ব্যবসায়িক গোপন তথ্য চুরির অভিযোগে ওপেনএআই-র বিরুদ্ধে অ্যাপলের মামলা
নিজেদের অত্যন্ত গোপনীয় ব্যবসায়িক তথ্য চুরির অভিযোগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই এবং তাদের এক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল। গত শুক্রবার ক্যালিফোর্নিয়ার উত্তর জেলা আদালতে ফেডারেল মামলাটি দায়ের করা হয়।
এই মামলায় ওপেনএআই-এর চিফ হার্ডওয়্যার অফিসার ট্যাং তান এবং প্রযুক্তিগত কর্মী চ্যাং লিউ-এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন উপায়ে অ্যাপলের অত্যন্ত গোপনীয় তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযুক্ত এই দুই কর্মকর্তাই আগে অ্যাপলে কর্মরত ছিলেন এবং পরবর্তীতে তারা ওপেনএআই-তে যোগ দেন।
২০২৪ সালে অ্যাপলের ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট 'সিরি'-র সঙ্গে ওপেনএআই-এর 'চ্যাটজিপিটি' যুক্ত করার চুক্তির পর থেকে দুই কোম্পানির সম্পর্ক কীভাবে দ্রুত অবনতি হয়েছে, এই মামলা তারই প্রমাণ। গত জুনে অ্যাপল তাদের নতুন এআই চালিত সিরি ঘোষণা করে, যা গুগলের 'জেমিনি' প্রযুক্তি দ্বারা পরিচালিত।
অভিযুক্ত ট্যাং তান বর্তমানে ওপেনএআই-এর নিজস্ব ডিভাইস তৈরির প্রজেক্টের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এটি মূলত ওপেনএআই-এর একটি কৌশলগত প্রয়াস, যাতে তারা অ্যাপলের আইফোনের মতো অন্য কোনো কোম্পানির ডিভাইসের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি গ্রাহকদের কাছে পৌঁছাতে পারে।
অ্যাপলের মামলার নথিতে অভিযোগ করা হয়েছে, ট্যাং তান অ্যাপলের সরবরাহকারী বা সাপ্লায়ারদের অত্যন্ত গোপনীয় তথ্য নিজের ইমেইলে পাঠিয়েছিলেন। শুধু তা-ই নয়, অ্যাপলে কর্মরত কোনো চাকরিপ্রার্থী যখন ওপেনএআই-তে ইন্টারভিউ দিতে আসতেন, তান তাদের অ্যাপলের 'আসল পার্টস' সঙ্গে করে নিয়ে আসার নির্দেশ দিতেন। ওপেনএআই টিমের সঙ্গে 'শো অ্যান্ড টেল' বা পণ্য প্রদর্শনীর জন্য এই পার্টসগুলো ব্যবহার করা হতো।
অ্যাপল তাদের মামলায় আরও বলেছে, ওপেনএআই তাদের এই তথ্যগুলো নিয়ে ঠিক কী কাজ করেছে, তা তারা সুনির্দিষ্টভাবে জানে না। তবে তাদের স্পষ্ট অভিযোগ, 'টেকনিক্যাল স্টাফ থেকে শুরু করে চিফ হার্ডওয়্যার অফিসার—প্রতিটি স্তরে ব্যবসায়িক অংশীদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে ওপেনএআই পরিকল্পিতভাবে অ্যাপলের ব্যবসায়িক গোপনীয়তা এবং গোপনীয় তথ্য চুরি করে চলেছে।'
ওপেনএআই-এর এক মুখপাত্র অবশ্য চুরির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, 'অন্যান্য কোম্পানির ব্যবসায়িক গোপনীয়তার প্রতি আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। বিশ্বজুড়ে মানুষকে ক্ষমতায়ন করতে পারে এমন উদ্ভাবনী প্রযুক্তি তৈরির দিকেই আমাদের সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ রয়েছে।' এ বিষয়ে ট্যাং তান এবং চ্যাং লিউ-এর তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মামলার এজহারে চ্যাং লিউ-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে যে, তিনি অ্যাপলের নেটওয়ার্কে প্রবেশের জন্য তার এক সাবেক সহকর্মীর কাজের কম্পিউটার ব্যবহার করেছিলেন। সেখান থেকে তিনি 'ডজনখানেক গোপনীয় হার্ডওয়্যার-সম্পর্কিত ফাইল' ডাউনলোড করেছিলেন। ওই সহকর্মীকে ওপেনএআই-তে চাকরি দেওয়ার টোপ দিয়ে লিউ তাকে শিখিয়েছিলেন যে, কীভাবে সিকিউরিটি টিম বা নিরাপত্তা কর্মীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে গোপনীয় ফাইলগুলো কপি করা যায়।
ট্যাং তান দীর্ঘ ২৪ বছর অ্যাপলে কর্মরত ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত প্রোডাক্ট-ডিজাইন টিমের একজন সিনিয়র এক্সিকিউটিভ পদে উন্নীত হয়েছিলেন। তিনি অ্যাপলের শিল্প ডিজাইনের প্রধান জনি আইভের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। পরবর্তীতে তিনি অ্যাপল ছেড়ে আইভের এআই ডিভাইস স্টার্টআপ 'আইও প্রোডাক্টস'-এ যোগ দেন, যা পরবর্তীতে ওপেনএআই-এর সঙ্গে একীভূত বা মার্জ হয়েছিল। তবে এই মামলায় জনি আইভকে আসামি করা হয়নি।
আইনি জটিলতায় ওপেনএআই-এর জড়ানোর ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে কানের লতিতে পরিধানযোগ্য স্ক্রিনবিহীন ভয়েস-কন্ট্রোলড ডিভাইস তৈরিকারী স্টার্টআপ 'আইও'-ও ওপেনএআই-এর বিরুদ্ধে গোপন তথ্য চুরির মামলা করেছিল। জুয়েলারি বা টেক কোম্পানিটি গত বছর অভিযোগ করেছিল যে, তাদের এক সাবেক প্রকৌশলী কোম্পানির অত্যন্ত গোপনীয় ফাইল চুরি করে ট্যাং তানকে দিয়েছিলেন। ওপেনএআই অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিল যে তাদের ডিভাইস আইও-র চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
অন্যদিকে, একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, ওপেনএআই নিজেও চলতি বছরের শুরুতে সিরির মধ্যে চ্যাটজিপিটি প্রচার করার চুক্তির শর্ত অ্যাপল অমান্য করেছে অভিযোগ তুলে তাদের একটি নোটিশ পাঠানোর কথা বিবেচনা করছিল। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি অ্যাপল।
গত মাসে ক্যালিফোর্নিয়ার একজন ফেডারেল বিচারক ইলন মাস্কের স্টার্টআপ 'এক্সএআই' কর্তৃক ওপেনএআই-এর বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি মামলা খারিজ করে দেন। ওই মামলায় অভিযোগ করা হয়েছিল যে, ওপেনএআই এক্সএআই-এর এক সাবেক প্রকৌশলীকে প্রলুব্ধ করে তাদের 'গ্রোক' চ্যাটবটের তথ্য হাতিয়ে নিয়েছিল।
এর আগে ২০২৩ সালের শেষভাগে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম 'নিউইয়র্ক টাইমস' মাইক্রোসফট এবং ওপেনএআই-এর বিরুদ্ধে অনুমতি ছাড়া তাদের কন্টেন্ট ব্যবহার করে এআই পণ্যকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগে মামলা করেছিল। চলতি সপ্তাহে টাইমস এবং অন্যান্য প্রকাশকরা আদালতের কাছে ওপেনএআই-এর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, আইনি প্রক্রিয়া চলাকালীন ওপেনএআই ইচ্ছাকৃতভাবে প্রমাণ লুকিয়ে রাখছে।
