ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্প: ৩২ ঘণ্টা পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার ১৮ দিনের শিশু
শহরগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, এক হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, এখনো ৫০ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়—এসবের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় আশার আলো খুবই ক্ষীণ।
তবুও বুধবার দেশটিতে আঘাত হানা দুটি ভূমিকম্পের পর বেঁচে যাওয়ার অসাধারণ কিছু ঘটনা জাতিকে নতুন করে সাহস জোগাচ্ছে।
শুক্রবার ধ্বংসস্তূপের নিচে টানা ৩২ ঘণ্টা আটকে থাকার পর ১৮ দিন বয়সী এক নবজাতককে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তাকে উদ্ধারের সময় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহর লা গুয়াইরায় উপস্থিত মানুষ উল্লাসধ্বনি ও করতালিতে ফেটে পড়েন।
কম্বলে মোড়ানো শিশুটিকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে একজনের হাত থেকে আরেকজনের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে তাকে তার অশ্রুসজল বাবার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়।
এর ঠিক নব্বই মিনিট পর শিশুটির মাকেও ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
ঘটনাটির ভিডিও ধারণকারী আন্দ্রেইনা কুইন্তেরোর ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে মাকে জানানো হয় যে ভূমিকম্পের সময় নিজের শরীর দিয়ে শিশুটিকে ঢেকে রাখার কারণেই তিনি তার সন্তানের জীবন বাঁচাতে পেরেছেন।
এই ঘটনাটি ছিল বহু অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়ার কাহিনির মাত্র একটি। ক্ষমতাচ্যুত নিকোলাস মাদুরোর স্থলাভিষিক্ত ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ বলেন, এই ঘটনাগুলো 'এই দুর্যোগের মধ্যেও আমাদের আনন্দ দেয়'।
আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, লা গুয়াইরায় একটি আবাসিক ভবন ধসে পড়ার পর ২৪ ঘণ্টা আটকে থাকা চার বছর বয়সী এক শিশুপুত্রকে উদ্ধার করা হচ্ছে।
এরপর উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে তার মা ও বাবাকেও জীবিত বের করে আনেন। পরে তাদের ছেলের সঙ্গে পুনর্মিলন ঘটে।
পরপর সংঘটিত ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানে। এ ধরনের পরপর সংঘটিত ভূমিকম্পকে 'ডাবলেট' বলা হয়। এতে দেশটিতে ২৫০টিরও বেশি ভবন ধসে পড়ে এবং হাজার হাজার মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার বলেন, ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'সোনালি সময়' দ্রুত শেষ হয়ে আসছে।
শনিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানায়, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে শীর্ষ আইনপ্রণেতা হোর্হে রদ্রিগেজ বলেছেন, মৃতের সংখ্যা বেড়ে এক হাজার ৪৩০ জনে দাঁড়িয়েছে এবং আহত হয়েছেন তিন হাজার ২৩৮ জন।
জাতিসংঘের পাশাপাশি ব্রাজিল, কানাডা, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, এল সালভাদর, কিউবা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্ব থেকে উদ্ধারকারী দল এবং মানবিক সহায়তা পাঠানো হয়েছে।
ব্রিটিশ অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল, প্রশিক্ষিত কুকুর এবং ড্রোন বহনকারী একটি বিমান শুক্রবার রয়্যাল এয়ার ফোর্সের বিমানঘাঁটি ব্রাইস নর্টন থেকে ভেনেজুয়েলার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। মার্সিসাইড অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার বিভাগের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে যুক্তরাজ্যের ১৪টি অগ্নিনির্বাপণ সংস্থার বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়েছেন।
তবে রাজধানী কারাকাসের ঠিক উত্তরে অবস্থিত সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর একটি লা গুয়াইরায় ত্রাণ তৎপরতার ধীরগতিকে ঘিরে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। সেখানে ভারী যন্ত্রপাতির অভাব এবং সরকারের সীমিত উপস্থিতির কারণে বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবকেরা এখনো খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে মানুষ খুঁজে চলেছেন।
কারাকাসের একটি বিধ্বস্ত এলাকায় ভারপ্রাপ্ত নেত্রী সফরে গেলে স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে ওদওখ বিদ্রূপ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ভুক্তভোগীদের একজন, ৪০ বছর বয়সী মারহোসলি সালাসার, ভূমিকম্পে তার ১৬ বছর বয়সী মেয়েকে হারিয়েছেন। আর তার শিশু সন্তান এখনো নিখোঁজ।
তিনি বলেন, 'আমি আমার ছোট্ট গায়েলকে খুঁজছি... ওর বয়স ছিল মাত্র পাঁচ মাস।'
তিনি আরও বলেন, 'দয়া করে, আমাদের এখানে সহায়তা প্রয়োজন। স্তম্ভগুলো সরাতে আমাদের ভারী যন্ত্রপাতি দরকার। এখানে আমরা এখন পর্যন্ত সরকারের কোনো কর্মকর্তাকেই দেখিনি, একজনকেও না।'
শত শত ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে, যার মধ্যে হাসপাতালও রয়েছে। ফলে আহতদের অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
রাজা তৃতীয় চার্লস ও রানি ক্যামিলা বলেন, এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞে তারা 'গভীরভাবে মর্মাহত'। তারা ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি তাদের 'গভীর সমবেদনা' প্রকাশ করেন।
এক বিবৃতিতে রাজা বলেন, 'আমার স্ত্রী এবং আমি আপনার দেশে আঘাত হানা ভয়াবহ ভূমিকম্প এবং এর ফলে ঘটে যাওয়া প্রাণহানি ও দুর্ভোগের সংবাদে গভীরভাবে মর্মাহত। এই অত্যন্ত কঠিন সময়ে আমরা যেসব মানুষ তাদের প্রিয়জন, ঘরবাড়ি ও জীবিকার উৎস হারিয়েছেন, তাদের সবার প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।'
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার এই দুটি ভূমিকম্পে সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৬৭০ কোটি মার্কিন ডলার, যা প্রায় ৫০০ কোটি পাউন্ডের সমান।
দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি ছিল এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়ায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।
এই ভূমিকম্প এমন এক সময়ে আঘাত হানে, যখন তেলসমৃদ্ধ দেশটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা অর্থনৈতিক ধসের সঙ্গে লড়াই করছে।
এই সংকট দেশটির হাসপাতাল ও সরকারি সেবাব্যবস্থাকে কার্যত ভেঙে ফেলেছে এবং এর ফলে লাখো মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র অপহরণ করার ছয় মাস পরও দেশটি একটি নাজুক রাজনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ঘোষণা করেছে, ভূমিকম্প-পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় আর্থিক লেনদেনের সুযোগ দিতে দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করা হবে।
