মার্কিন সেনাদের কাবুল ছাড়ার ৫ বছর: অন্তহীন যুদ্ধ ও আমেরিকার ভুল মূল্যায়নের চড়া খেসারত
পাঁচ বছর আগে আফগানিস্তানে আমেরিকার ২০ বছরের দীর্ঘ যুদ্ধের এক অসম্মানজনক সমাপ্তি ঘটেছিল। ২০২১ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের চূড়ান্ত সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করে। লক্ষ্য ছিল, সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশটিতে থাকা অবশিষ্ট আড়াই হাজার মার্কিন সেনাকে ফিরিয়ে আনা।
কিন্তু প্রথম মার্কিন সেনাদল আফগানিস্তান ছাড়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আফগান সরকারি বাহিনী তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে এবং তালেবান একের পর এক এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে। আগস্টের শুরুর দিকেই তারা বেশির ভাগ প্রাদেশিক রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।
অবশেষে ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট কাবুলে মার্কিন-সমর্থিত সরকারের পতন ঘটে। লাখ লাখ আতঙ্কিত আফগান কাবুল বিমানবন্দরে ভিড় জমায়।
যুক্তরাষ্ট্র, তার মিত্র দেশগুলো এবং এমনকি কিছু বেসরকারি গোষ্ঠী মিলে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষকে বিমানে করে সরিয়ে নেয়। তবে ৩০ আগস্ট শেষ মার্কিন সেনা আফগানিস্তান ছাড়ার মাত্র চার দিন আগে, ওই বিমানবন্দরে এক ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা হামলায় ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হন। এই ঘটনাটি ছিল এক চূড়ান্ত ও হৃদয়বিদারক আঘাত।
এভাবেই দুই দশকের এক লড়াই শেষ পর্যন্ত চরম অপমানে পরিণত হয়।
ভুল হিসাবের চরম মূল্য
কাবুল পতনের পর নানা দোষারোপ ও পাল্টা অভিযোগ শুরু হয়—যার কিছু যৌক্তিক ছিল, আর কিছু ছিল না।
যে তালেবান নাইন-ইলেভেন হামলার সময় আল-কায়েদাকে আশ্রয় দিয়েছিল, তারাই আবার বিজয়ীর বেশে ক্ষমতায় ফিরে আসে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে নতুন করে সন্ত্রাসবাদের হুমকি মাথাচাড়া দেওয়ার ভয় বাড়তে থাকে।
কারণ, একের পর এক মার্কিন প্রেসিডেন্ট আফগানিস্তানে সেনা রাখার পেছনে একটাই যুক্তি দেখিয়েছিলেন—মার্কিন সেনা না থাকলে তালেবান পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ না নিলেও, আফগানিস্তান আবার সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হবে।
কিন্তু বাস্তবে এমন কিছুই ঘটেনি। গত পাঁচ বছরে আফগানিস্তানে থাকা কোনো গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একটি সন্ত্রাসী হামলাও চালায়নি।
অথচ এই যুদ্ধের পেছনে ওয়াশিংটন প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। ১ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি আফগান বেসামরিক মানুষ নিহত বা আহত হয়েছেন। ৭ লাখ ৭৫ হাজারেরও বেশি মার্কিন সেনা আফগানিস্তানে মোতায়েন করা হয়েছিল, যাদের মধ্যে ২০ হাজার ৭০০ জনের বেশি আহত এবং ২ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি নিহত হয়েছেন।
এই এত বিশাল আত্মত্যাগ করা হয়েছিল শুধু এমন একটি হুমকি থেকে বাঁচতে, যা আসলে বাস্তবে অতিরিক্ত ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছিল!
আজ মার্কিন কর্মকর্তারা যা জানেন, তা যদি তখন জানতেন, তবে অনেকেই হয়তো আরও আগে সেনা প্রত্যাহারের পক্ষে জোরালো যুক্তি দিতেন।
তবে এই বিষয়টি মেনে নেওয়া বেশ অস্বস্তিকর। কারণ এটি মার্কিন নেতাদের বিচারবুদ্ধি, নীতি নির্ধারণের কার্যকারিতা এবং পুরো অভিযানের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে।
ওয়াশিংটন হয়তো আরও ভালো কোনো ফলাফল পেতে পারত, অথবা অন্তত যুদ্ধটা আরও ছোট হতে পারত। যদি কর্মকর্তারা আগেভাগেই সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করতেন, বিভিন্ন ধরনের হুমকির মূল্যায়ন করতেন, দ্রুত আলোচনার পথে হাঁটতেন এবং কিছু ক্ষেত্রে 'পরাজয় মেনে না নেওয়ার' জেদ পরিহার করতেন, তবে হয়তো চিত্রটা অন্য রকম হতো।
কেন আফগানিস্তানে সেনা মোতায়েন?
২০০১ সালের ৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ. বুশ বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেওয়া নাইন-ইলেভেন হামলার প্রতিশোধ নিতে আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালান। কয়েক মাসের মধ্যেই মার্কিন বিমান হামলা, বিশেষ বাহিনীর (স্পেশাল ফোর্সেস) অভিযান, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং আফগান মিলিশিয়া 'নর্দার্ন অ্যালায়েন্স'-এর যৌথ হামলায় আল-কায়েদা পিছু হটে এবং মোল্লা ওমরের নেতৃত্বাধীন তালেবান সরকারের পতন ঘটে।
আফগান নেতা হামিদ কারজাইয়ের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়। পরের চার বছর দেশটি শান্ত থাকার একটি মিথ্যা আভাস দেয়। এই প্রাথমিক সাফল্য বুশ প্রশাসনকে ২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসন চালাতে প্রলুব্ধ করে। এর ফলে শুরু হয় আরেকটি ভয়াবহ যুদ্ধ, যা পরের পাঁচ বছর ওয়াশিংটনের মনোযোগ কেড়ে রাখে। আর ঠিক এই সময়ের মধ্যেই তালেবান পুনরায় সংঘটিত হওয়ার সুযোগ পায়। ২০০৬ সাল নাগাদ তারা আবার ভূখণ্ড দখল করতে শুরু করে এবং আফগান সরকারকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।
এই পুরো সময়জুড়ে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদের আতঙ্কে ভুগছিল। নাইন-ইলেভেনের ভয়াবহতা, এরপরের অ্যানথ্রাক্স হামলা এবং ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপে বেশ কয়েকটি প্রাণঘাতী জিহাদি বোমা হামলা ও নস্যাৎ হওয়া ষড়যন্ত্র এই আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল।
'সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বযুদ্ধ' (গ্লোবাল ওয়ার অন টেরর) তখন তুঙ্গে এবং এর প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র ছিল আফগানিস্তান। প্রেসিডেন্ট, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সামরিক কমান্ডার এবং গোয়েন্দা প্রধানদের কথায় এটাই স্পষ্ট ছিল যে সন্ত্রাসবাদ দমনই আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক তৎপরতার মূল লক্ষ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তানে আরও কিছু উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল—একটি টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে 'নেশন-বিল্ডিং' বা জাতি গঠনের মিশন। প্রেসিডেন্ট বুশ প্রকাশ্যে এই লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করেছিলেন। যদিও তার উত্তরসূরিরা এই নীতি থেকে সরে আসার চেষ্টা করেছিলেন, তবু এটি মার্কিন প্রকল্পের একটি অলিখিত অংশ হিসেবে রয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু সত্যি বলতে, সন্ত্রাসী হুমকি না থাকলে তালেবানের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ হতো না, আফগান সামরিক বাহিনীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো না এবং নেশন-বিল্ডিং বা গণতন্ত্র প্রসারের মতো কোনো উদ্যোগও নেওয়া হতো না। মূলত সন্ত্রাসবাদই ছিল এই যুদ্ধের মূল চালিকা শক্তি।
তবে এর মানে এই নয় যে যুদ্ধের কৌশল বা উদ্দেশ্য সব সময় পরিষ্কার ছিল বা সবাইকে বোঝানো সম্ভব হয়েছিল। অনেকেই এই যুদ্ধের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে গভীরভাবে সন্দিহান হয়ে পড়েছিলেন। যখন সহযোদ্ধারা নিহত বা আহত হতেন, তখন এই সংশয় অনেক সময় ক্ষোভে রূপ নিত।
তালেবানদের ক্ষমতা দখল
২০২১ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন একটি কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েন: সন্ত্রাসী হুমকি দমাতে ২ হাজার ৫০০ সেনা আফগানিস্তানে রাখা, নাকি ট্রাম্পের চুক্তি অনুযায়ী সেনা প্রত্যাহার করা।
যেকোনো একটি কৌশলই বাস্তবায়নযোগ্য ছিল। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান মার্ক মিলি এবং জ্যেষ্ঠ মার্কিন জেনারেলরা সেনা রাখার পক্ষে ছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, আফগানিস্তানের ভেতর থেকে সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযান আরও ভালোভাবে চালানো সম্ভব এবং মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি আফগান সরকারের পতন ঠেকাবে।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তালেবানের সঙ্গে হওয়া ট্রাম্পের চুক্তিতে বলা হয়েছিল, ২০২১ সালের মে মাসের মধ্যে ওয়াশিংটন তাদের সব সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করবে। এর বিনিময়ে তালেবান প্রতিশ্রুতি দেয়, তারা আল-কায়েদাকে আফগানিস্তান থেকে সদস্য সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ বা কোনো অভিযান চালাতে দেবে না। যদিও তালেবান আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
বাইডেন নিজেও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন এবং ভিয়েতনামের মতো পতনের আশঙ্কাও স্বীকার করেছিলেন। তবে তিনি একটি অন্তহীন মিশন থেকে বেরিয়ে আসার দিকেই বেশি ঝুঁকেছিলেন। বাইডেনের কাছে কোভিড-১৯ মহামারি, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং ধুঁকতে থাকা মার্কিন অর্থনীতি অনেক বেশি চিন্তার বিষয় ছিল।
২০২১ সালের এপ্রিলে বাইডেন ঘোষণা দেন যে ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে। প্রশাসন বিশ্বাস করত, এরপরও আফগান সরকার অন্তত ছয় মাস টিকে থাকবে।
কিন্তু আগস্টেই কাবুলের পতন হয় এবং তখন থেকেই তালেবান আফগানিস্তান শাসন করছে। তাদের নেতৃত্বে রয়েছেন কঠোর প্রকৃতির আমির মৌলভি হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা। ২০১৬ সালে এই শীর্ষ পদে বসার আগে তিনি তালেবানের ইসলামি আদালতের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। এই পদের কারণেই অনেক আফগানের কাছে তার নেতৃত্ব ধর্মীয় বৈধতা পেয়েছে।
শোনা যায়, ২০১৮ সালে হেলমান্দে নিজের ছেলের আত্মঘাতী বোমা হামলার অনুমোদনও তিনি দিয়েছিলেন। মোল্লা ওমরের পদাঙ্ক অনুসরণ করে হিবাতুল্লাহ কাবুল থেকে নয়, বরং তালেবানের ঐতিহ্যবাহী শক্ত ঘাঁটি কান্দাহার থেকে দেশ চালান এবং সব সময় নিজেকে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখেন।
এদিকে কাবুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন সিরাজুদ্দিন হাক্কানি। তিনি 'হাক্কানি নেটওয়ার্ক' নামে পরিচিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নেতা এবং যুদ্ধকালীন অসংখ্য আত্মঘাতী হামলার মূল পরিকল্পনাকারী। ২০১৭ সালে জার্মান দূতাবাসের সামনে তার নির্দেশেই ট্রাক বোমা হামলা হয়েছিল, যাতে ১৫০ জন আফগান নিহত এবং ৪০০ জনের বেশি আহত হন।
ঠিক এ ধরনের নেতাদের উত্থানের আশঙ্কাই করতেন মার্কিন কর্মকর্তারা। তারা ভাবতেন, আমেরিকা চলে যাওয়ার পর আফগানিস্তানের অবস্থা ঠিক এমনটাই হবে।
তালেবান শাসনে আফগানিস্তান: স্থিতিশীলতা নাকি সংকট?
কিন্তু নতুন করে বিশৃঙ্খলা বা হত্যাযজ্ঞ শুরু হওয়ার বদলে, তালেবান শাসন বরং একটি তুলনামূলক স্থিতিশীল সময় নিয়ে এসেছে। গত পাঁচ বছর ধরে দেশটি শান্তিতে রয়েছে, যা ১৯৭৯ সালের পর সবচেয়ে দীর্ঘ শান্তির সময়।
ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মাঝে মাঝে করা কিছু হামলা ছাড়া, এই সরকারের বিরুদ্ধে খুব একটা প্রতিরোধ দেখা যায়নি। আফগানরা প্রায়ই বলে যে দেশটি এখন 'আরাম' বা শান্ত।
নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পর থেকে তালেবানরা আফগান জনগণের ওপর নির্মম কোনো নিপীড়ন চালায়নি। তারা পরিকল্পিতভাবে তাদের সাবেক প্রতিপক্ষ বা যারা যুক্তরাষ্ট্র, তার মিত্র বা আফগান সরকারের সঙ্গে কাজ করেছিল, তাদের কারাবন্দী করেনি। তালেবান গভর্নর এবং বিচারকেরা এই মানুষগুলোকে তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপনের সুযোগ দিয়েছেন। তাদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—ক্ষোভের বশে নিচু স্তরের কোনো তালেবান সদস্যের হামলা, অথবা পুরোনো শত্রুতা মেটাতে স্থানীয় বিরোধীদের নেওয়া প্রতিশোধ।
তালেবান শাসনের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত দিকটি হলো—পপি চাষ নিষিদ্ধ করা। এই পপি চাষই দীর্ঘকাল ধরে আফগানিস্তানকে আন্তর্জাতিক হেরোইন বাণিজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করেছিল। যুদ্ধের সময় পপি ছিল তালেবানের রাজস্ব আয়ের একটি প্রধান উৎস।
কিন্তু ২০২২ সালে হিবাতুল্লাহ সব ধরনের মাদক চাষ, বিক্রি এবং সেবন নিষিদ্ধ করেন। প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত এবং দীর্ঘ কারাদণ্ডের ভয়ে এবং মাঠপর্যায়ে পপি খেত ধ্বংস করার কারণে ২০২৩ সালে পপি চাষ প্রায় ৯৫ শতাংশ কমে যায় বলে জাতিসংঘের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। তালেবানরা এই অসাধ্য সাধন করেছে, যদিও এর ফলে তাদের কর আদায়ের পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমে গেছে এবং জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংকট ও নারীদের দুর্দশা
অবশ্য এর পাশাপাশি অনেক বড় ধাক্কাও এসেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে গেছে এবং দারিদ্র্য আরও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো আফগান নারীদের চরম দুর্দশা। ২০২২ সালে হিবাতুল্লাহ এক নির্দেশ জারি করে মেয়েদের মাধ্যমিক স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ করেন। নারীদের কাজ করা এবং কোনো পুরুষ আত্মীয় ছাড়া বাড়ির বাইরে বের হওয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্যসেবার অবনতি নারীদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, কারণ হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতেই নারীদের সেবায় নিবেদিত কিছু কর্মী ছিলেন। তালেবান যখন ক্ষমতায় ছিল না, তখন দেশের কিছু অংশে আফগান নারীরা অধিকার ও সুযোগের ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিলেন। ২০০০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে নারীদের মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ হয়েছিল। অন্তত কাবুলে এক প্রজন্মের আফগান নারীরা শিক্ষা, চাকরির সুযোগ এবং নিজেদের জীবন গড়ার স্বপ্ন নিয়ে বড় হয়েছিলেন। কিন্তু তালেবানের নীতি তাদের সেই স্বপ্নগুলো চুরমার করে দিয়েছে।
মার্কিন স্বার্থের জন্য স্বস্তি
তবে মার্কিন এবং পশ্চিমা স্বার্থের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ঘটনাটি ঘটেছে, তা হলো—সন্ত্রাসবাদের অনুপস্থিতি। আফগান ভূখণ্ডে আল-কায়েদা সংঘবদ্ধ হচ্ছে, তহবিল সংগ্রহ করছে বা প্রশিক্ষণ নিচ্ছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই।
আফগান এমিরেতের অনুমতি নিয়েই সম্ভবত পাকিস্তানি তালেবানের যোদ্ধা ও নেতারা আফগানিস্তানে আশ্রয় নিয়েছে এবং সেখান থেকে তারা পাকিস্তানের মাটিতে ৭০০ বার হামলা চালিয়েছে। এর ফলে শুরু হওয়া যুদ্ধে পাকিস্তান আফগানিস্তানের বাগরাম, কাবুল, পাক্তিয়া এবং কান্দাহারে বোমা হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে আফগান বাহিনী পাকিস্তানের সীমান্ত চৌকিগুলোতে হামলা করেছে।
এদিকে, ইসলামিক স্টেটের (আইএস) কয়েক হাজার যোদ্ধা আফগানিস্তানে রয়ে গেছে, যারা কাবুলে তালেবান সরকারের ওপর বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। কিন্তু গত পাঁচ বছরে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো সন্ত্রাসী হামলা হয়নি।
একসময় আল-কায়েদাকে আশ্রয় দিলেও এবং দেশের অর্থনীতি সামলাতে ব্যর্থ হলেও, ২০২১ সালের পর থেকে তালেবানরা বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদ উসকে দেয়নি; বরং তা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।
তবে পরিস্থিতি উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ, আফগানিস্তানের ওপর নজরদারি করার ক্ষমতা ওয়াশিংটনের এখন আর ২০২০ বা ২০১১ সালের মতো নেই। দুর্গম পাহাড়ি গ্রামে বা কাবুল, কান্দাহার বা জালালাবাদের অলিগলিতে সন্ত্রাসীদের ষড়যন্ত্র বা প্রশিক্ষণ হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের রাডারে ধরা পড়বে না।
২০২৩ সালে জাতিসংঘের তদন্তকারীদের একটি দল জানায় যে আফগানিস্তানে এখনো প্রায় ৪০০ আল-কায়েদা সদস্য রয়েছে, যারা সক্রিয়ভাবে তাদের ঘাঁটি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। একইভাবে, ইসলামিক স্টেটের আফগান শাখাটিও বর্তমানে যা মনে হচ্ছে তার চেয়ে বেশি শক্তিশালী হতে পারে। তারা হয়তো তালেবানকে দুর্বল করার বদলে পশ্চিমা স্বার্থে আঘাত হানার দিকে মনোযোগ ঘোরাতে পারে।
কেন সেনা প্রত্যাহারে এত বিলম্ব?
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, কেন মার্কিন কর্মকর্তারা সেনা প্রত্যাহারের ঝুঁকিকে এত বড় করে দেখেছিলেন এবং এত দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?
এর অন্যতম কারণ ছিল অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। নাইন-ইলেভেনের পর সাধারণ আমেরিকানরা যদি জিহাদি আতঙ্কে না ভুগত এবং যুদ্ধের প্রভাব যদি তাদের দৈনন্দিন জীবনে আরও গভীরভাবে পড়ত, তবে হয়তো গণবিক্ষোভ, নির্বাচনী রাজনীতি এবং কংগ্রেসের বিরোধিতার কারণে কোনো প্রেসিডেন্ট অনেক আগেই সেনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হতেন।
পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, ২০১১ সালের মে মাসে ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর ঠিক পরের বছরগুলোই ছিল যুদ্ধ শেষ করার সেরা সময়। ওয়াশিংটনের সবচেয়ে কুখ্যাত শত্রুর মৃত্যু হয়েছিল এবং তার সংগঠন ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। তা ছাড়া তত দিনে এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে ২০০৯ সালে ওবামা আফগানিস্তানে যে বিপুল সেনা পাঠিয়েছিলেন, তার খরচ মেটানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তখন কঠিন হয়ে পড়ছে।
পুরো আফগান যুদ্ধজুড়েই নীতি নির্ধারণী বিতর্কের আড়ালে সেখানে থাকার আরেকটি অলিখিত কারণ কাজ করত: পরাজয়ের গ্লানি বা অপমান।
তালেবানের ব্যর্থতা
তালেবানও সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টিকে খুব একটা সহজ করে দেয়নি। ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে তালেবান প্রতিনিধিরা মার্কিন আলোচকদের বারবার বলেছিলেন যে আফগান মাটি ব্যবহার করে বিদেশে কোনো সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা বা বাস্তবায়ন করতে তারা কাউকে অনুমতি দেবে না। কিন্তু আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রেখে তারা নিজেরাই পরিস্থিতি ঘোলাটে করে তুলেছিল।
২০১৯ সালে কাতারে মার্কিনিদের সঙ্গে তালেবান প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎকারের সময় তারা স্বীকার করেছিল যে তারা আল-কায়েদার সঙ্গে কাজ করছে এবং চায় এর সদস্যরা আফগানিস্তানে বসবাস করুক। আল-কায়েদার তহবিল সংগ্রহ, সদস্য সংগ্রহ এবং প্রশিক্ষণ নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে কোনো লিখিত গ্যারান্টি দিতে তারা অস্বীকৃতি জানায়।
যদি ওয়াশিংটনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হয়ে থাকে সন্ত্রাসী হুমকিকে বাড়িয়ে দেখা বা এর ভুল মূল্যায়ন করা, তবে তালেবানের ব্যর্থতা ছিল একেবারে শেষ মুহূর্তে এসেও আল-কায়েদার সঙ্গে পুরোপুরি সম্পর্ক ছিন্ন না করে সেই হুমকিকে বাঁচিয়ে রাখা।
যুদ্ধের শিক্ষা
আফগান যুদ্ধের বেশির ভাগ সময়ই অধিকাংশ মার্কিন নেতা এবং সাধারণ আমেরিকানরা ভেবেছিলেন, নিরাপত্তার যে সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে, তা হতাহতের মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু আজ প্রায় কেউই আর তা বিশ্বাস করেন না।
আমেরিকার অন্যান্য যুদ্ধের পরও ঠিক এভাবেই মানুষের মনোভাব পাল্টেছে, যার সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো ভিয়েতনাম এবং ইরাক যুদ্ধ। প্রতিটি ক্ষেত্রেই, ওই নির্দিষ্ট সময়ে যুদ্ধটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল। কিন্তু বছর পার হওয়ার পর অনেকেই ভেবেছেন, 'যদি আগে থেকে জানা যেত যে পরিণতি এমন হবে, তবে এত বড় আত্মত্যাগকে আমরা কখনোই সমর্থন করতাম না।'
আমেরিকানদের এই মনোভাবের পরিবর্তন বা ভুল বোঝার বিষয়টি কখনোই ভোলা উচিত নয়। তাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, যে যুদ্ধকে তারা একসময় সাদরে গ্রহণ করেছিল, আজ তার দিকে ফিরে তাকিয়ে তাদের কেমন লাগছে!
আজ তাদের শুধু একটি কথাই মনে হয়, 'যদি তখন জানতাম, যা আজ আমি জানি!'
