তেল সংকটে কদর বাড়ছে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির, সবচেয়ে বেশি লাভবান নবায়নযোগ্য জ্বালানির রাজা চীন
ইরান যুদ্ধের কারণে তেল সংকটে পড়া দেশগুলো এখন মরিয়া হয়ে জ্বালানির বিকল্প খুঁজছে। অনেকেই ঝুঁকছে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে। আর এই সুযোগে 'নবায়নযোগ্য জ্বালানির রাজা' চীনের কদর বাড়ছে হু হু করে।
জ্বালানি বিষয়ক থিংকট্যাংক 'এমবার'-এর মতে, গত মার্চ মাসে চীনের সৌরপ্রযুক্তি, ব্যাটারি এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) রপ্তানি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এর মানে হলো, তেলের সরবরাহে ইতিহাসের অন্যতম বড় এই ধাক্কা বিশ্বজুড়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহারকে ত্বরান্বিত করছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর ইরানি সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ করে দেয়। এতে বৈশ্বিক তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বন্ধ হয়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়া এবং যুদ্ধ অবসানের আলোচনা থমকে থাকায় তেলের দামে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
এদিকে, জ্বালানি আমদানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানি সাশ্রয় এবং কাজের সময় কমিয়ে আনার মতো ব্যবস্থা নিয়ে এই সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতেও। এর ফলে বৈদ্যুতিক গাড়ি, উইন্ড টারবাইন (বায়ুকল) এবং সৌরপ্যানেলের বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎপাদক হিসেবে চীনই সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমবার জানিয়েছে, গত মার্চ মাসে চীন ৬৮ গিগাওয়াট সৌরপ্রযুক্তি রপ্তানি করেছে, যা আগের আগস্টে গড়া রেকর্ডের চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি। থিংকট্যাংকটি জানায়, ৫০টি দেশ চীন থেকে সৌরপ্রযুক্তি আমদানির নতুন রেকর্ড গড়েছে। জ্বালানি সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এশিয়া ও আফ্রিকার উদীয়মান বাজারগুলোতেই এই প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি।
প্রতিবেদনে এমবার-এর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ইউয়ান গ্রাহাম বলেন, 'জীবাশ্ম জ্বালানির সংকট সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। সৌরশক্তি এরই মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতির ইঞ্জিনে পরিণত হয়েছিল, আর এখন জীবাশ্ম জ্বালানির দামের অস্থিরতা এটিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।'
এমবার আরও জানায়, চীনা কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী—মার্চ মাসে সৌরপ্রযুক্তি, ব্যাটারি এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির মোট রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। চীনে এই তিনটি খাতকে এখন 'নতুন তিন' (নিউ থ্রি) বলা হয়। আগে যেখানে পোশাক, গৃহস্থালি সামগ্রী ও আসবাবপত্র রপ্তানি দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়াত, এখন তার জায়গা নিয়েছে এই তিন খাত। এটি চীনের জিডিপিতে বড় অবদান রাখছে।
এমবার জানায়, মার্চে চীনের ব্যাটারি রপ্তানি ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতে এই প্রবৃদ্ধির হার অনেক বেশি।
জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন যুগের শুরু
বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। আর এটিই পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করছে।
সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও প্রণালিতে উত্তেজনা কমেনি। মার্কিন ও ইরানি—উভয় বাহিনীই এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ জব্দ করেছে।
তেল সংকট আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সম্পর্ককেও নতুন রূপ দিচ্ছে। কারণ, বিভিন্ন দেশ সরবরাহের এই ধাক্কা থেকে নিজেদের বাঁচাতে চাইছে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সক্ষমতা বাড়ানো এই সংকট মোকাবিলার অন্যতম প্রধান উপায় হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাজ্যের জ্বালানিমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড চলতি সপ্তাহে এক বিবৃতিতে বলেন, 'গত ৫ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে আমরা দ্বিতীয়বারের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির সংকটে পড়েছি। আমাদের জন্য শিক্ষাটা খুব পরিষ্কার: জীবাশ্ম জ্বালানির নিরাপত্তার যুগ শেষ, এখন পরিচ্ছন্ন জ্বালানির যুগ শুরু করতে হবে।'
এদিকে চীনে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি শিল্পে রাষ্ট্রের বিপুল বিনিয়োগ তাদের জ্বালানি নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করেছে। ফলে তেল সংকটের ঝুঁকি থেকেও তারা অনেকাংশে মুক্ত। তাছাড়া, নবায়নযোগ্য প্রযুক্তিতে একচ্ছত্র আধিপত্য এবং এর রপ্তানি চীনকে বিশ্বমঞ্চে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে।
পাকিস্তান এই যুদ্ধের প্রভাব থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পেয়েছে। কারণ, কয়েক বছর আগে থেকেই তারা সস্তায় বিপুল পরিমাণ চীনা সৌরপ্যানেল আমদানি শুরু করেছিল। দামি তেল আমদানির বদলে সৌরশক্তি ব্যবহার করে দেশটি প্রতি বছর কয়েক শ কোটি ডলার সাশ্রয় করছে বলে ধারণা করা হয়।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের এনার্জি স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক জিয়ং ওন কিম লিখেছেন, 'চীনকে আগে শুধু সস্তা পণ্যের সরবরাহকারী মনে করা হতো। কিন্তু জ্বালানি রূপান্তরের এই যাত্রায় এখন তাদের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছে।'
শুধু সৌরপ্যানেল নয়, এমবার বিশ্লেষকদের ধারণা—গত বছর বিশ্বজুড়ে বৈদ্যুতিক গাড়ির চল বাড়ায় তেলের ব্যবহার প্রায় ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন ব্যারেল কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের শুরুতে যখন তেলের দাম বাড়তে শুরু করে, তখন চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, দেশটির বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা কোম্পানিগুলোর বিদেশে বিক্রয় এক লাফে অনেক বেড়ে গেছে।
চীন প্যাসেঞ্জার কার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে চীনের বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ির রপ্তানি রেকর্ড ছুঁয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এগুলোর বিক্রি বেড়েছে প্রায় ১৪০ শতাংশ।
তবে সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা লরি মাইলিভির্টা বলেন, মার্চ মাসের এই বিশাল রপ্তানি প্রবৃদ্ধি দীর্ঘ মেয়াদে ধরে রাখা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
কিন্তু একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত দীর্ঘ মেয়াদে বিকল্প জ্বালানির প্রয়োজনীয়তাকে আরও মজবুত করেছে বলেও মনে করেন তিনি।
মাইলিভির্টা বলেন, 'সৌরশক্তি ও ব্যাটারির খরচ কমে যাওয়া এবং জীবাশ্ম জ্বালানির বাড়তি ও অস্থিতিশীল দামের কারণে বিশ্বের বিশাল অংশের বিদ্যুৎ গ্রাহকদের কাছে এখন সৌরশক্তিই সবচেয়ে সহজ ও স্বাভাবিক পছন্দ হয়ে উঠেছে।'
