের বি-টিম' বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারও এখন পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনায় বসেনি।
গত সোমবার সকালে দিল্লির ৩০০ বছরের পুরোনো মানমন্দির ও ঐতিহাসিক আন্দোলনস্থল 'যন্তর মন্তর'-এ ছিল এক উৎসবমুখর ও প্রাণবন্ত পরিবেশ। মুষলধারে বৃষ্টিও শত শত আন্দোলনকারীর মনোবল দমাতে পারেনি। তাদের অনেকেই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সমানে স্লোগান দিচ্ছিলেন। আন্দোলনকারীদের অনেকের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা, আবার কেউ কেউ শান্তির প্রতীক হিসেবে প্লাস্টিকের গোলাপ ফুল বহন করছিলেন।
সমাবেশকে কেন্দ্র করে যন্তর মন্তর এলাকায় শত শত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং সভাস্থলের দিকে যাওয়া সব কটি রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পুরো শহর জুড়েই প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে ব্যারিকেড দিয়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
ওয়াংচুককে জোরপূর্বক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর নিজের আমরণ অনশনের ঘোষণা দেওয়া সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপক যন্তর মন্তরের মঞ্চে এক হাতে ভারতের জাতীয় পতাকা এবং অন্য হাতে সংবিধানের কপি নিয়ে অবস্থান করছেন। বিশাল এই জনসমুদ্রকে 'সিজেপির প্রথম বিজয়' বলে অভিহিত করেন তিনি।
তিনি অবিলম্বে সোনম ওয়াংচুককে হাসপাতাল থেকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন যাতে তিনি এই পদযাত্রায় যোগ দিতে পারেন। ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আঙমো-ও এই পদযাত্রায় অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
সোনম ওয়াংচুক জানিয়েছেন, সরকার যদি 'শিক্ষাব্যবস্থার সাম্প্রতিক ব্যর্থতার দায়' স্বীকার করে; অথবা তিনি ও সিজেপি নেতৃবৃন্দ সংসদে পৌঁছালে সংসদ সদস্যরা যদি তাদের এই বিষয়টি সংসদে উত্থাপনের আশ্বাস দেন; কিংবা আইনপ্রণেতারা হাসপাতালে এসে তাকে এই বিষয়ে নিশ্চিত করেন—তবেই কেবল তিনি তার অনশন ভাঙবেন।
দিল্লির পাশাপাশি মুম্বাই, বেঙ্গালুরু এবং হায়দরাবাদেও এই আন্দোলনের সমর্থনে ব্যাপক বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত রবিবার মুম্বাই শহরে একটি বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় এবং আজ সোমবারও সেখানে আরেকটি বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে।
দিল্লির তীব্র দাবদাহের মধ্যে ওয়াংচুকের এই আমরণ অনশন দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। টানা ২১ দিন অনশন করায় তার শরীরের ওজন ৯ কেজিরও বেশি কমে গেছে। শারীরিক এই চরম অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি সংসদ অভিযানে অংশ নেওয়ার বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন।
কিন্তু গত শনিবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৭টার দিকে একদল পুলিশ বিছানার চাদর দিয়ে চারপাশ থেকে ঢেকে দিয়ে জোরপূর্বক তাকে অনশন মঞ্চ থেকে তুলে নিয়ে যায়।
মূলত প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে ভারতের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বাতিল হওয়ার পর থেকে সিজেপি এই আন্দোলন শুরু করে।
গত মে মাসের শুরুতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা (নিট পরীক্ষা) প্রশ্ন ফাঁসের কারণে বাতিল করা হয়েছিল, যার ফলে পরীক্ষা দেওয়া প্রায় ২২ লাখ ৮০ হাজার (২.২৮ মিলিয়ন) পরীক্ষার্থী চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন। পরবর্তীতে গত ২১ জুন আবার পরীক্ষা নেওয়া হলেও, তত দিনে হতাশা ও মানসিক ট্রমার কারণে ২০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে প্রাণ হারিয়েছেন বলে দাবি করেছে তাদের পরিবার।
