এফটির বিশেষ প্রতিবেদন: এবার ইউরোপের মনোযোগ কাড়ছে তুরস্কের রমরমা প্রতিরক্ষা শিল্প
চলতি বছরের শুরুর দিকে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেইন সতর্ক করে বলেছিলেন যে, ইউরোপ রাশিয়া, চীন ও তুরস্কের প্রভাবে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি মন্তব্য করেছিলেন, এটি হলে আমাদের জীবন "কঠিন" হয়ে পড়বে।
তাঁর মন্তব্য মারাত্মক ভুল ছিল , কারণ তিনি ইউরোপের অন্যতম প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে ন্যাটোর এক গুরুত্বপূর্ণ মিত্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্যপদপ্রত্যাশী একটি দীর্ঘদিনের প্রার্থী তুরস্ককে একই কাতারে ফেলেছিলেন। কয়েক দিন পর কমিশনের প্রেস উইং যখন সেই মন্তব্য প্রত্যাহার করে নেয়, তখন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান পাল্টা জবাব দিয়ে বলেন, "তুরস্কের যতটা না ইউরোপকে প্রয়োজন, তার চেয়ে ইউরোপেরই তুরস্ককে বেশি প্রয়োজন।"
এরদোয়ানের একনায়কতান্ত্রিক মনোভাবের কারণে তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপের এক জটিল ও অননুমেয় মিত্র হিসেবে পরিচিত। তবে বর্তমানে ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয় প্রত্যাহারের আশঙ্কা- ইউরোপীয় দেশগুলোকে এক কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তুরস্ককে এখন আর কেবল এক 'অস্বস্তিকর ইউরোপীয় মিত্র' হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং দেশটিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ব্রাসেলসে ন্যাটোর সদর দপ্তরে তুরস্ককে যুক্তরাষ্ট্রের পর দ্বিতীয় "অপরিহার্য অংশীদার" হিসেবে অভিহিত করা হয়, যা এই জোটের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি মজবুত ভিত্তি এবং কৃষ্ণসাগরে এক বড় নৌ শক্তি। দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পের এমন বিশাল সক্ষমতা ও দক্ষতা রয়েছে যা ড্রোন এবং গাইডেড মিসাইলের মতো যুদ্ধাস্ত্র গণহারে উৎপাদন করতে পারে—যা ইউরোপীয় ন্যাটো সদস্যদের এই মুহূর্তে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন।
আঙ্কারা এখন তার ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রভাবকে ব্যবহার করে ইইউ-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি, ইউরোপের উদীয়মান নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আনুষ্ঠানিক ভূমিকা লাভ এবং তার বিকাশমান প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদিত অস্ত্রের জন্য বাজার ধরতে চায়। ইউরোপীয় সামরিক বাহিনীর যেখানে তুর্কি গোলাবারুদ, ড্রোন এবং স্থল শক্তির প্রয়োজন; সেখানে এরদোয়ান চান ইইউ বাজারে আরও ভালো প্রবেশাধিকার, প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে এর সঙ্গে যুক্ত প্রযুক্তি ও অর্থায়ন।
ইউরোপের অনেক নেতাই মনে করেন এরদোয়ানের এই চাওয়াগুলো পূরণ করা উচিত, বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইউরোপ থেকে মার্কিন সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম কমিয়ে আনার পদক্ষেপ নিচ্ছেন। গত বছর তুরস্কের ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা রপ্তানির অর্ধেকেরও বেশি গেছে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোতে।
গত জুনে ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব বলেছিলেন, "নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে তুরস্ককে আমাদের যতটা সম্ভব কাছাকাছি রাখা দরকার, এই মানসিকতা নিয়ে আমাদের মন উন্মুক্ত করতে হবে। আমরা যদি বিশ্বে নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন করতে চাই, তবে আমাদের বড় পরিসরে চিন্তা করা শুরু করতে হবে।"
"বড় চিন্তা" এবং বড় অঙ্কের ব্যয়ই মূলত আগামী ৭ জুলাই আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের মূল এজেন্ডা নির্ধারণ করবে। এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য হবে ৩২ সদস্যের এই সামরিক জোটে ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি বজায় রাখার জন্য ইউরোপের পক্ষ থেকে চেষ্টা করা। এর পাশাপাশি বিশ্লেষক ও কর্মকর্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র হাত গুটিয়ে নিলে তুরস্ক ও তার প্রতিরক্ষা শিল্পকে ইউরোপের সাথে কতটা একীভূত করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা হবে।
এই শীর্ষ সম্মেলন তুরস্কে অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টিই প্রমাণ করে যে ইউরোপের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা বদলে গেছে। এক দশক আগে, এরদোয়ান ২০১৮ সালের ন্যাটোর সম্মেলনটি ইস্তাম্বুলে করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা সবাই ধরে নিয়েছিল গৃহীত হবে। কিন্তু তুরস্কের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবনতির আশঙ্কায়, ডজনখানেক ইউরোপীয় মিত্রদেশ সেই পরিকল্পনা আটকে দিয়েছিল।
তার এক সপ্তাহ পরেই, এক ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টার পর এরদোয়ান সরকারি কর্মকর্তা এবং বিরোধীদের ওপর ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করেন। এর কয়েক মাস পর এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার জন্য রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা শুরু করে তুরস্ক। সে সময় আলোচনায় উপস্থিত এক ন্যাটো কূটনীতিক বলেন, "পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে অনেক ইউরোপীয় দেশই মনে করেছিল তাদের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। এরদোয়ানকে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর সম্মেলনটি সরিয়ে নেওয়ার মতো দুঃস্বপ্ন থেকে তারা বেঁচে গিয়েছিল।"
তুরস্কের ৭২ বছর বয়সী এই প্রভাবশালী প্রেসিডেন্ট অবশেষে তার লক্ষ্য অর্জন করেছেন। আগামী সপ্তাহের এই শীর্ষ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এরদোয়ানের ১,১৫০ কক্ষবিশিষ্ট বিশাল ও জাঁকজমকপূর্ণ বেশতেপে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে। সেখানে ইউরোপীয় ন্যাটো দেশগুলোর পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে, যা ট্রাম্প শুনতে চান; এবং তুর্কি যুদ্ধাস্ত্র কেনার বড় বড় চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে, যা এরদোয়ান চান।
তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পে বিপ্লব
আঙ্কারা থেকে দুইশ কিলোমিটার পূর্বে, এক প্রাচীন মহাসড়কের পাশে (যা পার্সিয়ান রয়্যাল রোড নামে পরিচিত) অবস্থিত একটি বিশাল আধুনিক কারখানা। এটিই মূলত তুরস্কের সামরিক-শিল্পের এত কদরের অন্যতম কারণ। ছোট অস্ত্রের গোলাবারুদ, মর্টার শেল এবং আর্টিলারি বা কামানের গোলা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান 'আর্কা সাভুন্মা' অন্যতম বৃহত্তম প্রতিরক্ষা কোম্পানি, অথচ যার নাম হয়তো অনেকেই শোনেননি।
ন্যাটোর সাবেক ক্রয় কর্মকর্তা ইসমাইল তেরলেমেজ মাত্র ছয় বছর আগে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। রাজনৈতিকভাবে ভালো যোগাযোগ থাকা এই কোম্পানিটি গত বছর তুরস্কের বৃহত্তম প্রতিরক্ষা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম আনাদোলু। স্লোভাকিয়া, বুলগেরিয়া এবং এস্তোনিয়ার সাথে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের চুক্তি তাদের সবচেয়ে বড় অর্জনের মধ্যে অন্যতম।
ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে তুরস্কের যে "প্রতিরক্ষা শিল্প বিপ্লব"-এর কথা বলেছেন, আর্কা তার একটি প্রতীক। তুর্কি প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো অত্যন্ত গতিশীল এবং বাজারের চাহিদার সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে। সরকারও এই খাতকে জাতীয় পরিচয়ের একটি স্তম্ভ হিসেবে উদযাপন করে থাকে।
আঙ্কারায় যেকোনো দিনেই চোখে পড়বে বিশালাকার ডিজিটাল বিলবোর্ডগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণ, আকাশে যুদ্ধবিমানের উড্ডয়ন এবং কামানের গোলার ভিডিও—যার পরেই সচরাচর এভিয়েটর সানগ্লাস পরা এরদোয়ানের একটি ছবি ভেসে ওঠে এবং নিচে লেখা থাকে: "এমন এক তুরস্ক যা বন্ধুদের আস্থা দেয় আর শত্রুদের মনে ভয় ধরায়।"
এই শিল্প আরও দেখায়– কীভাবে একটি দেশ ন্যাটো-মানের যুদ্ধাস্ত্র উৎপাদনে উচ্চ মাত্রার আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করতে পারে। ১৯৭৪ সালের সাইপ্রাস যুদ্ধের পর এই প্রয়াস প্রথম শুরু হয়েছিল, যখন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা তুরস্কের বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরশীলতাকে উন্মোচিত করে দেয়। এরদোয়ানের আমলে এই উদ্যোগ আরও গতি পায়, যেখানে রাষ্ট্রীয় তহবিলের বিনিয়োগ পায় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। আর প্রায়ই সেটা দেওয়া হয়েছে বাজেটের বাইরে বিশেষ প্রতিরক্ষা তহবিলের মাধ্যমে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৮ সালে এই তহবিলের ব্যয় জিডিপির প্রায় শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশে পৌঁছেছিল, যা প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের সমতুল্য।
তুরস্কের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, "আমরা আমাদের অতীতের প্রতিরক্ষা উদ্যোগের সুফল পাচ্ছি।" তিনি পূর্বাভাস দেন যে, চলতি বছর প্রতিরক্ষা রপ্তানি প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে ১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। মুচকি হেসে তিনি আরও বলেন, "ইউরোপের আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।"
আজ ইউরোপও তাদের প্রতিরক্ষা শিল্প পুনর্গঠন এবং সরবরাহ চেইন সুরক্ষিত করতে একই ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। তুর্কি কর্মকর্তাদের দাবি, মূল্যমানের দিক থেকে তুরস্কের প্রতিরক্ষা উপকরণের ৮০ শতাংশেরও বেশি অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করা হয়।
ন্যাটোর একজন সিনিয়র প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, "তুরস্কের প্রচুর উদ্যোক্তা মনোভাব, প্রকৌশলগত দক্ষতা এবং শিল্পের এমন বিশাল পরিধি রয়েছে যা কেবল জার্মানির সঙ্গেই তুলনা করা চলে। কিন্তু জার্মানি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাছাড়া তুর্কিরাই ন্যাটোর বৈঠকগুলোতে সবচেয়ে ভালো প্রস্তুতি নিয়ে আসে এবং সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলো করে। আপনি অবশ্যই তাদের আপনার পক্ষে রাখতে চাইবেন।"
এরপরেও কেবল তুরস্কের অস্ত্রভাণ্ডারই তাকে একটি অবিচল মিত্র বানায় না। দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্প বেশ কিছু বাধার সম্মুখীন, যা তুরস্ক সম্পর্কে তার অনেক ন্যাটো মিত্রদের গভীর দ্বিধাদ্বন্দ্বকে প্রকাশ করে।
প্রথম এবং সবচেয়ে প্রতীকী সমস্যাটি হলো বাজার থেকে বাদ পড়া। ন্যাটোর সদস্য হলেও ইইউ সদস্য দেশ না হওয়ায়, আঙ্কারাকে ব্রাসেলসের ১৫০ বিলিয়ন ইউরোর অস্ত্র ক্রয়ের ঋণ প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ইইউ-এর যৌথ বাজেটের বিপরীতে গঠিত এই প্রকল্পটির উদ্দেশ্য প্রতিরক্ষা উৎপাদন, উদ্ভাবন এবং আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা বৃদ্ধি।
তুরস্ক ব্রাসেলসকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করার মাধ্যমে এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছে। এরদোয়ানের জামাতা সেলজুক বায়রাক্তারের নেতৃত্বাধীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত শীর্ষস্থানীয় ড্রোন-নির্মাতা প্রতিষ্ঠান 'বায়কার' ইতালীয় কোম্পানি লিওনার্দোর সাথে যৌথ উদ্যোগ শুরু করেছে, যা ইউরোপে কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে ইইউ তহবিলের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে। একইভাবে তুর্কি গোলাবারুদ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান 'রেপকন' জার্মানিতে উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি সই করেছে।
গত বছরের শেষের দিকে তুরস্ক স্পেনের বিমান বাহিনীর কাছে ৩০টি প্রশিক্ষণ বিমান বিক্রি করে, যা এয়ারবাসের সাথে যৌথভাবে ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইউরোর চুক্তিতে উৎপাদিত হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যৌথ উৎপাদনের উদ্যোগটি অন্যান্য তুর্কি প্রতিরক্ষা প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রেও করা হতে পারে।
আঙ্কারাভিত্তিক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আরদা মেভলুতোলু বলেন, "(ইইউ-এর সঙ্গে) সহযোগিতার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো তাদের নিজস্ব অ্যাভিওনিক্স এবং অস্ত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে তুর্কি প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিজেদের মতো ব্যবহার করতে পারে।"
এ ধরনের যৌথ উদ্যোগ বর্তমানের এই 'লেনদেন-ভিত্তিক ব্যবস্থার যুগে'র সাথেও মানানসই। কিন্তু তুরস্কের নিরাপত্তা ভূমিকার ওপর কোনো সামগ্রিক ইউরোপীয় চুক্তির অংশ না হওয়ায় এর অগ্রগতি সীমিত। তুর্কি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কোরকমাজ বলেন, "ইউরোপ তুরস্কের কাছ থেকে কী চায়? সেটি স্পষ্ট নয়, যা একটি বড় সমস্যা। সম্পর্কটি বজায় রয়েছে কারণ এটি জরুরি, কিন্তু কোনো রাজনৈতিক অবকাঠামো না থাকায় এর অগ্রগতি হচ্ছে না। এটি ছাড়া তুরস্ক কৌশলগত আলোচনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও, রাজনৈতিক কারণে কম প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়তে পারে।"
দ্বিতীয় সমস্যাটি অর্থনৈতিক। তুরস্কের প্রতিরক্ষা খাত হয়তো চাঙ্গা, কিন্তু সামগ্রিক অর্থনীতি ৩৩ শতাংশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধিসহ নানা কারণে জর্জরিত, যা অন্যান্য পণ্য উৎপাদকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। তাছাড়া আইনের শাসন নিয়ে উদ্বেগের কারণে অন্যান্য খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের ২০২৫ সালের আইনের শাসন সূচকে ১৪৩টি দেশের মধ্যে তুরস্কের অবস্থান ১১৮তম, যা রাশিয়ার মাত্র এক ধাপ ওপরে।
ন্যাটোর সেই প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা আরও বলেন, "তুরস্কের আইনি ব্যবস্থা পুঁজিকে ঝুঁকিতে ফেলে। এই কারণেই—রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত বড় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক যোগাযোগসম্পন্ন দুই-একটি বেসরকারি কোম্পানি ছাড়া—তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পে পুঁজি বিনিয়োগের পরিমাণ কম থাকে। যা এই খাতের প্রবৃদ্ধি ও গভীরতাকে সীমিত করে দেয়।"
তৃতীয় সমস্যাটি হলো নির্ভরযোগ্যতা। আঙ্কারা প্রায়শই বাহ্যিক চাপ সহ্য করার সক্ষমতা এবং জাতীয় সংকল্প প্রদর্শনের জন্য তার প্রতিরক্ষা শিল্পকে বাড়িয়ে গুছিয়ে প্রচার করে। কিন্তু এই অতি-প্রচার কখনো কখনো হিতে-বিপরীত হতে পারে।
গত বছর অনেক তুর্কি নাগরিক অবাক হয়েছিলেন যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান স্বীকার করেন যে, তুরস্কের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের অন্যতম সেরা অর্জন—পঞ্চম প্রজন্মের 'কান' ফাইটার জেটটি বিদেশি ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরশীল। চলতি বছরও একই রকম অতিরঞ্জনের মাধ্যমে 'ইলদিরিমহান' নামের একটি পরীক্ষামূলক ব্যালিস্টিক মিসাইলের পাল্লা ৬,০০০ কিলোমিটার বলে দাবি করা হয়। এই দাবি অবিশ্বাস্য বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ, কারণ এটি তুরস্কের বর্তমান দীর্ঘতম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে ১০ গুণ বেশি।
ইউরোপের আরেকজন জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ইলদিরিমহানের কথা উল্লেখ করে বলেন, "তুর্কিরা অ্যাপাচির মতো হেলিকপ্টার বানাচ্ছে, তাদের ড্রোন আছে, জ্যামার আছে... তারা ইউরোপের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল প্রতিরক্ষা শিল্পের অধিকারী। তবে এই নতুন সিস্টেমগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটি কতটা চিত্তাকর্ষক, তা দেখার বিষয় রয়েছে।" তিনি আরও যোগ করেন, "ন্যাটোর বড় মিত্ররা কি সত্যিই নিজেদের নিরাপদ রাখতে তাদের ওপর ভরসা করতে পারবে?"
