ইরান যুদ্ধের জের, রাশিয়ার তেল কিনতে চীন ও ভারতের মধ্যে প্রতিযোগিতা
বিশ্বের শীর্ষ দুই জ্বালানি আমদানিকারক দেশ ভারত ও চীন এখন বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের সংকটের মুখে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে থমকে যাওয়া শান্তি আলোচনার ফলে তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার জেরে এই প্রতিযোগিতার সূত্রপাত।
এই দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তি এখন সীমিত মজুত থাকা জ্বালানি তেলের দখল নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই তেলের প্রধান উৎস এখন রাশিয়া এবং স্বল্প পরিসরে সৌদি আরব।
কেপলার-এর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মুয়ু জু সিএনবিসি-কে বলেন, "রাশিয়ান অপরিশোধিত তেলের জন্য ভারত ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র হয়েছে এবং জুন মাসে জাহাজীকরণের অপেক্ষায় থাকা তেলের চালানের ক্ষেত্রেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে।"
গত ১৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র একটি বিশেষ ছাড়ের মেয়াদ প্রায় এক মাস বৃদ্ধি করে, যার ফলে সমুদ্রপথে নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত রুশ তেল কেনার সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওপর চাপ কিছুটা কমেছে। তবে ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়নি।
উল্লেখ্য, ইরানের তেলের প্রায় ৯৮ শতাংশ চীনে যায় এবং সামান্য কিছু অংশ যায় ভারতে।
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরানের হামলার কারণে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে, যা রাশিয়ার তেলের চাহিদা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কেপলার-এর তথ্যমতে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ (হরমুজ প্রণালি) দিয়ে চীনের আমদানি এপ্রিল মাসে দৈনিক প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার ব্যারেলে নেমে এসেছে, যা ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল দৈনিক ৪৪ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল। অন্যদিকে, এই রুট দিয়ে ভারতের সরবরাহ গত ফেব্রুয়ারিতে যেখানে ছিল ২৮ লাখ ব্যারেল, চলতি মাসে তা মাত্র ২ লাখ ৪৭ হাজারে নেমে এসেছে।
এই ঘাটতি মেটাতে উভয় দেশই এখন বিকল্প উৎসের সন্ধানে রয়েছে।
কেপলার-এর বিশ্লেষক মুয়ু জু বলেন, "হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এশীয় দেশগুলো এখন সস্তা এবং সহজে পাওয়া যায় এমন তেলের উৎস খুঁজছে। আর রাশিয়ার তেল ঠিক এই ক্যাটাগরিতেই পড়ে।"
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরবরাহ সংকটে ভারত বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। মার্চ মাসে দেশটির তেল আমদানি কমে গেছে এবং দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় ভারতের মজুত মাত্র ৩০ দিনের জন্য পর্যাপ্ত। তারা আরও যোগ করেন যে, অন্যান্য দেশের মতো ভারত সরকার তেলের খুচরা দাম বাড়ায়নি, ফলে দেশটিতে পেট্রোল ও ডিজেলের চাহিদা কমেনি।
এদিকে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসি অনুসারে, চীন তাদের অপরিশোধিত তেল আমদানির ৪৫-৫০ শতাংশের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর নির্ভরশীল। তবে দেশটির তেলের বিশাল মজুত তিন থেকে চার মাসের চাহিদা মেটাতে সক্ষম।
জ্বালানি গোয়েন্দা সংস্থা এক্স-অ্যানালিস্টস-এর প্রধান তেল বিশ্লেষক মুকেশ সহদেব বলেন, এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় চীন তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
সহদেব আরও জানান, চীনের বিশাল রপ্তানি ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প সচল রাখতে এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে কৌশলগত মজুত বাড়ানোর জন্য বেইজিংয়ের প্রচুর তেল আমদানি প্রয়োজন।
রাশিয়ান তেলের ওপর নির্ভরতা
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল কমোডিটিজ অ্যাট সি-এর পরিচালক বেঞ্জামিন টাং জানান, মার্চ মাসে ভারত মোট ৪৫ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল তেল আমদানি করেছে, যার মধ্যে রাশিয়ার অবদান ছিল ২১ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল বা প্রায় ৪৭ শতাংশ।
কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে ভারতের মোট আমদানিতে রাশিয়ার অংশ ছিল প্রায় ২০ শতাংশ, অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে ভারতের মোট তেল আমদানি যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় ১৪ শতাংশের বেশি কমেছে।
চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানিও সংকুচিত হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় মার্চ মাসে পরিমাণে ২.৮ শতাংশ কমেছে। ইরানের সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়ায় বেইজিং সেই শূন্যস্থান পূরণে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকেছে।
কেপলার-এর তথ্য বলছে, চীন মার্চ মাসে ১৮ লাখ ব্যারেল রুশ তেল আমদানি করেছে, যা ফেব্রুয়ারির ১৯ লাখ ব্যারেলের চেয়ে কিছুটা কম। তবে চলতি এপ্রিলে ভারত ও চীন পাল্লা দিয়ে রুশ তেলের দখল নিচ্ছে এবং উভয় দেশই ১৬ লাখ ব্যারেল করে তেল নিশ্চিত করেছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে ভারতের শোধনাগারগুলো রাশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছিল, মূলত নভেম্বরে রাশিয়ার দুটি বড় তেল কোম্পানির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে। ওয়াশিংটন তখন দিল্লির ওপর চাপ সৃষ্টি করে বলেছিল যে, রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সুবিধাজনক বাণিজ্য চুক্তি সম্ভব হবে।
ফেব্রুয়ারি মাসে যখন ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছায়, তখন কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার তেল আমদানি গত নভেম্বরের ১৮ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল থেকে কমে ১০ লাখ ৪০ হাজারে নেমেছিল।
কিন্তু ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংঘাত এই পরিস্থিতিকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে।
ভারতের এনডিটিভি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভারতে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ডেনিস আলিপভ নিশ্চিত করেছেন যে, "ভারত ইদানীং প্রচুর রাশিয়ার তেল কিনছে" এবং মস্কো ভবিষ্যতে জ্বালানি সহযোগিতার এই স্তর বজায় রাখতে চায়। তিনি মার্কিন শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞাকে 'অবৈধ চাপ' হিসেবে অভিহিত করেন।
নয়াদিল্লির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা জরুরি হলেও, চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য রাশিয়ার তেল এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
রিস্ট্যাড এনার্জির তেল বাজার বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট লিন ইয়ে সিএনবিসি-কে বলেন, "মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর অতি-নির্ভরতা এবং তুলনামূলক কম মজুত থাকায় সাম্প্রতিক সংকটে চীন অপেক্ষা ভারত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ভারতের জন্য রাশিয়ার তেলের প্রয়োজনীয়তা বেশি হলেও চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো থেকে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে, যারা 'নিষেধাজ্ঞা মওকুফ' পাওয়ার পর পুনরায় বাজারে ফিরে এসেছে।
সৌদি আরব থেকে সরবরাহ
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে ভারত রাশিয়ার তেলের বিকল্প হিসেবে সৌদি আরবের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছিল।
কেপলার-এর তথ্য বলছে, ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরব থেকে ভারতের সরবরাহ বেড়ে ১০ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছিল, যা ২০২৫ সালে গড়ে প্রতিদিন ছিল ৬ লাখ ৩৮ হাজার ৩৮৭ ব্যারেল। চলতি এপ্রিলে এখন পর্যন্ত সৌদি আরব ভারতকে দৈনিক ৬ লাখ ৮৪ হাজার ১৯০ ব্যারেল তেল সরবরাহ করেছে।
যাইহোক, এক্স-অ্যানালিস্টস-এর সহদেব জানান, সৌদি আরবের তেলের বড় অংশ লোহিত সাগরের মাধ্যমে চীনের দিকে যাচ্ছে। সেখানে রিয়াদের বড় ধরনের শোধনাগার বিনিয়োগ থাকায় ভারতের চেয়ে চীনের প্রতি তাদের আগ্রহ বেশি।
কেপলার-এর তথ্যানুসারে, এপ্রিল মাসে সৌদি আরব চীনকে দৈনিক ১৩ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেল সরবরাহ করেছে, যা মার্চে ছিল ১০ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল। তবে এটি ফেব্রুয়ারির ১৬ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেলের চেয়ে কম।
সহদেব বলেন, "যদি অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতি চলে, তবে দামের চেয়েও তেলের সহজলভ্যতা সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।"
