মধ্যপ্রাচ্যে সতর্ক অবস্থানে মার্কিন বাহিনী, যেকোনো মুহূর্তে ফের ‘যুদ্ধ শুরুর’ ডাকের অপেক্ষায়
বিমানবাহী রণতরী, ডেস্ট্রয়ার, মেরিন অভিযাত্রী ইউনিট ও যুদ্ধবিমানসহ প্রায় ৫০ হাজার সেনাকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
প্যারাশুট ও জরুরি টিকে থাকার সরঞ্জাম নিয়ে এসব সেনা ট্রাম্পের সেই অভিযানের অংশ হয়েছেন, যেখানে তিনি ইরানের 'ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া'র ঘোষণা দিয়েছিলেন।
তবে এখনও যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে পরস্পরবিরোধী বার্তা দিচ্ছে হোয়াইট হাউস। এ অবস্থায় অঞ্চলে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে মার্কিন বাহিনী।
মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ইরানবিরোধী মার্কিন অভিযান 'অপারেশন এপিক ফিউরি' শেষ হয়েছে। অন্যদিকে প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ বলেন, এখন বড় কাজ হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজগুলোকে চলাচলে সহায়তা করা। যদিও পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, এই উদ্যোগটিও বর্তমানে স্থগিত রাখা হয়েছে।
এরপর বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প বলেন, ইরান যদি 'আগে যা নিয়ে সম্মতি হয়েছিল তা দিতে রাজি হয়', তবে তিনি যুদ্ধ শেষ করবেন এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ পথ নিশ্চিত করবেন। তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
তিনি আরও বলেন, 'তারা রাজি না হলে বোমা হামলা শুরু হবে।'
ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর দেশটির বন্দরগুলোতে আসা-যাওয়াকারী সব ধরনের জাহাজের ওপর মার্কিন নৌবাহিনী যে অবরোধ আরোপ করেছিল, তা এখনও কঠোরভাবে বলবৎ রয়েছে। অবরোধ ভেঙে পার হওয়ার চেষ্টার সময় গত বুধবার নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান ইরানের পতাকাবাহী একটি তেলবাহী ট্যাংকারকে অকেজো করে দিয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব, বাহরাইন, ইরাক, সিরিয়া, জর্ডান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতে থাকা ঘাঁটি ও জাহাজে সাধারণত প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ আরও জোরদার করলে সেই সংখ্যা বেড়ে ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যায় বলে এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
বর্তমানে সেনাসংখ্যার সঠিক হিসাব বের করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ ইরান পাল্টা প্রতিশোধ নিতে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছে। এর ফলে সামরিক বাহিনীকে তাদের সেনাদের ওই অঞ্চলের অন্যান্য ঘাঁটি ছাড়াও ইউরোপ এবং এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও সরিয়ে নিতে বাধ্য হতে হয়েছে।
এই অঞ্চলে এখনও অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর একটি চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
৮২তম এয়ারবর্ন
মার্কিন সেনাবাহিনীর এই এলিট ডিভিশনের প্রায় ২,০০০ প্যারাট্রুপার এখন মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছে। প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তারা নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের সঠিক অবস্থান প্রকাশ করেননি।
কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপ দখলের অভিযানে তাদের ব্যবহার করা হতে পারে। তবে সেটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য আরও স্থলসেনার প্রয়োজন হবে।
এছাড়া, এই ধরনের অভিযানে মার্কিন সেনাদের বড় ধরণের প্রাণহানির ঝুঁকিও রয়েছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সেনারা ইরানের কোনো বিমানঘাঁটি দখলের প্রচেষ্টাতেও অংশ নিতে পারেন; যদিও বিমানঘাঁটি দখলের পর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তা এখনো অস্পষ্ট।
ইরানের মতো বিশাল আয়তন এবং ৯ কোটির বেশি জনসংখ্যার একটি দেশে কোনো এলাকা দখল করে রাখা হবে অনেক বড় এক চ্যালেঞ্জ।
৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট
সম্প্রতি ২,৫০০ নৌসেনা (মেরিন) এবং আরও ২,৫০০ নাবিকের আগমনে এই অঞ্চলে মার্কিন সেনার সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের এই সদস্যরা ঠিক কী দায়িত্ব পালন করবেন তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তারা কোনো দ্বীপ বা অন্য কোনো অঞ্চল দখলের প্রচেষ্টায় অংশ নিতে পারেন।
বিশেষ অভিযান বাহিনী
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে সামরিক বিকল্প বাড়াতে গত মার্চ মাসে কয়েকশ মার্কিন বিশেষ কমান্ডো বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে বলে সম্প্রতি দুজন সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
বিশেষায়িত স্থল বাহিনী হিসেবে তারা ইরানের ইসফাহান পারমাণবিক কেন্দ্রে থাকা উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সংক্রান্ত কোনো বিশেষ মিশনে অংশ নিতে পারেন।
ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন এবং ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ
আরব সাগরে বর্তমানে দুটি শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরী দল—ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন এবং ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ অবস্থান করছে। এদের সঙ্গে রয়েছে একঝাঁক যুদ্ধজাহাজ এবং ১০ হাজারের বেশি নাবিক ও নৌসেনা।
এখান থেকেই যুদ্ধবিমান এবং ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ইরানে সরাসরি হামলা চালানো সম্ভব।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইউএসএস বুশ মূলত ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড-এর স্থলাভিষিক্ত হয়েছে।
জেরাল্ড ফোর্ড বর্তমানে আটলান্টিক মহাসাগর হয়ে ভার্জিনিয়ার নরফোকের দিকে ফিরে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, যুদ্ধের শুরুর দিকে ফোর্ড রণতরীর লন্ড্রিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল।
