ইরান-ইসরায়েল সংঘাত: রাশিয়ার ‘ওয়ার মেশিনের’ জন্য বড় আশীর্বাদ, নেপথ্যে শুধু তেল নয়
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনা ও সংঘাত রাশিয়ার ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির জন্য এক অভাবনীয় 'লাইফলাইন' বা সঞ্জীবনী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংঘাত কেবল বিশ্ববাজারে তেলের দামই বাড়ায়নি, বরং ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিনের 'ওয়ার মেশিন' তথা সমরযন্ত্রকে সচল রাখতে প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান দিচ্ছে। তবে এই লাভের নেপথ্যে কেবল জ্বালানি তেল নয়, বরং প্রাকৃতিক গ্যাস এবং সারের বাজারের নিয়ন্ত্রণও রাশিয়ার অনুকূলে চলে আসছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক 'সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ' (সিএসআইএস)-এর সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট বেন কাহিল বলেন, 'ইরান সংঘাতের সবচেয়ে বড় বিজয়ী দেশ হলো রাশিয়া।' তিনি উল্লেখ করেন, ক্রেমলিন এখন তাদের অপরিশোধিত তেল আগের মতো ছাড়ে বিক্রি না করে সরাসরি পূর্ণ বাজার মূল্যে বিক্রি করতে পারছে, যা দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য একটি বড় মোড়।
বাজেট সংকট থেকে সাময়িক মুক্তি
বার্লিনভিত্তিক 'কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টার'-এর ফেলো আলেকজান্দ্রা প্রোকোপেনকো জানান, মধ্যপ্রাচ্যে এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে রাশিয়া এক ভয়াবহ বাজেট সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার অর্থনীতির যে কাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে, এই সংঘাত তা পুরোপুরি বদলে না দিলেও ক্রেমলিনকে 'সময় দিয়েছে'।
রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে যে, চলতি বছরের জন্য নির্ধারিত ব্যয় সংকোচন নীতি এখন ২০২৭ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে। কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের তথ্যমতে, মার্চের মাঝামাঝি সময়ে রুশ 'উরাল' অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলে ৯০ ডলারে পৌঁছেছে, যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। প্রতি ব্যারেলে ৩০ ডলার বাড়তি দামের অর্থ হলো রাশিয়ার প্রতি মাসে ৮৫০ কোটি ডলার অতিরিক্ত আয়, যার মধ্যে ৫০০ কোটি ডলার সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে।
ব্রাসেলসভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক 'ব্রুগেল'-এর সিনিয়র ফেলো সিমোন তাগলিয়াপিত্রা বলেন, 'রাশিয়ার ফেডারেল বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে তেল ও গ্যাস থেকে। এই অর্থ ইউক্রেন যুদ্ধে তাদের সমরযন্ত্র সচল রাখার মূল চাবিকাঠি। এটি ইউক্রেনের জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক সংবাদ।'
কৌশলগত পরিবর্তন ও ভারতের ভূমিকা
ইরান যুদ্ধের আগে রাশিয়ার তেলের ক্রেতা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ওয়াশিংটনের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে রুশ তেল কোম্পানিগুলো বড় ধরনের ছাড় দিতে বাধ্য হচ্ছিল। এমনকি রাশিয়ার তেলের বড় ক্রেতা ভারতের ওপরও চাপ সৃষ্টি করেছিল হোয়াইট হাউস।
আইইএ-এর তথ্যমতে, গত ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার তেল রপ্তানি যুদ্ধের শুরুর পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে (দৈনিক ৬৬ লাখ ব্যারেল) নেমে এসেছিল। কিন্তু ইরান সংঘাত শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ওয়াশিংটন রুশ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছে।
বাজার বিশ্লেষক সংস্থা 'কেপলার'-এর মতে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ হ্রাসের আশঙ্কায় ভারতের রিফাইনারিগুলো রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা দ্বিগুণ করে দিয়েছে। এমনকি সম্প্রতি ভারতীয় ক্রেতারা বিশ্ববাজারের মানদণ্ড 'ব্রেন্ট ক্রুড'-এর চেয়েও বেশি দামে রাশিয়ার 'উরাল ক্রুড' কিনছেন বলে জানা গেছে।
প্রাকৃতিক গ্যাস ও সারের একচেটিয়া বাজার
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা রাশিয়ার জন্য শুধু তেলের বাজারই উন্মুক্ত করেনি। হরমুজ প্রণালি অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কায় তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), সার, হিলিয়াম এবং অ্যালুমিনিয়ামের বাজারেও রাশিয়ার কদর বাড়ছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সার রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে রাশিয়া এখন নাইজেরিয়া এবং ঘানার মতো দেশগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ অর্ডার পাচ্ছে। আলেকজান্দ্রা প্রোকোপেনকোর মতে, একবার এই নির্ভরশীলতা তৈরি হয়ে গেলে তা যুদ্ধবিরতির পরও টিকে থাকবে।
এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন ২০২৭ সালের মধ্যে রুশ গ্যাসের ওপর নির্ভরতা শূন্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে, তখন এই সংঘাত সেই সময়সীমাকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল এনার্জি পলিসি সেন্টারের ফেলো তাতিয়ানা মিত্রোভা মনে করেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার বিষয়টি রাশিয়ার জন্য একটি প্রতীকী জয়, যা তাদের ওয়াশিংটনের সাথে দীর্ঘমেয়াদী দরকষাকষির সুযোগ করে দিচ্ছে।
চীন ও ভারতের নতুন সমীকরণ
মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীন ও ভারত এখন রাশিয়ার বিশাল অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগের কথা ভাবছে। চীনের দীর্ঘদিনের অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাশিয়ার প্রস্তাবিত 'পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া ২' গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প এখন বেইজিংয়ের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। এছাড়া এশিয়াগামী 'ইস্টার্ন সাইবেরিয়া-প্যাসিফিক ওশান' পাইপলাইনের সক্ষমতা বৃদ্ধিও রাশিয়ার জন্য কৌশলগত সুফল বয়ে আনতে পারে।
তবে রাশিয়ার এই সুদিন দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। তাতিয়ানা মিত্রোভার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা চীন ও ভারতকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং কয়লার দিকে আরও বেশি ঝুঁকতে উৎসাহিত করবে। দীর্ঘমেয়াদে তারা তাদের আমদানিনির্ভরতা কমাতে চাইবে।
পাশাপাশি, ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে জাহাজ ভাড়া এবং পণ্য পরিবহন খরচ বাড়ছে, যার প্রভাব রাশিয়ার ওপরও পড়ছে। 'অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট' (ওইসিডি) চলতি বছর রাশিয়ার মুদ্রাস্ফীতির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৬ শতাংশ করেছে। ওইসিডি মনে করে, রাশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চলতি বছরের ০.৬ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে আরও কমে যেতে পারে।
অর্থাৎ, যুদ্ধের এই আকস্মিক মুনাফা রাশিয়ার ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী কোনো সমাধান নয়। বরং ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগের অভাব ক্রেমলিনের জন্য সামনের দিনগুলোতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকছে।
