পাকিস্তানে তৈরি হচ্ছে বিশ্বকাপের বল ‘ট্রাইওন্ডা’, তবে রয়েছে মজুরি নিয়ে বিতর্ক
পাকিস্তানে তৈরি হয়েছে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বল 'ট্রাইওন্ডা'। কিছুদিনের মধ্যে শুরু হতে যাওয়া ফুটবলের এই মহাযজ্ঞের জন্য প্রায় ১০ মিলিয়ন ট্রাইওন্ডা বল তৈরির কাজ পেয়েছে পাকিস্তানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ফরওয়ার্ড গ্রুপ। অ্যাডিডাসের সঙ্গে চুক্তি করে তারা এই বলগুলো তৈরি করেছে।
পাকিস্তানের শিয়ালকোটে এই বলগুলো তৈরি হয়েছে। শুধু এবারের বিশ্বকাপ নয়, ১৯৯০ সাল থেকে প্রায় প্রতিটি বিশ্বকাপেই ফুটবল গেছে শিয়ালকোট থেকে।
ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদন অনুসারে, আপনার বাড়িতে যদি কোনো ফুটবল থাকে, তাহলে সেটিও শিয়ালকোট থেকে আসার ভালো সম্ভাবনা আছে। কারণ বিশ্বের মোট ফুটবলের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি—প্রায় ৭০ শতাংশ—তৈরি হয় শহরটির ১ হাজার কারখানায়।
শুধু ফুটবল বিশ্বকাপে নয়, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, জার্মান বুন্দেসলিগা, ফরাসি লিগেও শিয়ালকোটে বানানো ফুটবলেই খেলা হয়।
শিয়ালকোটের প্রায় ৬০ হাজার—অর্থাৎ মোট বাসিন্দার প্রায় ৮ শতাংশ—মানুষ কাজ করেন ফুটবল উৎপাদন কারখানায়। দীর্ঘক্ষণ কাজ করেন তারা। অধিকাংশ বল তৈরি করেন হাতে সেলাই করে।
ফুটবল তৈরির প্রক্রিয়া
শিয়ালকোটে তৈরি বলের ৮০ শতাংশের বেশি বানানো হয় হাতে সেলাই করে। এই প্রক্রিয়াটি বেশ শ্রমসাধ্য। তবে হাতে সেলাই করার কারণে ফুটবল বেশি স্থায়িত্ব পায়, বাতাসে ভারসাম্য বজায় থাকে বেশি। শিয়ালকোটের বলের সিম গভীর হয়। আর সেলাইও মেশিনে সেলাই করা বলের চেয়ে বেশি ভালো।
শিয়ালকোটে যারা বল সেলাই করেন, তাদের অধিকাংশই নারী। আনোয়ার খাজা ইন্ডাস্ট্রিজে তারা দিনে সাধারণত দুটি বল সেলাই করেন। তারপর বাড়ি ফিরে সন্তানদের জন্য রান্নাবান্না করেন। তারপর বিকালবেলায় নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
পুরুষরা সাধারণত বল উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে কাজ করেন। বিভিন্ন উপাদান প্রস্তুত করেন কিংবা বলের মান পরীক্ষা করেন। ১৯৯৭ সালে শ্রম আইন কার্যকর করার আগপর্যন্ত শিয়ালকোটে বাবা-মায়েদের সঙ্গে ৫ বছর বয়সি শিশুরা পর্যন্ত কাজ করত।
কর্মীরা টেক্সটাইল উপাদানে অ্যাডহেসিভ লাগিয়ে ফুটবলের সিনথেটিক চামড়া তৈরি করেন। সিনথেটিক চামড়ার উপাদান তুলা, পলিয়েস্টার ও পলিইউরিথেন বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করে আনা হয়। সবচেয়ে সস্তা বলগুলোতে চীনের উপাদান ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত ভালো মানের বলে দক্ষিণ কোরিয়ান উপাদান ব্যবহৃত হয়। জার্মান বুন্দেসলিগা বা অন্যান্য ইউরোপীয় লিগের বল তৈরির জন্য জাপান থেকে আসা উপাদান ব্যবহার করা হয়।
শিয়ালকোটে প্রথাগত বলগুলোতে সাধারণত ২০টি ষড়ভুজ ও ১২টি পঞ্চভুজ থাকে। ষড়ভুজ ও পঞ্চভুজগুলোকে ৬৯০টি সেলাইয়ের মাধ্যমে যুক্ত করা হয়।
তবে এখন থার্মো বন্ডিং নামক প্রক্রিয়ায় গরম আঠার সাহায্যে ফুটবল তৈরির পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। এই বলগুলো যেমন মানে ভালো হয় তেমনি উৎপাদন ব্যয়ও তুলনামূলক কম। তবে থার্মো বন্ডিংয়ের বল পরিবহন করার খরচ বেশি। এছাড়া সেলাই করা বল সারাই করা গেলেও, আঠা দিয়ে তৈরি বল সারাই করা যায় না।
সম্পূর্ণ প্রস্তুত বল ফিফার মানদণ্ড উতরানোর জন্য নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। বলগুলো নিখুঁতভাবে গোল করা হয়েছে কি না, বাউন্স কেমন, বাতাসে গতিপ্রকৃতি কেমন—এসব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা হয়।
ট্রাইওন্ডার বৈশিষ্ট্য
স্প্যানিশ ভাষায় 'ট্রাইওন্ডা' নামের অর্থ হলো 'তিনটি ঢেউ'। এই বলের ডিজাইনের মাধ্যমে মূলত একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত উদযাপন করা হচ্ছে। কারণ, ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম তিনটি দেশ—কানাডা, মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্র—একসঙ্গে বিশ্বকাপ আয়োজন করতে যাচ্ছে।
বলের ডিজাইনে লাল, সবুজ এবং নীল রঙের ছোঁয়া রয়েছে, যা এই তিন আয়োজক দেশের প্রতি সম্মান জানায়। এ ছাড়া বলের নতুন 'ফোর-প্যানেল' বা চার খণ্ডের কাঠামোতে এমনভাবে বাঁকানো জ্যামিতিক নকশা করা হয়েছে, যা মূলত নামের সেই তিনটি ঢেউকেই ফুটিয়ে তোলে। এই প্যানেলগুলো বলের ঠিক মাঝখানে যুক্ত হয়ে একটি ত্রিভুজ তৈরি করেছে, যা তিনটি দেশের এই ঐতিহাসিক মিলনকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
প্রতিটি আয়োজক দেশের নিজস্ব প্রতীকও এই বলে রয়েছে। যেমন—কানাডার জন্য ম্যাপল পাতা, মেক্সিকোর জন্য ঈগল এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি তারকা। এর সঙ্গে সোনালি রঙের নকশাগুলো ফিফা বিশ্বকাপের ট্রফির প্রতি সম্মান জানায়।
ট্রাইওন্ডা বলে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স বাড়ানোর জন্য বেশ কিছু নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এর চার প্যানেলের কাঠামোতে ইচ্ছাকৃতভাবেই বেশ গভীর সেলাই দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বল যখন বাতাসে ভাসে, তখন এটি সব দিকে সমানভাবে বাতাসের বাধা পায়, যা বলটিকে বাতাসে স্থির ও নিখুঁতভাবে উড়তে সাহায্য করে। এ ছাড়া বলের গায়ে ছোট ছোট উঁচু নকশা রয়েছে, যা শুধু কাছ থেকে দেখা যায়। ভেজা বা আর্দ্র আবহাওয়ায় শট নেওয়ার সময় বা ড্রিবলিং করার সময় এগুলো খেলোয়াড়দের পায়ের সঙ্গে বলের গ্রিপ বা নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে দেয়।
এতে একটি অত্যাধুনিক ৫০০ হার্জ মোশন সেন্সর চিপ রয়েছে, যা বলের গতিবিধির প্রতিটি খুঁটিনাটি তথ্য সরবরাহ করতে পারে। এই প্রযুক্তিটি সরাসরি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভার) সিস্টেমে নিখুঁত ও তাৎক্ষণিক তথ্য পাঠায়। এর ফলে অফসাইডের মতো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে ম্যাচ কর্মকর্তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে।
রয়েছে বিতর্কও
ট্রাইওন্ডা ম্যাচ বলটি এযাবৎকালে তৈরি সবচেয়ে দামি অফিশিয়াল টুর্নামেন্ট বল। এর মাধ্যমে স্পোর্টস জায়ান্ট কোম্পানি এবং ফুটবল ফেডারেশনের শীর্ষ কর্তারা বিপুল পরিমাণ মুনাফা লুটছেন।
কিন্তু বাজারে বলটি যে দামে বিক্রি হচ্ছে, তার সামান্য খরচে এটি তৈরি করা হচ্ছে।
বলটির প্রস্তুতকারক ফরওয়ার্ড গ্রুপ শিয়ালকোটে তাদের প্রোডাকশন লাইনের অনেক কর্মীকে মাসে ন্যূনতম ৪০ হাজার পাকিস্তানি রুপি মজুরি দেয়, যা মাত্র ১০৬ পাউন্ডের সমান।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গ্রুপ 'লেবার বিহাইন্ড দ্য লেবেল'-এর পলিসি লিড ও অধিকারকর্মী আনা ব্রাইহার বলেন, 'এই ফুটবলগুলো বাজারে ১০০ পাউন্ডেরও বেশি দামে বিক্রি হয়। অথচ যারা এগুলো তৈরি করছে, তাদের সন্তানরা একটি বলও কিনে খেলার সামর্থ্য রাখে না। এটি স্পষ্টভাবে জবাবদিহির ব্যর্থতাকেই প্রমাণ করে।'
অবশ্য অ্যাডিডাস জোর দিয়ে বলেছে যে এই বলগুলো 'ন্যায্য মজুরিসহ ন্যায্য ও নিরাপদ কাজের পরিবেশে' তৈরি করা হচ্ছে।
কিন্তু ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতি এখন ১০ দশমিক ৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। এর ফলে অনেক কর্মী তাদের পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতেই হিমশিম খাচ্ছেন।
পাকিস্তান ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের ট্রেড ইউনিয়ন নেতা আসিফ খান বলেন, 'আগে প্রচুর শিশুশ্রমিক এবং নারী শ্রমিক ছিল, যাদের শোষণ করা হতো। পরিস্থিতি এখন অনেকটাই বদলেছে। তবে শিশুশ্রম এবং অল্প মজুরির শ্রমিকদের বেশির ভাগই এখন নারোওয়াল জেলায় সরে গেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'শিয়ালকোট ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছিল অ্যাডিডাস, আর নাইকির সরাসরি ফুটবল উৎপাদনও সেখানে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর পর থেকে কোম্পানিগুলো এখন অনেক বেশি সতর্ক।'
খান জানান, নতুন কর্মীরা সাধারণত মাসে প্রায় ৪০ হাজার পাকিস্তানি রুপি (প্রায় ১০৬ পাউন্ড) দিয়ে কাজ শুরু করেন। আর যারা একটু বেশি সময় ধরে কাজ করছেন, তারা ৪৫ হাজার রুপি (১১৯ পাউন্ড) থেকে ৫০ হাজার রুপি (১৩২ পাউন্ড) আয় করেন।
তবে আসিফ খান দাবি করেন, তিনি এমন কিছু কর্মীও দেখেছেন, যাদের এর চেয়েও কম বেতন দেওয়া হয়। তিনি বলেন, 'আমি আদালতে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি।'
অবশ্য অ্যাডিডাস এবং ফরওয়ার্ড গ্রুপ—উভয়ই দাবি করেছে, কোনো শ্রমিককেই পাকিস্তানের ন্যূনতম মজুরির চেয়ে কম টাকা দেওয়া হয় না।
অ্যাডিডাসের এক মুখপাত্র বলেন, 'আমরা নিশ্চিত করি যে আমাদের সব পণ্য ন্যায্য মজুরিসহ ন্যায্য ও নিরাপদ কাজের পরিবেশে তৈরি হয়। গত ১২ মাসে আমরা এক হাজারেরও বেশি সরাসরি পরিদর্শন (অন-সাইট ইন্সপেকশন) করেছি।'
তিনি আরও বলেন, 'অ্যাডিডাসের অনুমোদিত সরবরাহকারী হিসেবে ফরওয়ার্ড স্পোর্টস উন্নত মজুরি ব্যবস্থা, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, কল্যাণ কর্মসূচি এবং অন্যান্য সেবার মাধ্যমে কর্মীদের জীবনযাত্রার মান ধারাবাহিকভাবে বাড়াচ্ছে।'
ফরওয়ার্ড গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হাসান খাজা দ্য সানকে বলেন, 'আমাদের বেশির ভাগ কর্মীই আধা-দক্ষ (সেমি-স্কিলড), যারা ন্যূনতম মজুরির চেয়ে অনেক বেশি বেতন পান।'
