তেলের বাজারে অস্থিরতা: ৪ বছরের রেকর্ড ভেঙে প্রতি ব্যারেল ১২৬ ডলার স্পর্শ
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধ আরও ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ায় আজ বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। গত চার বছরের মধ্যে এটি তেলের সর্বোচ্চ দাম। মূলত জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকতে পারে—এমন শঙ্কা থেকেই বাজারে এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
এমন শঙ্কা থেকে, আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম রাতারাতি বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১২৬.৪১ ডলারে পৌঁছায়। তবে পরবর্তীতে লেনদেনের পরিমাণ কমে আসায়— তা কিছুটা নেমে ১১৫.৮ ডলারে থিতু হয়। অন্যদিকে, অপরিশোধিত তেলের মার্কিন বেঞ্চমার্ক ডব্লিউটিআই সূচকের ক্রুডের দাম ০.৭ শতাংশ কমে ব্যারেল প্রতি ১০৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেল প্রতি ৭৩ ডলারের আশেপাশে কেনাবেচা হচ্ছিল, যা বর্তমান দামের তুলনায় অনেক কম। তবে এ বছরের শুরুতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর আগের সময়ের তুলনায় তেলের দাম বর্তমানে প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন-এর সর্বশেষ জাতীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের গড় দাম গ্যালন প্রতি ৪.৩০ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, তেলের সরবরাহে এই বিঘ্ন যদি বছরের দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হয়, তবে তা বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার সূত্রপাত করতে পারে। ইতিমধ্যে বেশকিছু দেশে জ্বালানি সংকট প্রকট হয়েছে, যার ফলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চড়া দামের প্রভাবে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য যেমন- প্লাস্টিক, কৃত্রিম রাবার ও টেক্সটাইল এবং খাদ্যপণ্যের দামও হু হু করে বাড়ছে। বাজারে তেলের তীব্র সংকটের কারণে ইতিমধ্যেই মেডিকেল গ্লাভস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস এবং প্রসাধনী সামগ্রীর সরবরাহে টান পড়েছে। বিশেষ করে, এশিয়ার দেশগুলোতে এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি, কারণ এই অঞ্চলের দেশগুলো তাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের সিংহভাগই আমদানি করে। অথচ বিশ্বের অধিকাংশ ভোগ্যপণ্য এখানেই উৎপাদিত হয়।
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষক সংস্থা 'ভান্দা ইনসাইটস'-এর প্রতিষ্ঠাতা বন্দনা হরি বলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্থায়ীভাবে খুলে দেওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত কোনো বার্তা না পাওয়া পর্যন্ত তেলের দাম কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। তিনি আরও যোগ করেন, "বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি ঠিক কীভাবে এবং কখন সম্ভব হবে, তা বলাও এখন মুশকিল।"
বিনিয়োগ ব্যাংক স্যাক্সোর কৌশলবিদ নীল উইলসনের মতে, বৃহস্পতিবারের এই আকস্মিক দরবৃদ্ধির পেছনে 'অয়েল ফিউচার' চুক্তির কিছু কৌশলগত কারণও ছিল। জুনের ফিউচার চুক্তির মেয়াদ আজ শেষ হওয়ায়–-লেনদেনের চাপ জুলাইয়ের চুক্তিতে স্থানান্তরিত হয়েছে, যেখানে তেলের দাম আগেই ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলারের উপরে ছিল।
ডয়েচে ব্যাংকের বিশ্লেষকদের মতে, রাতারাতি দাম বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-এর একটি প্রতিবেদন। সেখানে দাবি করা হয় যে, আমেরিকা ইরানের ওপর একগুচ্ছ "স্বল্পস্থায়ী কিন্তু শক্তিশালী" বিমান হামলার পরিকল্পনা করছে।
এদিকে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সরাসরি আলোচনা স্থগিত হয়ে যাওয়ায়, বিশ্ববাজারে টানা আট দিন ধরে তেলের দাম বাড়ছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে আছে, যে পথ দিয়ে সাধারণত বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ সরবরাহ করা হয়।
নীল উইলসন তার এক নোটে লিখেছেন, "তেলের বাজার এখন আর সংকট সমাধানের আশায় বসে নেই, বরং সরবরাহ ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী হুমকি এবং তেলের বাস্তব ঘাটতির দিকেই সবার নজর। সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা এখন জনমনে প্রবল হয়ে উঠেছে।"
গত ফেব্রুয়ারির শেষদিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে— হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক তেলবাহী জাহাজের চলাচল এক অঙ্কের সংখ্যায় নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) একে ইতিহাসের "সবচেয়ে বড় সরবরাহ বিঘ্ন" হিসেবে অভিহিত করেছে।
রাইস্ট্যাড এনার্জির ভাইস প্রেসিডেন্ট জানিভ শাহ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে আরও সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা ব্যবসায়ীদের চরম সতর্ক অবস্থানে থাকতে বাধ্য করেছে।
সতর্ক করে তিনি আরও বলেন, "সংঘাত যদি আরও বাড়ে কিংবা জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে কোনো হামলা চালানো হয়, তবে তেলের দামে দ্রুত উল্লম্ফন হতে পারে।" তিনি জানান, তেলের অতিরিক্ত দাম বিশ্বজুড়ে এর চাহিদায় বড় ধরনের পতন ঘটাতে পারে, যার কিছু লক্ষণ ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।
