হরমুজ খোলা নিয়ে ইরানি পরিকল্পনায় সন্তুষ্ট নন ট্রাম্প
গতকাল (২৭ এপ্রিল) হোয়াইট হাউস সিচুয়েশন রুমে অনুষ্ঠিত আলোচনার বিষয়ে অবহিত এমন একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার উপদেষ্টাদের জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলা এবং যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবে তিনি সন্তুষ্ট নন।
এই আলোচনা সম্পর্কে অবগত মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, তেহরানের প্রস্তাবে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে; তবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কী করা হবে—সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, পরমাণু কর্মসূচি স্থগিত করা এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ হস্তান্তর করার বিষয়ে মার্কিন প্রস্তাবগুলো ইরান বারবার প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঠিক কী কারণে এই প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নন তা সুনির্দিষ্টভাবে স্পষ্ট করা হয়নি, তবে তিনি বারবার বলেছেন যে, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না। একজন মার্কিন কর্মকর্তা আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই প্রস্তাব গ্রহণ করলে তা ট্রাম্পের জন্য কোনো বিজয় হিসেবে গণ্য হবে না—এমন একটি রাজনৈতিক সমীকরণও কাজ করছে।
ট্রাম্পের ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনার বিষয়ে হোয়াইট হাউস সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানালেও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, চলমান যুদ্ধ এবং তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস এক বিবৃতিতে বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে কোনো আলোচনা বা দরকষাকষি করবে না—আমরা আমাদের চূড়ান্ত সীমানা সম্পর্কে স্পষ্ট। প্রেসিডেন্ট কেবল এমন একটি চুক্তিতেই পৌঁছাবেন যা মার্কিন জনগণ ও বিশ্বের জন্য কল্যাণকর হবে।'
হরমুজ প্রণালি খোলার বিষয়ে ইরানি প্রস্তাবটি বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই বিতর্কের মূলে রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র নাকি ইরান, কার হাতে দরকষাকষির শক্তি বেশি রয়েছে এবং জলপথ বন্ধ থাকায় সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় কোন দেশ বেশি সক্ষম।
গত রোববার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পাকিস্তানের কাছে এই প্রস্তাব পেশ করার পর সোমবার ট্রাম্প তার উপদেষ্টাদের নিয়ে এটি পর্যালোচনা করেন। এর আগে গত সপ্তাহেও ট্রাম্প ইরানের একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং সপ্তাহান্তে ইসলামাবাদে নির্ধারিত এক দফা শান্তি আলোচনা বাতিল করেছিলেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব তাদের পক্ষে আলোচনাকারীদের পরমাণু ইস্যুতে ছাড় দেওয়ার কোনো আইনি বা রাজনৈতিক ক্ষমতা দেয়নি, যা যেকোনো ধরনের শান্তি চুক্তির প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
চলমান আলোচনা ইস্যু নিয়ে ট্রাম্প তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। গত বৃহস্পতিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ তিনি একটি পোস্ট করে বোঝাতে চেয়েছেন যে, ইরান সরকার এখন অগোছালো। তাদের মধ্যে এমন বিভেদ যে তারা নিজেরাই বুঝতে পারছে না আসলে কার কথা মেনে চলবে বা তাদের আসল নেতা কে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরমাণু আলোচনা বিলম্বিত করা বিশ্ব জ্বালানি ও আর্থিক বাজারের ওপর চাপ কমানোর জন্য একটি দ্রুত চুক্তিতে পৌঁছানোর পথ হতে পারত। তবে পরমাণু আলোচনা স্থগিত করার যেকোনো সিদ্ধান্ত হবে এই যুদ্ধ তার মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার একটি স্পষ্ট সংকেত। আর সেই লক্ষ্যটি ছিল—ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে তেহরানের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করা।
প্রণালি খুলে দেওয়া নিয়ে আলোচনাও বেশ জটিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মার্কিন নৌ-অবরোধের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের তেল রপ্তানি করার ক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া। অন্যদিকে, যেসব জাহাজ ইরানের দাবি করা টোল দিতে অস্বীকার করছে, সেগুলোর ওপর তেহরানের হামলার হুমকির ফলে ওই পথে আন্তর্জাতিক তেল পরিবহন ব্যাপকহারে কমে গেছে।
ইরানি কর্মকর্তারা জেদ ধরেছেন যে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার যেকোনো চুক্তিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর তাদের কর বা ফি আরোপের অনুমতি দিতে হবে। ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক জলপথ বা প্রণালিতে অবাধ চলাচলের স্বাধীনতার ওপর এমন যেকোনো বিধিনিষেধের বিরোধিতা করে এলেও ট্রাম্প প্রশাসন এই বিষয়ে এখন পর্যন্ত মিশ্র বার্তা দিচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরানি প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে কি না, সেই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনৈতিক লিভারেজের (দরকষাকষির শক্তি) প্রশ্নটি। তেহরানকে উল্লেখযোগ্য ছাড় দিতে বাধ্য করতে আরও সামরিক অভিযানের প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়েও প্রশাসনে দ্বিমত রয়েছে।
প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা বিশ্বাস করেন, আরও দুই মাস অবরোধ অব্যাহত রাখলে তেহরানের জ্বালানি খাতের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। কারণ, তেলের কূপগুলো চাইলেই যখন-তখন চালু বা বন্ধ করা যায় না; দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখলে এগুলো স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মেরামতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। এই কর্মকর্তাদের যুক্তি, ইরান শেষ পর্যন্ত এই দীর্ঘমেয়াদী বিপর্যয় এড়াতে নতি স্বীকার করবে।
তবে প্রশাসনের অন্য অংশ এই মূল্যায়নকে ঠিক বলে মনে করছেন।না। তারা লক্ষ্য করেছেন যে, ইরানের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে এবং দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ক্ষমতার ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও মজবুত করেছে।
মার্কিন সরকারের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বা বিপ্লবী গার্ডের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তাদের আলোচকদের পরমাণু কর্মসূচিতে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার অনুমতি দেননি। এমতাবস্থায় সামরিক ব্যবস্থা পুনরায় শুরু না করা পর্যন্ত ইরানের অবস্থানের পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
এমনকি বোমা হামলা পুনরায় শুরু হলেও তা ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনবে কি না, সে বিষয়েও খুব একটা প্রমাণ নেই। প্রশাসনের কিছু সন্দিহান কর্মকর্তার মতে, ইরান আপাতত বড় কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়, তাই প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য একটি ছোটখাটো চুক্তিতে পৌঁছানোই হতে পারে আপাতত সামনের দিকে এগোনোর একমাত্র পথ।
