কেন ‘ফাদার আমির’-এর মৃত্যুতে কাতারে বিশ্বনেতাদের ঢল?
কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির মৃত্যুতে বিশ্বনেতাদের পক্ষ থেকে গভীর শোক ও সমবেদনা জানানো হচ্ছে। উপসাগরীয় এই দেশটিকে একটি প্রধান কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মিডিয়া শক্তিতে রূপান্তর করার একক কৃতিত্ব দেওয়া হয় তাকেই।
'ফাদার আমির' হিসেবে পরিচিত শেখ হামাদ গত রবিবার (১২ জুলাই) ৭৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুতে কাতারের বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমির শেখ তামিম লুসাইল প্যালেসে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, রাজপরিবারের সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্বাগত জানাচ্ছেন এবং তাদের সমবেদনা গ্রহণ করছেন।
কে ছিলেন শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি?
শেখ হামাদ ১৯৯৫ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কাতার শাসন করেন। ২০১৩ সালে তিনি স্বেচ্ছায় তার ছেলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন, যা উপসাগরীয় অঞ্চলের শাসকদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের এক বিরল দৃষ্টান্ত।
তার ১৮ বছরের শাসনামলে কাতার বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাস ভাণ্ডারের ওপর ভিত্তি করে দ্রুত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করে। দেশটি বিশ্বজুড়ে তার কূটনৈতিক ভূমিকা সম্প্রসারণ করে, বিদেশে বড় ধরনের বিনিয়োগ করে এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দ্বন্দ্বে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়। ১৯৯৬ সালে আল জাজিরা নেটওয়ার্ক চালুর মাধ্যমে আরব্য মিডিয়া জগতে আমূল পরিবর্তন আনার কারিগরও ছিলেন শেখ হামাদ, যা কাতারকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি প্রভাবশালী মঞ্চ তৈরি করে দেয়। মূলত তার নেতৃত্বেই একটি ছোট রাষ্ট্র থেকে কাতার বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে অন্যতম প্রভাবশালী দেশে পরিণত হয়েছে।
কেন সারাবিশ্বের নেতারা দোহায় সমবেত হয়েছেন?
আন্তর্জাতিক মহলের এই বিপুল সাড়া মূলত প্রায় দুই দশকের শাসনামলে শেখ হামাদের গড়ে তোলা কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বর্তমান আমির শেখ তামিমের নেতৃত্বে কাতারের ক্রমবর্ধমান প্রভাবেরই প্রতিফলন। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়ার দেশগুলোর নেতারা ব্যক্তিগতভাবে দোহায় এসে কিংবা টেলিফোনের মাধ্যমে তাদের শোক প্রকাশ করেছেন। আগত অনেক নেতাই শেখ হামাদকে একজন 'সাহসী ও দূরদর্শী' ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন।
উপস্থিত ছিলেন যেসব মধ্যপ্রাচ্যের নেতারা
প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বাহরাইনের ক্রাউন প্রিন্স সালমান বিন হামাদ আল খলিফা, কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স শেখ সাবাহ খালিদ আল-হামাদ আল-সাবাহ, সৌদি আরবের প্রিন্স সৌদ বিন নায়েফ বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদ এবং ওমানের উপ-প্রধানমন্ত্রী সাইয়্যেদ শিহাব বিন তারিক আল সাইদ সোমবার লুসাইল প্যালেসে আমিরের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান টেলিফোনে সমবেদনা জানিয়েছেন। এছাড়া দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী শেখ সাইফ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং আজমানের ক্রাউন প্রিন্স শেখ আম্মার বিন হুমাইদ আল নুয়াইমি দোহায় সফর করেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান মঙ্গলবার ব্যক্তিগতভাবে আমির শেখ তামিমের সঙ্গে দেখা করেন এবং মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিও তার সমবেদনা জানিয়েছেন।
অন্যান্য আঞ্চলিক নেতাদের মধ্যে ছিলেন লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ও প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা, ইরাকের প্রেসিডেন্ট নিজার আমিদি, কুর্দিস্তান অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট নেচিরভান বারজানি, মরক্কোর প্রধানমন্ত্রী আজিজ আখান্নুচ এবং লিবিয়ার আব্দুল হামিদ দেবীবাহ ও মোহামেদ ইউনিস আল-মেনফি।
অন্যান্য দেশ ও সংস্থার শ্রদ্ধা
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ গতকাল ঢাকা থেকে কাতারের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। তিনি কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে সাবেক আমিরের মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জ্ঞাপন করবেন।
ইউরোপ থেকে ব্রিটেনের প্রতিনিধিত্ব করেছেন প্রিন্স এডওয়ার্ড (ডিউক অফ এডিনবার্গ)। এছাড়া ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং সুইজারল্যান্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইগনাজিও ক্যাসিসও শোক প্রকাশ করেছেন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে জিসিসি মহাসচিব জাসেম মোহামেদ আলবুদাইউই, আরব লীগের মহাসচিব নাবিল ফাহমি এবং ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো উপস্থিত ছিলেন।
আফ্রিকার নেতাদের মধ্যে ছিলেন মৌরিতানিয়ার প্রেসিডেন্ট মোহামেদ ওল্ড গাজুয়ানি, কমোরোসের প্রেসিডেন্ট আজালি আসুমানি, রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট পল কাগামে এবং ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ। এশিয়ার অন্য প্রতিনিধিদের মধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু, কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ এবং ভারতের সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু নিজ নিজ সরকারের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করেন।
এই সাড়া কী নির্দেশ করে?
বিশ্বনেতাদের এই বিশাল উপস্থিতি কাতারের বিস্তৃত কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক এবং শেখ হামাদের বৈদেশিক নীতির শক্তিশালী উত্তরাধিকারকেই ফুটিয়ে তুলেছে। তার শাসনামলে কাতার যেমন মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেছিল, তেমনি নিজেকে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। উচ্চপদস্থ রাজপরিবারের সদস্য, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রধানদের এই উপস্থিতি শেখ হামাদের ব্যক্তিগত মর্যাদা এবং বর্তমান আমির শেখ তামিমের নেতৃত্বে বিশ্বমঞ্চে কাতারের অব্যাহত গুরুত্বকেই প্রমাণ করে।
