ইরান যুদ্ধ: হরমুজ প্রণালিতে সামরিক হস্তক্ষেপ প্রত্যাখান ইইউ নেতাদের
ইরানে শুরু হওয়া যুদ্ধের জেরে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী। এ নিয়ে আলোচনা করতে ব্রাসেলসে জড়ো হয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। এর মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন ইউরোপীয় নেতারা।
সোমবার (১৬ মার্চ) জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল ব্রাসেলসে সাংবাদিকদের জানান, এই সংঘাতের সময় কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা বার্লিনের নেই।
তিনি বলেন, 'আমরা আশা করি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আমাদের জানাবে তারা সেখানে কী করছে এবং তাদের লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে কি না। পরিস্থিতি পরিষ্কার হওয়ার পর, প্রতিবেশী দেশগুলোকে নিয়ে পুরো অঞ্চলের জন্য একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির দ্বিতীয় ধাপে আমাদের এগোতে হবে।'
রবিবার ট্রাম্প উপসাগরীয় এই কৌশলগত জলপথ পাহারায় যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের জন্য একটি নৌজোট গঠনের আহ্বান জানান। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। তবে ওয়াডেফুল জানান, হরমুজ প্রণালির দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে ন্যাটো এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানজুড়ে ভয়াবহ হামলা শুরু করলে এই প্রণালিটি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। জবাবে ইরানও পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে টালমাটাল করে তুলেছে।
তেল ও গ্যাসের দাম হু হু করে বাড়লেও প্রণালিটি সুরক্ষায় ট্রাম্পের আহ্বানে ইউরোপের অনেক দেশই সাড়া দেয়নি।
সোমবার গ্রিস সরকারের মুখপাত্র পাভলোস মারিনাকিস জানান, হরমুজ প্রণালিতে কোনো সামরিক অভিযানে জড়াবে না গ্রিস। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানিও নিশ্চিত করেছেন, ওই এলাকায় প্রসারিত হতে পারে এমন কোনো নৌ-মিশনে ইতালি অংশ নিচ্ছে না।
তবে ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকেই রাসমুসেন ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ইউরোপ ইরান যুদ্ধের সমর্থক না হলেও প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিতে তাদের খোলা মন রাখা উচিত।
রাসমুসেন বলেন, 'আমাদের পৃথিবীকে সেভাবেই মেনে নিতে হবে যেমনটা সে আছে, যেমনটা আমরা চাই তেমনটা নয়।' তিনি আরও বলেন, ইইউকে অবশ্যই 'উত্তেজনা কমানোর' লক্ষ্যে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য জানিয়েছে তারা হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে একটি সম্মিলিত পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে, তবে কাজটি সহজ হবে না।
ট্রাম্পের চাপে ইইউ
ইইউর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কাল্লাস ব্রাসেলসে বৈঠকের আগে সাংবাদিকদের বলেন, ইউরোপীয় নেতারা মূলত আলোচনা করবেন কীভাবে ইইউ এই জলপথটি পুনরায় খুলে দিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, 'প্রথমে আমাদের আলোচনা করতে হবে সদস্য রাষ্ট্রগুলো হরমুজ প্রণালিতে কী করতে ইচ্ছুক। অবশ্যই এখন প্রণালিটি খুলে দেওয়া খুবই জরুরি।'
কাল্লাস উল্লেখ করেন, প্রণালি বন্ধ থাকায় তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা পরোক্ষভাবে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধকেই লাভবান করছে। কারণ মস্কোর এই যুদ্ধের বড় অর্থের জোগান আসে জ্বালানি খাত থেকেই।
ব্রাসেলস থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক স্টেপ ভেসেন জানান, এটা স্পষ্ট যে ইউরোপীয় নেতারা হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে 'ট্রাম্পের দিক থেকে ক্রমশ চাপ অনুভব করছেন।'
ভেসেন বলেন, 'যুদ্ধে জড়ানোর ব্যাপারে (ইইউ নেতাদের) খুব একটা আগ্রহ নেই, বিশেষ করে যেহেতু তারা মনে করেন তাদের পুরোপুরি অন্ধকারে রাখা হয়েছে। তারা হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার উপায় নিয়ে আলোচনা করবেন, তবে এর মানে এই নয় যে তারা যুদ্ধজাহাজ পাঠাবেন।'
রবিবার ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, প্রণালিতে সামরিক অভিযানের প্রস্তাবে সাড়া না পেলে বা নেতিবাচক উত্তর পেলে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ 'খুবই খারাপ' হবে।
ফ্রান্স প্রস্তাব দিয়েছে যে, ইইউ চাইলে তাদের 'অ্যাসপিডস' মিশনকে সম্প্রসারিত করতে পারে। লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুথিদের হামলা থেকে জাহাজগুলোকে রক্ষা করতে ২০২৪ সালে এই ছোট নৌ-মিশনটি গঠন করা হয়েছিল।
বর্তমানে এই মিশনের সরাসরি কমান্ডের অধীনে একটি ইতালীয় এবং একটি গ্রিক জাহাজ রয়েছে। প্রয়োজনে একটি ফরাসি এবং আরেকটি ইতালীয় জাহাজকেও সহায়তার জন্য ডাকা হতে পারে।
তবে জার্মানি এই ধারণার বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা ইইউ সদস্যদের মধ্যে অন্যতম।
বার্লিনে জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস বলেন, 'ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে ইউরোপের এক বা দুই ডজন ফ্রিগেট (যুদ্ধজাহাজ) থেকে কী আশা করেন, যা শক্তিশালী মার্কিন নৌবাহিনী করতে পারছে না? এটি আমাদের যুদ্ধ নয়। আমরা এটি শুরু করিনি।'
ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে পিস্টোরিয়াস বলেন, এই একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে জোটটি ভেঙে পড়বে বলে তিনি মনে করেন না।
