এআই ডেটা সেন্টারের কারণে বাড়ছে তাপমাত্রা; বিশ্বজুড়ে কোথায় গড়ে উঠছে এসব বিশাল স্থাপনা?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালাতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে প্রতিযোগিতায় নেমেছে বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে ক্রমবর্ধমান গবেষণা ও প্রমাণ বলছে, গুগল, অ্যামাজন ও মাইক্রোসফটের মতো বৃহৎ ক্লাউড সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালিত বিশাল এআই ডেটা সেন্টার বা 'হাইপারস্কেলার'গুলো শুধু প্রযুক্তি খাতকেই এগিয়ে নিচ্ছে না, আশপাশের এলাকার তাপমাত্রাও বাড়িয়ে তুলছে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ডেটা সেন্টারের আশপাশের এলাকার তাপমাত্রা গড়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যায়। কোনো কোনো এলাকায় এ বৃদ্ধি ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছে। গবেষকরা এই ঘটনাকে 'ডেটা হিট আইল্যান্ড এফেক্ট' নামে অভিহিত করেছেন।
এআই ডেটা সেন্টারগুলো কতটুকু বিদ্যুৎ খরচ করে?
প্রতিবার যখন কেউ চ্যাটজিপিটি, জেমিনি বা ক্লড ব্যবহার করে কোনো তথ্য খোঁজেন, তখন সেই অনুরোধটি মূলত একটি ডেটা সেন্টারে প্রসেস করা হয়। এই সেন্টারগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী কম্পিউটার বা সার্ভার দিয়ে সাজানো থাকে, যা বছরের ৩৬৫ দিনই ২৪ ঘণ্টা বিরতিহীনভাবে চলতে থাকে। এই সার্ভারগুলোতে সাধারণ ওয়েবসাইটের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী প্রসেসর বা চিপ ব্যবহার করা হয়, যা সমান্তরালভাবে হাজার হাজার হিসাব সম্পন্ন করতে পারে। ফলে এআই সচল রাখা এই ডেটা সেন্টারগুলো সাধারণ সার্ভারের তুলনায় অনেক বেশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অপচয় করে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, কেবল ২০২৪ সালেই বিশ্বের ডেটা সেন্টারগুলো প্রায় ৪১৫ টেরাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ খরচ করেছে, যা বৈশ্বিক মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের ১ দশমিক ৫ শতাংশ। এই বিপুল জ্বালানি চাহিদার হার প্রতি বছর ১৫ শতাংশ করে বাড়ছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯৪৫ টেরাওয়াট ঘণ্টায় পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই বিশাল বিদ্যুৎ চাহিদার বড় অংশই ব্যবহার করে জায়ান্ট টেক কোম্পানিগুলোর তৈরি করা 'হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার'গুলো। আইবিএম-এর মতে, একেকটি হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টারে অন্তত ৫ হাজার সার্ভার থাকে এবং এগুলো ন্যূনতম ১০ হাজার বর্গফুট জায়গা জুড়ে গড়ে ওঠে।
এই দানবীয় সেন্টারগুলো সচল রাখতে প্রতি সেকেন্ডে ১০০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, যা দিয়ে অনায়াসে লাখ লাখ সাধারণ পরিবারের বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো সম্ভব। এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে সেখানে যে তীব্র তাপের সৃষ্টি হয়, তা নিয়ন্ত্রণ করতে আবার ব্যবহার করতে হয় কোটি কোটি লিটার পানি।
যুক্তরাজ্যের একটি পরিবেশগত তদারকি সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, ১০০ মেগাওয়াটের মাত্র একটি হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার ঠাণ্ডা রাখতে বছরে প্রায় ২৫০ কোটি লিটার পানির প্রয়োজন হয়, যা প্রায় ৮০ হাজার মানুষের বার্ষিক পানির চাহিদার সমান।
দ্রুত বাড়ছে ডেটা সেন্টারের সংখ্যা
২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিশ্বে ১১ হাজার ৬০০টির বেশি ডেটা সেন্টার চালু রয়েছে।
ডেটা সেন্টার ম্যাপের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ডেটা সেন্টার রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে সংখ্যা ৪ হাজার ৩০০-এরও বেশি।
ইউরোপে দ্বিতীয় বৃহত্তম কেন্দ্র যুক্তরাজ্য, যেখানে ৫৪০টির বেশি ডেটা সেন্টার রয়েছে। এর পরেই রয়েছে জার্মানি (৫২০-এর বেশি) ও ফ্রান্স (৩৯০-এর বেশি)।
এশিয়ায় শীর্ষে রয়েছে চীন (৩৬০-এর বেশি) ও ভারত (৩০০-এর বেশি)। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াও দ্রুত বর্ধনশীল ডেটা সেন্টার বাজারে পরিণত হচ্ছে।
সিনার্জি রিসার্চ গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বে হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টারের সংখ্যা ছিল ৭০০। বর্তমানে তা বেড়ে ১ হাজার ২৯৭-এ পৌঁছেছে।
এআই ডেটা সেন্টার কতটা তাপ উৎপন্ন করে?
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ডেটা সেন্টার চালু হওয়ার পর আশপাশের এলাকার তাপমাত্রা গড়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৩.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব ১০ কিলোমিটার (প্রায় ৬ মাইল) দূর পর্যন্ত অনুভূত হতে পারে।
গবেষকরা নাসার স্যাটেলাইট তথ্য ব্যবহার করে ২০০৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ভূমির তাপমাত্রা বিশ্লেষণ করেন এবং তা বিশ্বের ১১ হাজারের বেশি এআই ডেটা সেন্টারের অবস্থানের সঙ্গে তুলনা করেন।
গবেষণায় জনবহুল এলাকার বাইরে অবস্থিত ৬ হাজার ৭৩৩টি ডেটা সেন্টারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। প্রতিটি কেন্দ্র চালুর পরবর্তী কয়েক মাসের তাপমাত্রা একই স্থানের আগের পাঁচ বছরের গড় তাপমাত্রার সঙ্গে তুলনা করা হয়।
এতে দেখা যায়, তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ০.৩ ডিগ্রি থেকে ৯.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, কোনো ডেটা সেন্টারের ১০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে বসবাসকারী ৩৪ কোটির বেশি মানুষ এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাবে পড়তে পারেন। গবেষকদের ভাষায়, এর প্রভাব স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও আঞ্চলিক কল্যাণের ওপর 'উল্লেখযোগ্য প্রভাব' ফেলতে পারে এবং পরিবেশবান্ধব এআই উন্নয়ন নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনার অংশ হওয়া উচিত।
তাপ কত দূর পর্যন্ত অনুভূত হতে পারে?
যদিও অধিকাংশ ডেটা সেন্টার জনবহুল এলাকা থেকে দূরে শিল্পাঞ্চলে নির্মিত হয়, তবুও সেগুলো থেকে নির্গত বর্জ্য তাপ স্থানীয়ভাবে 'ডেটা হিট আইল্যান্ড' তৈরি করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই উষ্ণতার প্রভাব ১০ কিলোমিটার দূর থেকেও শনাক্ত করা সম্ভব।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি আশপাশের এলাকার মানুষের স্বাস্থ্য, বিদ্যুতের চাহিদা এবং সামগ্রিক জীবনমানের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
৫.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ
বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের চার বৃহৎ হাইপারস্কেলার প্রতিষ্ঠান—মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, অ্যালফাবেট এবং মেটা—মোট ৫.৩ ট্রিলিয়ন ডলার মূলধনী বিনিয়োগ করবে।
আসন্ন বড় প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- লুইজিয়ানায় মেটার ২৭ বিলিয়ন ডলারের 'হাইপেরিয়ন' ক্যাম্পাস
- উইসকনসিনে মাইক্রোসফটের ২০ বিলিয়ন ডলারের বহুধাপের ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণ প্রকল্প
- মিসিসিপিতে অ্যামাজনের ২৫ বিলিয়ন ডলারের ডেটা অবকাঠামো বিনিয়োগ
- মিসৌরির নিউ ফ্লোরেন্সে গুগলের ১৫ বিলিয়ন ডলারের 'প্রজেক্ট স্পেড' হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস
- টেক্সাসের অ্যাবিলিনে ওরাকলের 'প্রজেক্ট স্টারগেট', যা ওপেনএআইয়ের জন্য নির্মিত একটি বিশাল এআই সুপারক্লাস্টার। এর মোট বিদ্যুৎ সক্ষমতা ১.২ থেকে ২ গিগাওয়াট।
