ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানে নতুন হামলা, মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিতে তেহরানের পাল্টা হামলা
ইরানে নতুন করে আরও এক দফা হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দেশটির বন্দরনগরী বন্দর আব্বাস, সিরিক, জাস্ক ও কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণের খবর নিশ্চিত করেছে। জবাবে কুয়েত, জর্ডান, বাহরাইনের মার্কিন ঘাঁটিতে আক্রমণের কথা জানিয়েছে তেহরান।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, ইরানের কয়েক ডজনের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে ইরানি সামরিক বাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার সাইট, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন স্থাপনা ও আইআরজিসির ছোট স্পিডবোট।
সেন্টকম জানায়, হামলায় মার্কিন যুদ্ধবিমান, নৌযান, ওয়ান-ওয়ে এরিয়াল অ্যাটাক ড্রোন ও ওয়ান-ওয়ে সি অ্যাটাক ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে প্রথমবারের মতো।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে নতুন দফায় মিসাইল ও ড্রোন ছুড়েছে ইরান। মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামে এ খবর জানিয়েছে করেছে দেশটির এলিট ফোর্স ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
মধ্য ও দক্ষিণ ইরানে মার্কিন বাহিনীর কয়েক ঘণ্টার বিমান হামলার পর তেহরানের পক্ষ থেকে এই পাল্টা আক্রমণের ঘোষণা এল।
ইরানের নূর নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানি সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি যৌথভাবে ওই অঞ্চলে অবস্থিত 'শত্রু ঘাঁটি'গুলোর ওপর 'ব্যাপক আকারে মিসাইল ও ড্রোন হামলা' শুরু করেছে।
আইআরজিসি বলেছে, তারা জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এতে ওই ঘাঁটির কয়েকটি জ্বালানি ডিপো ও গোলাবারুদ মজুতের স্থাপনায় আগুন ধরে গেছে।
এক বিবৃতিতে আইআরজিসি একে ইরানের উপকূলীয় সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন হামলার প্রথম ধাপের জবাব বলে উল্লেখ করেছে।
এছাড়া বাহরাইনের শেখ ইসা বিমানঘাঁটির বেশ কয়েকটি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে বলেও জানিয়েছে আইআরজিসি।
এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, তাদের বিমানবাহিনী শেখ ইসা বিমানঘাঁটির হেলিকপ্টার রক্ষণাবেক্ষণ স্থাপনা, পি-৮ বিমান রাখার একটি হ্যাঙার ও মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি ড্রোন কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারে হামলা চালিয়েছে।
এছাড়া কুয়েতের আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে জ্বালানি ট্যাংক ও প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং আহমেদ আল-জাবের বিমানঘাঁটিতে গুরুত্বপূর্ণ এফপিএস রাডার সিস্টেম 'সম্পূর্ণ ধ্বংস' করে দেওয়ার দাবি করেছে আইআরজিসি।
আইআরজিসি আরও বলেছে, 'ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ করে অবৈধভাবে' হরমুজ পার হওয়ার সময় দুটি জাহাজকে তাদের নৌবাহিনী থামানোর পর মার্কিন বাহিনী ইরানজুড়ে নতুন করে হামলা শুরু করে।
এছাড়া ইরানের পাল্টা হামলার ঘোষণার পর বাহরাইনে সাইরেন বেজে উঠেছে। দ্বিতীয় দিনের মতো সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এর আগে সেন্টকম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে বলেছিল, 'হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বেসামরিক নাবিক ও বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলা চালানোর সক্ষমতা ধ্বংস করতে আজ পূর্বাঞ্চলীয় সময় বিকেল ৫টায় সেন্ট্রাল কমান্ডের বাহিনী নতুন করে এই হামলা শুরু করেছে।'
সেন্টকম আরও বলেছে, 'ইরানি বাহিনীকে জবাবদিহির আওতায় আনতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ হামলার নির্দেশ দিয়েছেন।'
একদিন আগেই ইরানজুড়ে অন্তত ১৪০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার ও জর্ডানে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় তেহরান। তার ২৪ ঘণ্টার মাথায় মার্কিন বাহিনী থেকে এই নতুন হামলা এল।
সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স দাবি করেন, আইআরজিসি হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে আবারও গুলিবর্ষণ করেছে। তবে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো সফলভাবে একটি ইরানি ক্রুজ মিসাইল ও একটি ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন ধ্বংস করেছে।
রোববার গভীর রাতে দক্ষিণ ইরানের হরমোজগান প্রদেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় দফায় দফায় বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম।
প্রদেশটির জাস্ক, কেশম, বন্দর আব্বাস ও সিরিক এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটে। তবে স্থানীয় কর্মকর্তারা বলেছেন, এতে কোনো বেসামরিক নাগরিক হতাহত হননি; অবকাঠামোগত কোনো ক্ষয়ক্ষতিও হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলায় লক্ষ্যবস্তুর পরিধি আগের চেয়ে বড় হয়েছে। হামলার শিকার শহরের তালিকায় যোগ হয়েছে নতুন নতুন নাম। খুজেস্তান, হরমোজগান ও সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশের একের পর এক শহরকে টার্গেট করা হয়েছে।
ভূ-কৌশলগত অবস্থানের কারণে হরমোজগানের জাস্ক, সিরিক, কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাসের গুরুত্ব অনেক। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার জন্য ইরান এ অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। তাছাড়া এসব এলাকায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ রাডার স্টেশন ও একাধিক সামরিক স্থাপনা রয়েছে। যেমন, হরমুজের প্রবেশমুখে অবস্থিত কেশম ওই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় দ্বীপ।
খুজেস্তানের ওমিদিয়ে, মাশহর, বেহবাহান, দেজফুল ও আহভাজের বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকায় আক্রমণ চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
সিস্তান-বেলুচিস্তানের চাবাহার বন্দরের আশপাশেও ক্রমাগত হামলা চালানো হয়েছে।
তবে আমেরিকা সবচেয়ে বড় হামলা চালিয়েছে মারকাজি প্রদেশের খোন্দাব শহরের উপকণ্ঠে। এই হামলাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখানে ইরানের অতি সংবেদনশীল ভারী পানির স্থাপনা রয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, খুজেস্তানের মাশহরে একটি কৃষি সেচ পাম্পিং স্টেশনে ক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়লে একজন নিহত ও চারজন আহত হন।
খুজেস্তানের নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগকারী বিষয়ক উপ-গভর্নর ওয়ালিউল্লাহ হায়াতি জানান, আজ ভোরের দিকে এই হামলা চালানো হয়। নিহত ব্যক্তি ওই সেচ কেন্দ্রের পাহারাদার ছিলেন।
