২০২০ সালের নির্বাচন ‘হস্তক্ষেপ’ করেছিল চীন, চক্রান্ত ঢাকতে জড়িত ছিল মার্কিন গোয়েন্দারা—দাবি ট্রাম্পের
২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কারচুপি ও হস্তক্ষেপের জন্য সরাসরি চীনকে অভিযুক্ত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার কিছু কর্মকর্তা বা 'ডিপ স্টেট' (গোপন চক্র) চীনের এই চক্রান্ত ও হস্তক্ষেপের তথ্য ধামাচাপা দিয়েছিল। একই সঙ্গে এই চক্রান্তের সঙ্গে জড়িত সরকারি কর্মকর্তাদের বিচারের মুখোমুখি করারও অঙ্গীকার করেছেন তিনি।
ট্রাম্পের এই দাবি ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি অবমুক্ত গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সম্পূর্ণ বিরোধী। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের 'স্থিতিশীলতা' বজায় রাখার স্বার্থে চীন ২০২০ সালের নির্বাচনে কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। ট্রাম্পের এই বক্তৃতার পর ডেমোক্র্যাটরা তার বিরুদ্ধে 'নির্লজ্জের মতো ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার' চেষ্টার অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা হাউস অব রিপ্রেজেন্টিটিভসের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে—এমন পূর্বাভাস নিশ্চিত জেনেই ট্রাম্প আগেভাগে নির্বাচনের ফল নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির মাঠ প্রস্তুত করছেন।
ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার রাতে দেওয়া ভাষণে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে ২২ কোটি (২২০ মিলিয়ন) মার্কিন ভোটারের ফাইল চুরির অভিযোগ এনে বলেন, '২০২০ সালের নির্বাচনকালীন সময়ে পিপলস রিপাবলিক অব চীনের চালানো এই কারচুপি সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নির্বাচনী ডেটা হ্যাকের ঘটনা।'
তিনি আরও বলেন, 'চুরি যাওয়া এই তথ্যের মধ্যে ভোটারদের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর, রাজনৈতিক দলের পছন্দ এবং অন্যান্য সংবেদনশীল ডেটা রয়েছে—যা ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করতে এবং অন্যান্য জঘন্য কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা যায়। আর ঠিক সেটাই ঘটানো হয়েছিল।'
ট্রাম্প দাবি করেন, ২০১৯ সাল থেকেই চীন তাকে নির্বাচনে জয়ী হওয়া থেকে বিরত রাখতে 'জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই' করেছিল। এর জন্য বেইজিং সাংবাদিকদের অর্থ দিয়ে তার বিরুদ্ধে নেতিবাচক খবর প্রকাশ করাত এবং ব্যবসায়ী নেতাদের তার বিরুদ্ধে উসকে দেওয়ার কাজ করেছিল। এমনকি বেইজিং ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলকেও প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ট্রাম্প কিন্তু এটি দাবি করেননি যে তিনি ২০২০ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন বা চীনের হস্তক্ষেপের কারণেই তার বিজয় হাতছাড়া হয়েছিল।
প্রেসিডেন্টের দাবির সপক্ষে হোয়াইট হাউস তাদের ওয়েবসাইটে একগুচ্ছ অবমুক্ত গোয়েন্দা নথিপত্র প্রকাশ করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন ওই ওয়েবসাইটে দাবি করেছে, 'আমাদের ব্যালট গণনা পদ্ধতি হ্যাকিং ও কারচুপির মুখে পড়েছে এবং কারচুপির সব প্রমাণ ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে।' তারা আরও যোগ করে, 'আমাদের দেশে এখনও ভোটার আইডি ছাড়া, নাগরিকত্বের প্রমাণ ছাড়া নির্বাচন হচ্ছে এবং লাখ লাখ ব্যালট মেইলের মাধ্যমে লক্ষ্যহীনভাবে ভেসে বেড়াচ্ছে।'
'দ্য টেলিগ্রাফ' এই বিপুল পরিমাণ নথিপত্র যাচাই-বাছাই করে দেখছে এবং এখনও তারা ট্রাম্পের এই অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি।
সমর্থকদের কাছে পাঠানো এক ইমেইলে ডেমোক্র্যাটদের পরিচালনা কমিটি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে '২০২০ সালের নির্বাচন নিয়ে মিথ্যাচারের মাধ্যমে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করার' অভিযোগ এনেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'আজ রাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২০ সালের নির্বাচনে তার পরাজয়কে ঢেকে দিতে এবং মুক্ত ও অবাধ নির্বাচনের ওপর তার আক্রমণকে বৈধতা দিতে মরিয়া হয়ে মিথ্যাচার করেছেন। ট্রাম্প ও রিপাবলিকানরা ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার জন্য মাঠ প্রস্তুত করছেন।'
হাউস অব রিপ্রেজেন্টিটিভসের ডেমোক্র্যাট দলীয় নেতা হাকিম জেফরিস বলেন, 'ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও জেনেশুনে বিপজ্জনক মিথ্যা ছড়িয়েছেন, কারণ দেশের অর্থনীতি আজ বিপর্যস্ত এবং তিনি জানেন যে মার্কিন জনগণ তার ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। একটি ভোট পড়ার আগেই তিনি অত্যন্ত চতুর ও দুর্নীতিগ্রস্ত উপায়ে আমাদের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।'
ট্রাম্প ইতিপূর্বে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই বারবার দাবি করে আসছিলেন যে ২০২০ সালের নির্বাচন তার কাছ থেকে 'চুরি' করা হয়েছিল। তবে এত দিন তিনি মূলত ডেমোক্র্যাট ও নিজের প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতো অভ্যন্তরীণ প্রতিপক্ষদেরই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিলেন। পাশাপাশি ২০১৬ সালের নির্বাচনে তার বিজয় নিশ্চিত করতে রাশিয়া হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ করেছিল—এমন গোয়েন্দা তথ্য তিনি বরাবরই উড়িয়ে দিয়েছেন।
ট্রাম্পের এই বক্তৃতা তার চীন নীতির এক নাটকীয় মোড় নির্দেশ করছে। কারণ গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে তিনি চীনে এক রাষ্ট্রীয় সফর করেছিলেন এবং তার দ্বিতীয় মেয়াদে বেইজিংয়ের প্রতি তিনি তুলনামূলকভাবে নরম অবস্থান নিয়েছিলেন। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে একটি শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ওয়াশিংটন ডিসিতে যাওয়ার কথা রয়েছে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের।
২০২১ সালে ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিল (এনআইসি) 'উচ্চ আত্মবিশ্বাসের' সঙ্গে জানিয়েছিল যে, চীন মার্কিন নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করার কোনো চেষ্টা করেনি। তারা বলেছিল, 'চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের স্থিতিশীলতা চেয়েছিল। মার্কিন নির্বাচনের কোনো ফলাফলই চীনের কাছে এতটাই লাভজনক মনে হয়নি যে তারা নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করে হাতেনাতে ধরা পড়ার মতো ঝুঁকি নেবে।'
তবে এনআইসি-র ওই প্রতিবেদনে সাইবার বিষয়ক জাতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তার একটি 'ভিন্নমত' (মাইনরিটি ভিউ) উল্লেখ করা হয়েছিল, যেখানে দাবি করা হয়েছিল যে বেইজিং ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনের পথ বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল। এছাড়া এনআইসি আরও জানিয়েছিল যে, রাশিয়া ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন এবং জো বাইডেনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করেছিল, অন্যদিকে ইরান ট্রাম্পের প্রচারণাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছিল।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, তার প্রথম মেয়াদের শেষ দিনগুলোতে চীনের এই নির্বাচন হস্তক্ষেপে জড়িত থাকার প্রমাণগুলো তাঁর কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল এবং তার দৈনিক ব্রিফিংয়েও তা যুক্ত করা হয়নি। তিনি বলেন, 'ডিপ স্টেটের সদস্যরা... আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোতে থেকে চীনের এই জঘন্য হস্তক্ষেপের তথ্যগুলো ধামাচাপা দিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে, যাতে তা প্রেসিডেন্ট এবং মার্কিন জনগণ জানতে না পারেন।'
তিনি আরও দাবি করেন, তার প্রশাসনের এক তদন্ত অনুযায়ী ২ লাখ ৭৮ হাজার অ-নাগরিককে ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত করা হয়েছিল। ট্রাম্প বলেন, 'এটি যেকোনো তৃতীয় বিশ্বের দেশের চেয়েও খারাপ। তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশও আমাদের মতো এভাবে নির্বাচন পরিচালনা করে না।'
আমেরিকার অন্যতম প্রধান দুটি টেলিভিশন নেটওয়ার্ক 'এবিসি' এবং 'এনবিসি' সরাসরি টেলিভিশনে ট্রাম্পের এই ভাষণ সম্প্রচার করতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ভাষণের শেষভাগে তাদের আক্রমণ করেন ট্রাম্প।
তিনি বলেন, 'তারা এবং গণমাধ্যমের অন্যান্যরা এই চক্রান্তের অংশ... এই ধরনের জালিয়াতি করার জন্য তাদের লাইসেন্স বাতিল করা উচিত।'
অবশ্য দুটি সম্প্রচার মাধ্যমই তাদের অনলাইন স্ট্রিমিং সার্ভিসে ভাষণটি প্রচার করেছে এবং পরে এ নিয়ে বিশেষ বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। ইতিপূর্বে প্রেসিডেন্ট বাইডেনসহ অন্যান্য মার্কিন প্রেসিডেন্টদের লাইভ বক্তৃতাও অনেক টিভি নেটওয়ার্ক সম্প্রচার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
নেটওয়ার্কগুলোর লাইসেন্স বাতিল করার এই হুমকি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে রক্ষণশীলদের মধ্যেও বড় প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিতে পারে, যারা ইতিপূর্বে ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের (এফসিসি) এমন ধরনের রাজনৈতিক চাপের তীব্র বিরোধিতা করেছিল।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার ডেমোক্র্যাট দলের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-করতেজ টিভি চ্যানেলগুলোকে ট্রাম্পের এই মিথ্যা ভাষণ লাইভ সম্প্রচার না করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
ভাষণে ট্রাম্প তার নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে 'সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট' পাসের দাবি জানান, যা মূলত ভোটার আইডি সংক্রান্ত নিয়মগুলোকে আরও কঠোর করবে। তবে বিরোধীদের দাবি, এটি আসলে সাধারণ ভোটারদের ভোটদানে নিরুৎসাহিত করার একটি চক্রান্ত।
সিনেটে রিপাবলিকানদের নেতা জন থুন এই বিলটি সিনেটে তুলতে অস্বীকার করে বলেছেন, এটি পাস করার মতো পর্যাপ্ত ভোট তাদের নেই। তার এই সিদ্ধান্তে চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ট্রাম্প গত শুক্রবার একটি দ্বিপক্ষীয় বিল সই করতে অস্বীকৃতি জানান, যার মধ্যে যুদ্ধাহত পঙ্গু প্রবীণ সেনাদের আবাসন সহায়তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ট্রাম্প বলেন, 'নির্বাচনী নিরাপত্তার এই সংকট মোকাবিলায় কংগ্রেসকে অবশ্যই সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট পাস করতে হবে। কারচুপি করার ইচ্ছা না থাকলে এটি পাস করা তো খুবই সহজ। যারা কারচুপি করতে চায় কেবল তারাই এটি পাস করতে চাইবে না, কারণ আপনাদের নীতি এতই খারাপ এবং আপনাদের প্রার্থীরা এতটাই করুণ যে এভাবে জালিয়াতি ছাড়া আপনারা কখনোই নির্বাচিত হতে পারবেন না।'
তিনি 'সব মার্কিন নাগরিককে' আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'আগামীকালই আপনাদের ফোন তুলুন, হাউস অব রিপ্রেজেন্টিটিভস ও সিনেটে আপনাদের প্রতিনিধিদের ফোন করুন এবং অবিলম্বে সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট পাস করার দাবি জানান।'
