ব্যথা নিরাময়ে আকুপাংচার কি আসলেই কাজ করে?
আকুপাংচার প্রায় ৩,০০০ বছরের পুরোনো একটি চীনা চিকিৎসা পদ্ধতি। এতে শরীরের নির্দিষ্ট কিছু পয়েন্টে সুচ ফুটিয়ে শরীরের জীবনীশক্তি 'চি'-এর প্রবাহকে সচল রাখার চেষ্টা করা হয়। পশ্চিমা চিকিৎসা বিজ্ঞানে দীর্ঘকাল ধরে একে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হলেও, বর্তমানে এর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী।
নামিদামি মডেল এবং সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা এর বার্ধক্যবিরোধী প্রভাবের গুণগান করেন। সেরেনা উইলিয়ামসের মতো টেনিস তারকা বা টম ব্র্যাডির মতো ক্রীড়াবিদরা দাবি করেন, এই পদ্ধতি তাদের পেশির ব্যথা দ্রুত সারিয়ে তুলতে সাহায্য করে। বর্তমানে উদ্বেগ, হাঁপানি, বন্ধ্যাত্ব এবং পেটের বিভিন্ন সমস্যা যেমন ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (আইবিএস) নিরাময়েও আকুপাংচার ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে এটি কতটা কার্যকর?
কিছু ক্ষেত্রে এর স্বপক্ষে বেশ জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়। ২০১৮ সালে 'জার্নাল অফ পেইন'-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২০,৮২৭ জন রোগীর ওপর পরিচালিত ৩৯টি পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। এসব রোগী দীর্ঘস্থায়ী পেশির ব্যথা, মাথাব্যথা বা অস্টিওআর্থারাইটিসে ভুগছিলেন। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত আকুপাংচার নিয়েছেন, তারা অন্য রোগীদের তুলনায় ব্যথায় অনেক বেশি উপশম পেয়েছেন। এমনকি এক বছর পরেও এর সুফল বজায় ছিল।
আকুপাংচার ঠিক কীভাবে কাজ করে, তা নিয়ে আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ (এনআইএচ)-এর অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক হেলেন ল্যাঞ্জেভিনের একটি তত্ত্ব রয়েছে। তার গবেষণা বলছে, শরীরে সুচ ফোটানোর সময় তা যোজক কলা 'ফাসিয়া'র তন্তুগুলোকে পেঁচিয়ে ফেলে। এর ফলে স্নায়ুর প্রান্তে এমন এক ধরণের টান সৃষ্টি হয় যা ব্যথা কমাতে ভূমিকা রাখে।
তবে আকুপাংচারের সব সুফলই যে শারীরিক প্রক্রিয়া থেকে আসে, তা নয়। এর পেছনে মস্তিষ্কের 'প্লাসেবো ইফেক্ট'-এর বড় ভূমিকা থাকতে পারে। যখন মানুষ বিশ্বাস করে যে তাকে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, তখন মস্তিষ্ক নিজেই ব্যথানাশক রাসায়নিক নিঃসরণ করে ব্যথা কমিয়ে দেয়। ২০২০ সালে 'জামা ইন্টারনাল মেডিসিন'-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আসল আকুপাংচার এবং ভুয়া আকুপাংচারের মধ্যে ব্যথার উপশমে খুব একটা উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই। ইউনিভার্সিটি অফ এক্সেটার-এর প্রফেসর এডজার্ড আর্নস্টের মতে, 'যেকোনো থেরাপির সাথেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্লাসেবো ইফেক্ট যুক্ত থাকে।'
আপাতত, আকুপাংচারের সুফলের ঠিক কতটুকু অংশ শরীরতাত্ত্বিক কারণে আর কতটুকু মস্তিষ্কের বিশ্বাসের কারণে ঘটে, তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা বিজ্ঞানীদের জন্য বেশ কঠিন।
ব্যথা কমানোর বাইরে আকুপাংচারের অন্যান্য সুফলগুলো এখনো অতটা স্পষ্ট নয়। ২০২২ সালে 'কমপ্লিমেন্টারি থেরাপিস ইন মেডিসিন'-এ প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় (যা পেশাদার আকুপাংচারিস্টরা লিখেছেন এবং ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অফ চাইনিজ মেডিসিন দ্বারা অর্থায়নকৃত) ৮৬২টি পূর্ববর্তী গবেষণা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী বমি বমি ভাব কমাতে এই পদ্ধতিটি প্রচলিত কিছু ওষুধের মতোই কার্যকর।
এছাড়া মাইগ্রেন, দুশ্চিন্তাজনিত মাথাব্যথা, ক্যান্সারের কারণে সৃষ্ট অবসাদ বা ক্লান্তি, নারী বন্ধ্যাত্ব (প্রজনন চিকিৎসার পাশাপাশি ব্যবহার করলে) এবং পুরুষদের দীর্ঘস্থায়ী 'পেলভিক পেইন' চিকিৎসাতেও এটি বেশ ভালো ফল দিচ্ছে।
তবে পেশির কর্মক্ষমতা দ্রুত পুনরুদ্ধারসহ অন্য আরও ৮৬টি শারীরিক সমস্যার ওপর করা পরীক্ষায় আশানুরূপ কোনো জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে আরও ছয়টি রোগের ক্ষেত্রে আকুপাংচার কোনো ইতিবাচক প্রভাবই ফেলতে পারেনি।
প্রমাণের ভিত্তিতে বলা যায়, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা নিরাময়ের জন্য আকুপাংচার একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে, বিশেষ করে বেশিরভাগ ব্যথানাশক ওষুধের তুলনায় এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক কম। তবে ব্যথার বাইরে অন্যান্য চিকিৎসায় এর কার্যকারিতা এখনো ধোঁয়াশায় ঘেরা।
