হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ কোন দিকে: তিন সম্ভাব্য সমীকরণ
ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদের রয়েছে এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য —এটি শান্তিকে যতটা স্থায়ী ও সুপ্রতিষ্ঠিত দেখায়, বাস্তবে তা ততটা হয় না। বিশ্বনেতারা যখন শেষবার এই স্থানটি ছেড়েছিলেন, তখন তারা নিশ্চিত ছিলেন যে একটি বৈশ্বিক সংঘাতের অবসান ঘটাতে পেরেছেন। কিন্তু তাদের সেই শান্তি টিকেছিল মাত্র ২০ বছর, যা পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়। ঠিক একইভাবে, একই প্রাসাদে গত ১৭ জুনে ইরানের সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি (এমওইউ) টিকেছিল মাত্র তিন সপ্তাহ।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই চুক্তিকে "সম্পন্ন" ঘোষণা করেছিলেন এবং বিশ্বের সব বাণিজ্যিক জাহাজকে তাদের "ইঞ্জিন চালু করার" বার্তা দিয়েছিলেন। কিন্তু এর ঠিক তিন সপ্তাহ পর, আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে মিত্র দেশগুলোর নেতাদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেন যে সেই যুদ্ধবিরতি "শেষ"। কারণ, ইরান তাদের নির্ধারিত রুট বা পথ অনুসরণ করতে অস্বীকৃতি জানানো জাহাজগুলোর ওপর পুনরায় হামলা শুরু করেছে। তবে মনে রাখা দরকার, এই সমঝোতা স্মারকটি কেবল কোনো পক্ষের অসততার কারণে ব্যর্থ হয়নি। এটি ব্যর্থ হয়েছে কারণ ইরান যুদ্ধের মূল কেন্দ্রে থাকা বিরোধটি এখনো অমীমাংসিত: ইরান বিশ্বাস করে, এই জলপথ বন্ধ করার মাধ্যমে তারা হরমুজ প্রণালি পরিচালনা এবং সেখান দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের ওপর টোল বা শুল্ক আদায়ের বৈধ অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র জোর দিয়ে বলছে যে এটিকে অবশ্যই একটি মুক্ত আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে রাখতে হবে। আর দুই পক্ষের কারো কাছেই অন্য পক্ষকে নিজের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করার কোনো সুস্পষ্ট উপায় আপাতত নেই।
হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে সুরক্ষা দিতে মার্কিন নৌবাহিনীর প্রচেষ্টা 'প্রজেক্ট ফ্রিডম' থেকে শুরু করে এই সমঝোতা স্মারক পর্যন্ত সব উদ্যোগের ব্যর্থতার পেছনের কারণ আমেরিকার দ্বিধা বা ইরানের অসততা নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে এমন এক ভৌগোলিক বাস্তবতা, যা কূটনীতি বা সামরিক শক্তি—কোনো কিছু দিয়েই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। হরমুজ প্রণালির উত্তরের সম্পূর্ণ উপকূলরেখা ইরানের নিয়ন্ত্রণে। এর অর্থ হলো, ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজও বন্দর ছেড়ে না এসে কেবল উপকূলীয় মিসাইল স্থাপনা, সশস্ত্র স্পিডবোট এবং হাজার হাজার মাইনের মজুদের মাধ্যমে এই প্রণালি দিয়ে পার হওয়া যেকোনো জাহাজের ওপর আঘাত হানতে পারে। সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে এই প্রণালি ফের খুলে দিতে চাইলে— যেকোনো শক্তিকে প্রথমে এই উপকূলরেখার নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে; যার অর্থ হলো ইরানের মাটিতে গিয়ে ইরানকে পরাজিত করা। ফলে একটি নৌ-অভিযান মুহূর্তেই অত্যন্ত ব্যয়বহুল এক স্থলযুদ্ধে রূপান্তরিত হবে।
বিশ্ব চাইলেই এই সমস্যাকে এড়িয়ে বিকল্প কোনো পথ বেছে নিতে পারবে না। এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং এই অঞ্চলের উৎপাদিত প্রায় সমস্ত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহিত হতো চলমান যুদ্ধের আগে। প্রণালীটি এড়িয়ে জ্বালানিপণ্য রপ্তানির জন্য বিদ্যমান যে বাইপাস অবকাঠামো রয়েছে, তা বড়জোর এই পরিমাণের এক-চতুর্থাংশ বহন করতে পারে। আর সেগুলোও কোনো উল্লেখযোগ্য মাত্রায় গ্যাস পরিবহনের জন্য তৈরিই করা হয়নি। নিচে এটিই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে, যে কেন এই প্রণালীটি পুনরায় সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করা এত কঠিন। আর এই কঠিন সত্যটি মেনে নেওয়ার পর বিশ্বের সামনে কোন বাস্তবতাই বা অবশিষ্ট থাকে।
হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই
পারস্য উপসাগর থেকে উন্মুক্ত মহাসাগরে বের হওয়ার একমাত্র সমুদ্র পথ হলো এই হরমুজ প্রণালি। এর জাহাজ চলাচলের লেন দুটি মাত্র ২ মাইল চওড়া, যা মাঝখানে আরও একটি ২ মাইলের বাফার জোন দ্বারা বিভক্ত। এই প্রণালিটিকে যা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে, তা কেবল এর ওপর দিয়ে হওয়া বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যই নয়, বরং এর কোনো বিকল্প রুটের অনুপস্থিতি। কেবল সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) কিছু কার্যকর অপরিশোধিত তেলের পাইপলাইন রয়েছে, যা এই প্রণালীকে বাইপাস বা এড়িয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-এর হিসাব অনুযায়ী, সমুদ্রপথে যাতায়াত করা ২ কোটি ব্যারেল তেলের বিপরীতে এই পাইপলাইনগুলোর সম্মিলিত ধারণক্ষমতা মাত্র ৩৫ থেকে ৫৫ লাখ ব্যারেল। এই বিকল্পগুলোর অপর্যাপ্ততা তখনই আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন দেখা যায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ইতিমধ্যে সৌদি আরবের আবকাইক-ইয়ানবু পাইপলাইনে আঘাত হেনেছে এবং ইরানি ড্রোন আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে হামলা করেছে—যে বন্দরটি মূলত হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে রপ্তানি বাণিজ্যের জন্যই তৈরি করা হয়েছিল।
ভূরাজনৈতিকভাবে ইরানের অবস্থানকে যা সবচেয়ে বেশি টেকসই করে তুলেছে, তা তাদের নৌবাহিনী নয়, বরং তাদের ভৌগোলিক উপকূলরেখা। প্রণালির ঠিক মুখোমুখি ইরানের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত বন্দর নগরী- বন্দর আব্বাস হলো মূলত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর প্রধান কার্যালয় এবং লজিস্টিক হাব, যেখান থেকে ইরান হরমুজে শক্তিমত্তা প্রদর্শন করে। এর পাশাপাশি রয়েছে কেশম, হরমুজ এবং লারাক দ্বীপপুঞ্জ, যার প্রতিটিই ইরানের জন্য অগ্রবর্তী ঘাঁটি হিসেবে কাজ করে। তেলবাহী ট্যাংকারগুলো যখন এই করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত থাকে, ঠিক তখনই এই দ্বীপগুলো থেকে ইরান খুব সহজে নজরদারি করতে পারে ও তাদের ওপর আঘাত হানতে পারে। এই অবস্থানগুলো থেকে উপকূল-ভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে পুরো প্রণালির সম্পূর্ণ প্রস্থ কভার করা সম্ভব। এসব ঘাঁটি থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে সশস্ত্র স্পিডবোট হরমুজে মোতায়েন করা যায় এবং আনুমানিক ২,০০০ থেকে ৬,০০০ মাইনের একটি বিশাল মজুদ থেকে প্রয়োজনমতো মাইন বেছানো যায়।
ইরান এর আগেও এই প্রণালি বন্ধের হুমকি দিয়েছিল, তবে মার্চ মাসে যখন এটি শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়, তখন আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো এটি প্রতিরোধে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান—কোনো পক্ষই জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন (আনক্লস) অনুমোদন করেনি, যেটিকে আন্তর্জাতিক জলপথগুলোর জন্য বিশ্বের একমাত্র সাধারণ আইনি কাঠামো হিসেবে গণ্য করা হয়।
এই সম্মুখ সমরে জয়ী হতে ইরানের কোনো প্রথাগত নৌযুদ্ধে জেতার প্রয়োজন নেই। তাদের শুধু জাহাজ চলাচলের ট্রানজিট খরচ বা ঝুঁকি এতটাই বাড়িয়ে দিতে হবে— যেন আন্তর্জাতিক বিমা বাজার এই রুটে কোনো জাহাজকে বিমা সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ইতোমধ্যে প্রধান সামুদ্রিক বিমাকারীরা পুরো পারস্য উপসাগরে তাদের যুদ্ধ-ঝুঁকি বিমা সুবিধা স্থগিত করেছে বা প্রিমিয়ামের হার আকাশচুম্বী করেছে। ফলে প্রণালিটি বন্ধ থাকার চরম মুহূর্তে এর মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল এবং সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরেও— তা স্বাভাবিকের তুলনায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশে ফিরে এসেছে। এই পটভূমিতে, এখন বিশ্বের সামনে তিনটি ভবিষ্যৎ সমীকরণ উপস্থিত হয়েছে, যার প্রতিটির নিজস্ব যৌক্তিকতা এবং পরিণতি রয়েছে।
প্রথম ভবিষ্যৎ: হরমুজ প্রণালির আংশিক বা নিয়ন্ত্রণমূলক বন্ধ
প্রথম সমীকরণ বা ভবিষ্যৎটি ইতিমধ্যেই আংশিকভাবে কার্যকর রয়েছে। মার্চ মাসের শুরুতে ইরান যখন প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়, তখন তারা কোনো সাধারণ বা ঢালাও অবরোধ আরোপ করেনি; বরং তারা একটি 'নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকার ব্যবস্থা' চালু করে। এর অধীনে মুক্তবাজারের নিয়মের চেয়ে ইরানের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের ভূরাজনৈতিক বন্ধুত্বের ওপর ভিত্তি করে তাদের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছিল। যেসব জাহাজ এই প্রণালি পার হতে চেয়েছিল, তাদের কার্গোর বিবরণ, ক্রু বা নাবিকদের তালিকা এবং গন্তব্যের তথ্য আইআরজিসি-অনুমোদিত মধ্যস্থতাকারীদের কাছে জমাও দিতে হয়। এরপর একটি বিশেষ ক্লিয়ারেন্স কোড পাওয়ার পর জাহাজগুলোকে ইরানের জলসীমার মধ্য দিয়ে এসকর্ট বা পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো।
যেসব দেশ তেহরানের সাথে সরাসরি আলোচনা বা কূটনৈতিক বন্দোবস্ত করেছে, তারা যাতায়াতের সুবিধা পেয়েছে। যেমন চীন, রাশিয়া, ভারত, ইরাক, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, তুরস্ক এবং ফিলিপাইনের জাহাজগুলো এই অবরোধের পরও বিভিন্ন সময়ে এই প্রণালি পার হতে পেরেছে। অন্যদিকে, পশ্চিমা দেশগুলোর সংশ্লিষ্ট জাহাসজগুলো কার্যকরভাবে অবরুদ্ধ রয়েছে। নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, অন্তত দুটি জাহাজকে প্রতিটি ক্রসিং বা পারাপারের জন্য চীনের মুদ্রা বা ইউয়ানে ২০ লাখ ডলার সমপরিমাণ অর্থ টোল হিসেবে পরিশোধ করতে হয়েছে। এমনকি ইরানের পার্লামেন্ট এখন এই ব্যবস্থাকে একটি আনুষ্ঠানিক রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে আইনি রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে।
এই ভবিষ্যতের কৌশলগত প্রভাব অত্যন্ত গভীর এবং বিশ্বজুড়ে এর প্রকৃত মূল্যায়ন করা হয়নি। চীন তার আমদানিকৃত তেলের ৪৫ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পায়। কিন্তু তেহরানকে এই পথ সম্পূর্ণ খুলে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার কোনো বিশেষ তাগিদ নেই বেইজিংয়ের; কারণ তাদের নিজস্ব জাহাজগুলো ইতোমধ্যেই ইরানের অনুমতি নিয়ে চলাচল করছে। তবে এই সমীকরণে কিছুটা বদল আসে, যখন চীনা কর্মকর্তারা ট্রাম্প প্রশাসনকে জানান যে তারা এই প্রণালির সামরিকীকরণ বা টোল ব্যবস্থার পক্ষে নন। চীনের এই প্রকাশ্যে নেওয়া অবস্থানটি বাস্তবতার সাথে কিছুটা সাংঘর্ষিক, কারণ পশ্চিমা জাহাজ যখন অবরুদ্ধ, তখন চীনা জাহাজগুলো কিন্তু ইরানের অনুমতিতেই ঠিকই যাতায়াত করছে।
অন্যদিকে রাশিয়া, যে দেশটি বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার কারণে প্রতি মাসে অতিরিক্ত প্রায় ৮৫০ কোটি ডলার রাজস্ব আয় করছে; সেও এই এই প্রণালি সম্পূর্ণ খুলে দেওয়ার পক্ষে কথা বলবে, এমন কোনো কারণই নেই। সমঝোতা স্মারকটি সাময়িকভাবে এই টোল আদায়ের ব্যবস্থা স্থগিত করলেও ইরান ইতিমধ্যেই নিয়ম অমান্যকারী জাহাজগুলোর ওপর পুনরায় হামলা শুরু করেছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকার ব্যবস্থা আসলে কখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এমনকি এই পথ দিয়ে যাওয়ার জন্য অর্থ আদায়ের এই কৌশলটি অন্য পক্ষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে: ট্রাম্পও সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য মার্কিন সুরক্ষায় যাতায়াত করা জাহাজগুলোর ওপর ২০ শতাংশ ফি আরোপের প্রস্তাব করেছিলেন, যদিও পরবর্তীতে উপসাগরীয় দেশগুলোর চাপে তিনি তা প্রত্যাহার করে নেন।
দ্বিতীয় ভবিষ্যৎ: মার্কিন সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে হরমুজ প্রণালি
দ্বিতীয় সমীকরণটি হলো এমন একটি পথ যা যুক্তরাষ্ট্র অতীতে বারবার চেষ্টা করেছে এবং প্রতিবারই একই ফল পেয়েছে। সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে এই প্রণালি জোরপূর্বক উন্মুক্ত করার যেকোনো প্রচেষ্টা এমন এক ভৌগোলিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয় যা মূলত এই ধরনের আক্রমণকে ব্যর্থ করার জন্যই তৈরি। ইরান বাণিজ্যিক জাহাজে পুনরায় হামলা শুরু করার পর মার্কিন বাহিনী এখন টানা পঞ্চম দিনের মতো ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে (যার মধ্যে প্রণালিতে অবস্থিত দ্বীপগুলোও রয়েছে) বিমান হামলা চালাচ্ছে।
এই ধারাবাহিকতা গত মার্চ থেকেই চলে আসছে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপকূলে ভূগর্ভস্থ মিসাইল সাইলোগুলোতে বাঙ্কার-ব্লাস্টিং বোমা ব্যবহার করে ক্রুজ ও অ্যান্টি-শিপ মিসাইলের মজুদ ধ্বংস করতে বিমান অভিযান শুরু করেছিল। একই সাথে উপসাগরজুড়ে ইরানের নৌবাহিনীকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়। সেসময় ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের ১৫৮টি নৌযান ধ্বংস করা হয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রণালিটি বন্ধই ছিল। এই সামরিক অভিযানটি প্রমাণ করেছে, যে কোনো দেশের সামরিক সম্পদ ধ্বংস করা, আর তার উপকূলরেখার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এক বিষয় নয়। আকাশ থেকে হামলার মাধ্যমে ইরানের প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সক্ষমতা যতটা দ্রুত ধ্বংস করা হচ্ছে, তেহরান তার চেয়েও দ্রুতগতিতে এটি পুনঃস্থাপন করতে পারে।
'প্রজেক্ট ফ্রিডম'-এর উদ্দেশ্য ছিল এই সামরিক অচলাবস্থা ভেঙে দেওয়া। এক রোববারে এই অভিযান শুরু হয়েছিল, কিন্তু ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে মঙ্গলবারের মধ্যেই তা স্থগিত করতে হয়, যখন সৌদি আরব তাদের দেশে মার্কিন ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি সাময়িকভাবে স্থগিত করে এবং কুয়েত তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। এই অভিযানের জন্য যে আঞ্চলিক জোটের প্রয়োজন ছিল, তা শেষ পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র– জার্মানি, স্পেন, ইতালি, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান—সবাই কোনো স্পষ্ট কৌশলগত লক্ষ্য না থাকায় এবং যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় ট্রাম্পের যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
কোনো মিত্র জোট পাশে না থাকা এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যখন স্পষ্টভাবেই স্থল সেনা মোতায়েনের বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন, তখন ইরানের উপকূলরেখা দখল করার একমাত্র সামরিক বিকল্পটি মাঠ থেকে বাদ পড়ে গেছে। ফলে এই সামরিক উপায়টি কেবল সংঘাতের তীব্রতাই বাড়াচ্ছে, কোনো সমাধান আনছে না। পরিশেষে দুই পক্ষকেই আবার আলোচনার টেবিলে ফিরে যেতে হবে এবং সেই চুক্তির শর্তগুলোতে এই বাস্তবতার প্রতিফলন থাকবে যে উপকূলরেখাটি এখনো ইরানের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।
তৃতীয় ভবিষ্যৎ: হরমুজ খোলা থাকবে কিন্তু ক্ষতবিক্ষত অবস্থায়
তৃতীয় সমীকরণটি এখনো সবচেয়ে বেশি সম্ভাব্য বলে মনে করা হচ্ছে। তবে তিন সপ্তাহ আগের তুলনায় বর্তমানে এটি অর্জন করাও বেশ কঠিন। সমঝোতা স্মারকটি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য এই পরিস্থিতি তৈরি করতে পেরেছিল: প্রণালিটি আংশিকভাবে খুলেছিল, জাহাজ চলাচল স্বাভাবিকের এক-তৃতীয়াংশে ফিরে এসেছিল এবং গত ফেব্রুয়ারির পর প্রথমবারের মতো তেলের দাম যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় নেমে এসেছিল। কিন্তু এর পরপরই ইরান একে একে একটি কাতারের এলএনজি ট্যাংকার, একটি সৌদি সুপারট্যাংকার এবং সাইপ্রাসের পতাকাবাহী একটি কনটেইনার জাহাজে হামলা চালায়। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ১০০টিরও বেশি সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে তিন দফায় বিমান হামলা চালায় এবং এর জের ধরে ইরান ১২ জুলাই হরমুজ আবারও সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করে। এই সমঝোতা স্মারকটি কারিগরিভাবে এখনো একটি সম্ভাবনা হিসেবে টিকে আছে; ওমান ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় পর্দার আড়ালে আলোচনা চলছে এবং উভয় পক্ষই ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা কূটনীতির পথ থেকে সম্পূর্ণ সরে যায়নি। একটি টেকসই প্রণালি খুলে দেওয়ার কূটনৈতিক কাঠামো এখনো বিদ্যমান, যদিও দুই পক্ষই বর্তমানে প্রস্তাব বিনিময়ের চেয়ে একে অপরের ওপর হামলা চালাতেই বেশি ব্যস্ত।
তবে পরবর্তী সময়ে যা-ই ঘটুক না কেন, প্রায় পাঁচ মাসের এই সংঘাতের অর্থনৈতিক পরিণতি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর স্থায়ী ক্ষত তৈরি করেছে। হরমুজ বন্ধের পর থেকে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে তেলের বাজার চরম আতঙ্ক ও স্বস্তির দোলাচলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে এক পর্যায়ে যুদ্ধের আগের সময়ের চেয়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৫৫ শতাংশের বেশি বেড়েছিল। তবে প্রতিবারই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো চুক্তির আভাস পাওয়ামাত্রই তা আবার দ্রুত কমেও গেছে।
এই অস্থিরতা নিজেই বিশ্বজুড়ে এক ধরণের বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা জ্বালানি-নির্ভর অর্থনীতিগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করা প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক বিমা বাজারও স্থায়ীভাবে তাদের ঝুঁকির প্রিমিয়াম পুনর্নির্ধারণ করেছে এবং দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি চুক্তিগুলো এখন সংশোধন করে 'হরমুজ প্রণালী বন্ধ' হওয়াকে 'ফোর্স মাজ্যুর' (অপ্রত্যাশিত বা নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত পরিস্থিতি) শর্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। আইনজীবীদের মতে, ২৮ ফেব্রুয়ারির আগে বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক চুক্তিতে এই ধারাটি ছিল না, অথবা অত্যন্ত দুর্বলভাবে খসড়া করা হয়েছিল।
এখানে উল্লেখিত তিনটি সমীকরণই যে একমাত্র সম্ভাবনা, তা নয়। মোজতবা খামেনির নতুন ও অপ্রমাণিত কর্তৃত্বের অধীনে, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কতটা বজায় থাকবে তা নিশ্চিত নয়। অন্যদিকে, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ঐক্যও ফাটলের মুখে পড়েছে, কারণ কিছু দেশ তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমাতে তেহরানের সাথে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার দিকে ঝুঁকছে। এই দুটি অভ্যন্তরীণ গতিশীলতাই নির্ধারণ করবে শেষ পর্যন্ত কোন ভবিষ্যৎটি জয়ী হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এখন কী করা উচিত?
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই সংকট এটিই প্রমাণ করেছে যে, কেবল সামরিক আধিপত্য দিয়েই এমন একটি আন্তর্জাতিক জলপথের বিরোধ মেটানো সম্ভব নয়, যেটি ভৌগোলিকভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। ট্রাম্প সামরিক পর্বটিকে তাড়াহুড়ো করে সম্পন্ন ঘোষণা করার পরও—গেল সপ্তাহে যে নতুন করে বিমান হামলা শুরু হয়েছে, তা ইঙ্গিত দেয় যে ওয়াশিংটন এখনো এই বাস্তব সত্যটি পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। যেহেতু এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য অর্জিত হয়নি, তাই এখন হোয়াইট হাউসের সামনে প্রশ্ন হলো— তারা নিজ দেশের জনগণের কাছে কোন বিষয়টিকে বিজয় হিসেবে তুলে ধরবে।
সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উত্তর হতে পারে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অবাধ নৌচলাচলের গ্যারান্টির বিনিময়ে তেহরানের পারমাণবিক মজুদের বিষয়ে একটি কঠোর ও যাচাইযোগ্য প্রতিশ্রুতি আদায় করা। ট্রাম্প এই চুক্তির যেকোনো চূড়ান্ত সমাধানের সাথে আব্রাহাম চুক্তির অগ্রগতিকেও যুক্ত করেছেন। আর আব্রাহাম চুক্তিকে ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে– সেটি তাকে এমন একটি কাঠামো দেবে, যা দিয়ে তিনি দেখাতে পারবেন যে তিনি ওবামার আমলের মূল পরমাণু চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকেও অনেক অগ্রগতি করেছেন। ওয়াশিংটনের এখন বোঝা উচিত যে, এই কূটনৈতিক পথটি সামরিক শক্তির কোনো বিকল্প নয়, বরং এটিই একমাত্র পথ যা কোনো ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ ছাড়াই একটি টেকসই সমাধান এনে দিতে পারে।
ইরানের জন্য এই অবরোধের কৌশলগত যুক্তি পরিষ্কার। আর এটির বাস্তবায়ন তেহরানের এমন এক সহনশীলতা ও প্রতিরোধ সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে, যা বিশ্বের খুব কম বিশ্লেষকই আগে থেকে অনুমান করতে পেরেছিলেন। তবে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সামগ্রিকভাবে ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে এমনভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে, যা কেবল এই প্রণালি বন্ধ করে বা টোল আদায় করে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। আর এই দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ইরানি জনগণকে, যাদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ এই যুদ্ধ শুরুর অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। একটি সম্মানজনক সমঝোতা, যা ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে, বৈশ্বিক জ্বালানি অর্থনীতিতে ইরানের অবস্থান ফিরিয়ে আনবে এবং তাদের ওপর থাকা সামরিক চাপ কমাবে—তা যেকোনো অবরোধ বজায় রাখার চেয়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। আর সেটা ইরানের শাসকগোষ্ঠীও জানে।
ফলে সংঘাত যেভাবেই মিটমাট হোক না কেন, হরমুজের জলপথের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোও কিন্তু কোনো চূড়ান্ত চুক্তির জন্য হাত গুটিয়ে বসে নেই। ইতোমধ্যেই বিকল্প পাইপলাইনগুলোর ধারণক্ষমতা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে, বিকল্প আন্তর্জাতিক করিডোরগুলোতে অর্থায়ন করা হচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি চুক্তিগুলো নতুন করে লেখা হচ্ছে—যাতে নিশ্চিত করা যায় যে কোনো একটি একক 'চোকপয়েন্ট' বা কৌশলগত জলপথ যেন পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করতে না পারে। ওয়াশিংটন এবং তেহরানের আলোচনার টেবিলে যে জলপথের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হচ্ছে, তা মূলত বিশ্বের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বাস্তবতাকে নতুন করে বদলে দিচ্ছে। আর এই তিন ভবিষ্যতের মধ্যে কোনটি শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়, তা দীর্ঘকাল ধরে বিশ্ব ব্যবস্থাকে সংজ্ঞায়িত করবে—এমনকি হরমুজ থেকে শেষ মার্কিন যুদ্ধজাহাজটি দেশে ফিরে যাওয়ার বহু বছর পরও।
লেখক: ওয়াসায় মীর একজন ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষক। মূলত মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং উদীয়মান প্রযুক্তি নিয়ে তিনি কাজ করে থাকেন। তাঁর বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধগুলো আল জাজিরা, গালফ নিউজ, দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট এবং গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের মতো প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
